প্রশ্নপত্র তালাবদ্ধ রেখে প্রধান শিক্ষক গিয়েছিলেন ভোজে : তোলপাড়
প্রশ্নপত্র তালাবদ্ধ রেখে প্রধান শিক্ষক গিয়েছিলেন ভোজে : তোলপাড়

প্রশ্নপত্র তালাবদ্ধ রেখে প্রধান শিক্ষক গিয়েছিলেন ভোজে : তোলপাড়

বরিশাল ব্যুরো

প্রশ্নপত্র স্টিলের আলমিরায় তালাবদ্ধ করে রেখে প্রধান শিক্ষক গিয়েছিলেন একটি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে। তাই উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্র্ধারিত সময়ের সোয়া এক ঘণ্টা পর। প্রধান শিক্ষকের এহেন কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি সচেতন মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার বরিশালের বানারীপাড়া মডেল ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন (পাইলট) স্কুল কেন্দ্রে।

পরীক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী শুক্রবার বেলা ২টায় তাদের শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা বিষয়ের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। সে মতে তারা কেন্দ্রে এসে জানতে পারেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সুপার কৃষ্ণকান্ত হাওলাদার পিরোজপুরের স্বরূপকাঠী উপজেলায় একটি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে গেছেন। তিনি (প্রধান শিক্ষক) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিদ্যালয়ে তার কক্ষের স্টিলের আলমিরায় তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। ফলে ৪৮ জন পরীক্ষার্থী প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। বিষয়টি জানতে পেরে বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির একাধিক সদস্য ও শিক্ষকেরা একাধিকবার প্রধান শিক্ষকের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি ভোজে ব্যস্ত থাকায় ফোন রিসিভ করেননি। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পরে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে প্রধান শিক্ষক স্কুলে এসে আলমিরা থেকে প্রশ্নপত্র বের করে দেয়ার পরে পরীক্ষা শুরু করা হয়।

সূত্র মতে, পার্শ্ববর্তী উপজেলার কেন্দ্রগুলোতে বেলা ২টায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় বহু নির্বাচনী ও সৃজনশীল প্রশ্ন মোবাইল ফোনে মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। এ ব্যাপারে উন্মুক্ত বিশ্বদ্যালয়ের বরিশালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: শামীম জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। উন্মুক্ত বিশ্বদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. আসাদুজ্জামান উকিল বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অপর দিকে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণকান্ত হাওলাদার এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্ন সংবাদকর্মীদের ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় নেমেছেন।

গতকালও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে

বিরতিহীনভাবে চলছে এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস। গতকাল ছিল বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের পরীক্ষা। এ দিনও পরীক্ষার এক ঘণ্টা আগে ইন্টারনেটে বহুনির্বাচনী বিষয়ের ‘খ’ সেটের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার হলের প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এবার এ নিয়ে টানা দশম দিনের মতো এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটল। বিরতিহীনভাবে প্রশ্নফাঁসের কারণে এবার এসএসসি পরীক্ষা যেন তামাশায় পরিণত হয়েছে। ক্ষোভ হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে মেধাবী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে।
গতকাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পরীক্ষার মধ্যে ১১টি বিষয়ের বহুনির্বাচনী প্রশ্নফাঁস হলো। এগুলো হলো- বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, গণিত, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়।

গতকাল পরীক্ষা শুরুর আগে সকাল ৯টা ৩ মিনিটে রসায়নের ‘খ’ সেট প্রশ্নপত্রটি হোয়াটসঅ্যাপের গ্রুপে পাওয়া যায় মর্মে বিভিন্ন অনলাইনে খবর এসেছে।

জামালপুর ও বকশীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে মোবাইলসহ সবুজ মিয়া (৩০) নামে স্থানীয় একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষককে আটক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ সময় ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মোবাইলও জব্দ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও বিশ^পরিচয় বিষয়ে পরীক্ষা চলাকালে শনিবার সকালে জেলার বকশীগঞ্জ এনএম উচ্চবিদ্যালয় এসএসসি কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু হাসান সিদ্দিক বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের পরীক্ষা শুরুর ঠিক দুই মিনিট আগে কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সময় সবুজ মিয়াকে আটক করেন। আটক সবুজ মিয়া স্থানীয় একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক। এ সময় তার কাছ থেকে একটি মোবাইল জব্দ করা হয়। তার মোবাইলে বাংলাদেশ ও বিশ^পরিচয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়। একই সময় ওই কেন্দ্র থেকে স্থানীয় নজরুল ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজাহার আলী সাজুকে আটক এবং তার মোবাইলটিও জব্দ করা হয়। মোবাইলটি দেখার সময় ওই প্রধান শিক্ষক কেন্দ্র থেকে দ্রুত কেটে পড়েন। তার মোবাইলেও একই প্রশ্ন পাওয়া যায়। এ ঘটনায় বকশীগঞ্জ এনএম উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্রসচিব মাসুমুল হক সিদ্দিকী বাদি হয়ে সবুজ মিয়া ও আজাহার আলী সাজুকে আসামি করে বকশীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।


এ দিকে বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গ্রেফতার সবুজ মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে পাঠানো হবে। পলাতক প্রধান শিক্ষক আজাহার আলী সাজুকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

লালমনিরহাট সংবাদদাতা জানান, লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে শনিবার বেলা সোয়া ১২টায় এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আওলাদ হোসেন (৩৭) নামে এক স্কুলশিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। তিনি মধ্য গড্ডিমারী এলাকার আব্দুস ছামাদের ছেলে এবং বড়খাতা উচ্চবিদ্যালয়ের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট শিক্ষক।

হাতীবান্ধা থানার ওসি শামীম হাসান সরদার এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় বড়খাতা উচ্চবিদ্যালয়ের কেন্দ্রসচিব জাহদুল ইসলাম বাদি হয়ে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।
খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনায় এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ৯ জনকে আটক করেছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা (র্যাব-৬)। শনিবার বিকেলে খুলনার লবণচরার র্যাব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র্যাব-৬-এর স্পেশাল কোম্পানি কমান্ডার মো: এনায়েত হোসেন মান্নান।

আটকরা হচ্ছে- নগরীর খালিশপুরের কাশিপুর এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে খায়রুল ইসলাম (১৮), হাবিবুর রহমানের ছেলে নাইমুর রহমান (১৬), রফিকুল ইসলামের ছেলে সাব্বির হোসেন (১৮), সবুর খানের ছেলে সাব্বির হোসেন (১৮), দৌলতপুর পাবলা এলাকার আনোয়ারুলের ছেলে সাকিব হোসেন (১৮), মালের ছেলে মোনায়েম সাহরা (১৬), হরিশেবকের ছেলে চয়ন রায় (১৭), যশোরের কোতোয়ালির মৃত মোরশেদের ছেলে ইব্রাহিম আল নাঈম (১৬) ও পিরোজপুর নাজিরপুরের সাত্তার মল্লিকের ছেলে সাজিদ (১৬)। এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, শনিবার এসএসসির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় (সৃজনশীল) পরীক্ষা ছিল। আটককৃতদের বিরুদ্ধে এ বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা ৩০০-৪০০ টাকার বিনিময়ে এ চক্রটি প্রশ্ন ফাঁস করে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.