সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দুই ভাষাসৈনিক
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দুই ভাষাসৈনিক

মানিকগঞ্জের দুই ভাষাসৈনিক

আবদুর রাজ্জাক

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাবেশ থেকে। সেই আন্দোলনের অগ্নিশিখা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজপথ এবং
জেলা ও মফস্বলেও ছড়িয়ে পড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় মানিকগঞ্জেও ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়। সূত্রপাত হয় তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউট থেকে। এই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক প্রমথনাথ নন্দী ছিলেন ভাষা আন্দোলনের পুরোধা। এ আন্দোলনে তখন অনেকেই শামিল হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে এখনো
বেঁচে আছেন দু’জন। মিরান উদ্দিন ও আবদুল হাকিম মাষ্টার।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক

মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে যেয়ে নিজের মাকে মা বলে ডাকিনি কত দিন : মিরান উদ্দিন, ভাষাসৈনিক
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেই নবম শ্রেণীর টগবগে কিশোর মিরান এখন ৮৪ বছরের বৃদ্ধ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরটা এখন আর আগের মতো সচল নেই। তবুও স্মৃতি হাতড়ে খুঁঁজে ফেরেন জীবনের সমৃদ্ধ অতীত। ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে সেই উত্তাল দিনগুলো। মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে সেদিন এতটুকু দ্বিধা বা ভয় ছিল না তার। বাঙালির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সেই আন্দোলনের একজন অংশীদার হিসেবে এখনো গর্ববোধ করেন তিনি।
বলছিলাম ভাষাসৈনিক মিরান উদ্দিনের কথা। যার হৃদয় ও কণ্ঠে এখনো বেজে ওঠে ভাষার গান। যার চিত্ত এখনো ব্যাকুল মা, মাটি, মানুষ, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির মঙ্গল কামনায়।
সম্প্রতি প্রবীণ এই ভাষাসৈনিকের সঙ্গে কথা হয় তার ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী বাড়িতে। স্মৃতি হাতড়ে অনেকটা আক্ষেপের সুরে এ ভাষাসৈনিক বলেন, ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ডাক পড়ে আমাদের কিন্তু এরপর আর কেউ খোঁজ রাখে না। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শুরুর সেই সময় (১৯৪৯ সালে) নবম শ্রেণীর কিশোর আমি। তবে সেদিন স্কুল প্রাঙ্গণের পলাশগাছটি ফুলে ফুলে রক্তিম ছিল। আমি ছিলাম নবম শ্রেণীর ক্যাপ্টেন। সেদিন স্কুলে আসার পর আমাকেসহ সহপাঠী ওয়াজেদ উদ্দিন, ভুপেন্দ্র নাথ, রেহাজ উদ্দিন, মুকুল চন্দ্র সরকার, নিরঞ্জন, যতিনকে ডেকে পাঠান স্কুলের শিক্ষক প্রমথনাথ নন্দী ও আফসার উদ্দিন। ঢাকায় বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলন সম্পর্কে আমাদের বোঝান দুই শিক্ষক। বলেন উর্দু যদি রাষ্ট্রভাষা হয় তাহলে বাঙালিদের নিজস্বতা বলতে কিছু থাকবে না। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। ঢাকা থেকে ছাত্রসংগ্রামের নেতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র আবদুস সালামের পাঠানো লিফলেট আমার হাতে দিয়ে শিক্ষক প্রমথনাথ নন্দী বলেন, এগুলো ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের মাঝে বিলি করতে হবে। স্কুলের দফতরি মনমোহন দাসের সহায়তায় প্রত্যেক ক্লাসে আমি হ্যান্ডবিল বিলি করি। ছাত্রদের সংগঠিত করি এবং স্যারের নির্দেশে ছুটির ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে মিছিল নিয়ে ঘিওর অভিমুখে রওনা হই। কিন্তু পুলিশ ঘিওর নদীর পাড়ে আমাদের অস্ত্রের মুখে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। আমরা বাধ্য হয়ে মিছিলটি চড় বাইলজুরী গ্রামের ভেতর দিয়ে আরো চার-পাঁচটি গ্রাম প্রদক্ষিণ করি। মনে পড়ে সে দিন আমাদের মিছিল দেখতে গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ সমবেত হয়েছিল। পরে মিছিল শেষে আমরা স্কুলমাঠে সমাবেশ করি। সেই সমাবেশে আমি বক্তব্যে বলি, যেকোনো মূল্যেই মায়ের ভাষা বাংলাকে রক্ষা করব এবং আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। উপস্থিত সমবেত মানুষের সেই করতালি যেন আজো আমার কানে বেজে ওঠে। পরে মামলা করে হুলিয়া জারি করে আমার বিরুদ্ধে এবং সহপাঠী রেহাজ উদ্দিন, ওয়াজ উদ্দিন, ওয়ারেশ পাশা ও জাফর আলমকে গ্রেফতার করে তৎকালীন প্রশাসন। আমার জন্ম দৌলতপুর উপজেলার ধামশ্বর ইউনিয়নের কলিয়া গ্রামে। আমি তখন তেরশ্রী গ্রামে দরবেশ আলী মীরের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করি। তখনকার চেয়ারম্যান তাহের উদ্দিন ঠাকুর লোক মারফত খবর পাঠান পুলিশ আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। আমি যেন দ্রুত পালিয়ে যাই। খবর শোনামাত্র এক কাপড়েই রওনা হই অজানার উদ্দেশে। রাতে আশ্রয় নেই বড়বিলা গ্রামে আমার এক বন্ধু সাত্তার মুন্সীর বাড়িতে। সেখানে আতঙ্কে রাতটুকু কাটিয়ে পরদিন ভোরে চলে যাই টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানার ভাদ্রা গ্রামে। কত রাত কত দিন যে এভাবে পালিয়ে পালিয়ে কাটিয়েছে। মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের মাকে মা বলে ডাকিনি কত দিন। কথাগুলো বলতে বলতে আবেগাপ্লুত মিরান উদ্দিন ঝাপসা দৃষ্টির চোখ দুটো হাত দিয়ে বারবার মুছতে থাকেন। স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন গত হয়েছেন বছর চারেক আগে। শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসরে যাওয়ার পর একমাত্র মেয়ে আর মেয়ের ঘরে দুই নাতিনদের সাথেই সময় কাটে তার।
ভাষার লড়াইয়ে নির্যাতন-জুলুমের শিকার হয়েছি। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ’৭১ এর মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। জীবনের পড়ন্ত বেলায় কষ্ট একটাইÑ বরাবরই অবহেলার শিকার ভাষাসৈনিকেরা। মফস্বলের ভাষাসৈনিকদের তো কোনো স্বীকৃতিই নেই।’ রাষ্ট্রের কাছে তার একটাই চাওয়া, সবখানে বাংলা ভাষার প্রচলন থাক, শুদ্ধ বাংলা চর্চায় বড় হোক নতুন প্রজন্ম। প্রাণ পাক প্রাণের ভাষা।


সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাস্তবায়ন করা হোক : আবদুল হাকিম, ভাষাসৈনিক
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও স্মৃতিকথা তুলে ধরেন জীবন্ত কিংবদন্তি ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আবদুল হাকিম মাষ্টার। তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতা ছিলেন তৎকালীন আন্দোলনের পুরোধা প্রয়াত প্রমথনাথ নন্দী। তার উৎসাহ ও উদ্দীপনায় আমরা ভাষা আন্দোলনে যোগদান করি। উত্তাল সেই সময়ে পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মিছিল করি। স্লোগান দেই, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘উর্দু ভাষা চলবে না’।
‘আন্দোলনে আমাদের সাথে যারা ছিলেনÑযত দূর মনে পড়েÑ তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউটের সহকারী প্রধান শিক্ষক প্রয়াত প্রমথনাথ নন্দী, ক্রীড়াশিক্ষক আফসার উদ্দিন আহমেদ, কলেজশিক্ষার্থী প্রমথনাথ সরকার, মোবারক আলী, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র আবদুস সালাম। ওই বিদ্যালয়ের ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী আবদুল হাকিম, আবদুর রহমান ঠাকুর, মণিন্দ্রনাথ সরকার, সিরাজ উদ্দিন মৃধা; নবম শ্রেণীর ক্যাপ্টেন মিরান উদ্দিন, ছাত্র মো: ওয়াজ উদ্দিন, রেহাজ উদ্দিন প্রমুখ। মানিকগঞ্জ শহরের ছিলেন ডা. শামসুর রহমান, সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরী, ওয়ারেশ উদ্দিন পাশা, জাফর আলম চৌধুরী, খন্দকার দেলোয়ার হোসেন প্রমুখ।’ তিনি আরো বলেন, ‘আন্দোলনের খবর চার দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশ হুলিয়া জারি করে এর মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করে। আমরা আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যাই।’
বর্তমানে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামের ভাষাসৈনিক আবদুল হাকিম মাষ্টার। তিনি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হলেও ভাগ্যে জোটেনি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ধামশ্বরের কলিয়া গ্রামের আব্বাস উদ্দিন ও আছিরুন বেগমের তিন ছেলের মধ্যে আবদুল হাকিম মেঝো। দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে তিনি মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কর্মজীবনে কমরেড আবদুল হাকিম মাষ্টার তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি রাজপথে থেকে সক্রিয় অংশ নেন। ১৯৪৯ সালে আবদুল হাকিম মাষ্টার তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউটের ছাত্র থাকাকালে ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন।
ভাষাসৈনিক আবদুল হাকিম মাষ্টারের সাথে আলাপকালে তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘ভাষার জন্য আমরা সংগ্রাম করেছি, জেল খেটেছি, জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে দিনের পর দিন পালিয়ে থেকেছি। মায়ের ভাষার জন্য এ দেশের ছাত্ররা ঢাকা রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে। এত কিছুর পরেও ভাষার প্রতি চলছে চরম অবজ্ঞা।’ তিনি আরো বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ায় বুকটা গর্বে ভরে গেছে। আবার দুঃখে কান্না আসে, আনন্দটা ম্লান হয়ে যায় যখন দেখি আমাদের দেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার এখনো যথার্থ প্রয়োগ নেই। সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাস্তবায়ন করা হোক।’
বয়সের ভারে শরীরে বেঁধেছে নানা অসুখ-বিসুখ। স্মৃতিশক্তিও কমে গেছে। কথায় এসেছে জড়তা। সহ-আন্দোলনকারীদের দু-একজন ছাড়া কেউই বেঁচে নেই। উদাসী দৃষ্টিতে যেন কিছুটা অপ্রাপ্তির ছায়া। যাদের আন্দোলনের ফসলে আমরা আজ মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলি। সেই ভাষা যোদ্ধার জীবনের শেষ চাওয়া, ‘রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকু পেলে যেন মরেও শান্তি পাবে।’

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.