মানুষের ভাষা এবং বাংলা ভাষা

মতিন বৈরাগী

ভাষা মানুষের জীবনযাপন ও সমাজচেতনার চাবিকাঠি। আমাদের ভাষা আছে বলে আমরা মানুষ। ভাষা না থাকলে অন্য প্রাণী থেকে আমাদের পার্থক্য নিরূপিত হতো না। মানুষ পারত না তার সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে। ভাষা মানুষের প্রাণ, ভাষাহীন মানুষ মূলত প্রাণহীন মানুষ। কারণ সে তার আবেগ, আনন্দ, নির্মাণ, বিনিময়, যোগাযোগ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পারঙ্গমতা ও প্রসার এবং পরিকল্পিত পৃথিবী সৃষ্টিতে অপারঙ্গমই থেকে যেত। ভাষা কেবল কথা বলা শেখায়নি, ভাষা মানুষকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠাও দিয়েছে। ধর্মও ভাষার বাহনে মানুষের মধ্যে বোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

সত্যিটা এই যে পৃথিবীতে বহুভাষা সত্যিই আজও বিদ্যমান। আর তা স্থান কাল পরিবেষ পরিস্থিতি জীবন-নির্বাহ ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করেই উৎপত্তি। পৃথিবীতে আজও বহু জাতি বিদ্যমান আর বহু ভাষার এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবী। গবেষকেরা বলেন, পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক ভাষা বিদ্যমান ছিল, তার বহু ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। কোনো কোনোটা বিলুপ্তির পথে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিলুপ্ত ভাষাও পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। যেমন ইদ্দিস ইহুদিদের পুরানো ভাষা। সমাজতাত্ত্বিকদের গবেষণায় ভাষা বিকাশের নানা তত্ত্ব রয়েছে। কী করে আদিম জনগোষ্ঠীগুলো তাদের মধ্যে আদান-প্রদান ভাব বিনিময়ে কোনো একটা সঙ্কেত ব্যবহার করেছে আর তার সূত্র ধরে একসময় তা কথ্যভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে মিথ ও সমাজ জীবন। হাল আমলে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছে যে ‘মানুষের একটি জিন কেবল মাত্র ভাষা সক্ষমতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে না এবং বৈজ্ঞানিকভাবে এটি প্রমাণিত যে; কয়েকটি জিন সমষ্টি মানুষের ভাষা সক্ষমতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। সত্য যে এফওএক্সপি-২ জিন মানুষকে অন্যান্য প্রাণীগোষ্ঠী থেকে ভাষাগতভাবে উন্নত প্রাণী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এই বিশেষ জিনটি মেরুদণ্ডী প্রাণী। যেমন শিম্পাঞ্জি ও পাখির মধ্যেও বিদ্যমান তবে দুটি জায়গায় ভিন্নতা আছে। [এমিনো এ্যসিডের ভিন্নতা] মেউটেশন শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক ভাষা যোগাযোগের উন্নত এবং ভাষা সক্ষমতা তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। তাই যখন মানুষ ভাষা জানত না তখনো মানুষের রাসায়নিক এই দেহকাণ্ড ভাষার কাঠামো ধারণ করে ছিল তার শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে। [তবুও মানুষকে বহু দিন মূক থাকতে হয়েছে] ধীরে ধীরে মানুষ প্রয়োজনে তা একদিন বিকশিত করতে পারল। স্ফুরণ ঘটল তার আবেগের। অনেকেই মনে করেন গ্রেট-এক্সোডাসের মধ্য দিয়ে মানুষ বিভিন্ন ভাষার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, কোনো কোনো গোষ্ঠী অপর গোষ্ঠী দিয়ে অধিকৃত হয়েও নিজের ভাষা হারিয়েছে, আবার তাদের ভাষা থেকে বহু কিছু উপাদান দখলিশক্তি গ্রহণ করে তার ভাষা সমৃদ্ধ করেছে। এভাবে দখল পুনর্দখল ক্রিয়ায় বহু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, বহু ভাষা নতুন ভাষার রূপ লাভ করেছে। সে যাক, ভাষা যার যত উন্নত সেই জাতির অন্যের ওপর আধিপত্যটা ততটা প্রবল। যেমন ইংরেজি ভাষা আজো পৃথিবীর বহুদেশে ব্যবহৃত হয়, তার আধিপত্যও সে কারণে প্রকট। এই প্রবলতা পাওয়া যায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির কারণে। অর্থনীতি শক্তিমান হলে অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা যায়, জ্ঞান বিজ্ঞানে প্রসার আনা যায়, লেখক কবিরা নতুন সমাজে যে হাওয়া ও পুষ্টি পায় তাতে তারাও তাদের সৃষ্টিতে নতুন শব্দ প্রয়োগে ভাষাকে সমৃদ্ধ করে তোলে এবং ভাষা একটা অখণ্ড শক্তি হিসেবে রাষ্ট্র-মানুষ-সমাজ জীবনে নতুন প্রবাহ-প্রবণতার সৃষ্টি করে। সে ক্ষেত্রে অন্য জাতিগুলো যারা দুর্বল তাদেরও ভাষা রয়েছে, সে খানিকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং বিশ^পরিমণ্ডলে স্থানীয় ভাষারূপে খানিকটা খুঁড়িয়ে, ল্যাঙচিয়ে চলে।
দার্শনিক লুদভিগ হিটগেন্সটাইন তাই বলেছেন, ‘আমিই হলাম আমার পৃথিবী।’ তবে আমাদের প্রেম, ভালোবাসা, সমাজ, রাজনীতিসহ কোনো কিছুই সঠিকভাবে চলবে না ভাষা ছাড়া। সাহিত্য-সৃষ্টির দর্শন বা সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ক যেকোনো আলোচনা করতে গেলে বস্তু, ধারণা কিংবা বিষয়ের সাথে ভাষাচিহ্নের সম্পর্ক কী তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন আর ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক আধুনিক ব্যাখ্যা দিতে গেলে সস্যুরের ভাষাতত্ত্বকে উপস্থিত করতে হয়।’
সস্যুর ভাষাব্যবস্থার অন্তরগত উপাদানকে দু’ভাগে বিভক্ত করেছেন। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষ তার নিজস্ব অবচেতনে ভাষা সম্পর্কীয় যে সহজাত উপলব্ধি বা নিয়মগুলোকে গ্রাহ্য করে কিংবা পরস্পরের মাঝে ভাব আদান-প্রদানের জন্য ভাষার যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা মানবসমাজের ওপর ক্রিয়াশীল, তাকে সস্যুর ‘ল্যাগ বা ভাষামূল হিসেবে চিহ্নিত করেন’। ভাষাচিহ্ন প্রয়োগের ফলে একজন ব্যক্তি মানুষের মনে জগৎ ও জীবন সম্পর্কীয় যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং প্রকাশ পায় তাকে তিনি বলেছেন, ‘প্যারোল বা মুখের ভাষা’। তিনি একটা সহজ ও সরল সমীকরণে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেনÑ
‘ভাষাচিহ্ন = দ্যোতক/দ্যোতিত’
সস্যুরের তত্ত্ব অনুযায়ী ভাষাচিহ্নের বিপরীতে দ্যোতক ও দ্যোতিতের অবস্থান নির্ধারণ করা গেলেও কোনো বস্তু বা বিষয়কে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত করা যায় না, ফলে ভাষা একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় ‘ভাষাচিহ্ন, দ্যোতক ও দ্যোতিতের ক্রিয়া-বিক্রিয়া বা সম্পর্ক উপস্থিত। ভাষাচিহ্ন, আমরা যখন রাস্তায় ট্রাফিক বাতির লাল, নীল ও হলুদ আলো দেখি তখন আমাদের অবচেতনে অবস্থিত ভাষাকাঠামোকেই ‘লাল’, ‘সবুজ’ ও ‘হলুদ’ শব্দচিহ্নকে তিনটি নির্দিষ্ট দ্যোতক ও দ্যোতিতের ধারণা হিসেবে উপস্থিত করি। ভাষাচিহ্নের দ্যোতক-দ্যোতনা সবসময় ভাষাব্যবস্থার অন্তর্গত অন্যান্য ভাষা-চিহ্ন-সেট বা দলের সাথে তুলনার মাধ্যমে অর্থ পায়। আমরা লাল রঙকে লাল বলে ভাবি কারণ তা সবুজ নয়, হলুদ নয় কিংবা বেগুনি নয় আর সবুজ রঙ হলুদ, লাল, বেগুনি কিংবা বর্ণালীর অন্যান্য রঙের মতো না হওয়ার কারণে আমাদের কাছে সবুজ হিসেবে অর্থবোধক’।
‘পাশ্চাত্যে গ্রিক দার্শনিকেরা প্রথম ভাষার তত্ত্বের ব্যাপারে আগ্রহী হন। ভাষার উৎস ও গ্রিক ভাষার ব্যাকরণগত কাঠামো ছিল তাদের মূল বিতর্কের বিষয়। প্লেটো ও অ্যারিস্টেটল ভাষার অধ্যয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। প্লেটো গ্রিক শব্দসমূহের বুৎপত্তি নিয়ে গবেষণা করেন এবং ধারণা করা হয় পাশ্চাত্যে তিনিই প্রথম বিশেষ্য ও ক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য করেন। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে দিওনিসিয়ুস আরো কেউ কেউ প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রিক ব্যাকরণ রচনা করেন। এটি পাশ্চাত্যে ঐতিহ্যবাহী ব্যাকরণের ধারা শুরু করে। রোমান ব্যাকরণবিদ আইলিয়ুস দোনাতুস এবং প্রিস্কিয়ান খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে গ্রিক ব্যাকরণের পদ্ধতিগুলো লাতিন ভাষার উপর প্রয়োগ করেন। লাতিন ও গ্রিক উভয়েই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা এবং এদের মধ্যে গঠনগত সাদৃশ্য ছিল; ফলে গ্রিক ব্যাকরণের অনুসরণে লাতিন ব্যাকরণ লেখা সম্ভব হয়েছিল।’
যাই-ই হোক তত্ত্ব সামগ্রিক বিষয়কে বোঝার জন্য হলেও সাধারণ ক্রিয়ায় ভাষা একটি জাতির প্রাণ। ভাষা না থাকলে মানুষ যেমন মানুষ হতে পারত না, পারিবারিক সামাজিক এই জীবনও আয়ত্তে আনতে পারত না। কারণ সভ্যতার এই গতি সামগ্রিক এবং ক্ষুদ্র-সমাজ থেকে বৃহত্তর মানবসমাজ বিশ^পরিমণ্ডলে বিস্তৃত। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ঐক্য বৃহৎ ঐক্যের পটভূমিতে যুক্ত হয়, আর আজকের পৃথিবীতে ভাষান্তরও একটি ক্রিয়া। যার মাধ্যমে এক জাতি অন্য জাতি থেকে নিতে পারে, দিতে পারে। সুতরাং ভাষা একটা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও যার মধ্য দিয়ে মানুষের চিন্তাগুলো অনূদিত হয় ও বিকাশ লাভ করে। ভাষা না হলে মানুষ তার চেতনাকে অন্য সামগ্রিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারত না, আবার অন্যের চেতনাকে নিজ চেতনায় যুক্ত করে নিজ চেতনাকে সমৃদ্ধও করতে পারত না। ভাষা মানুষকে অধিকার কর্তব্য রাজনৈতিক সচেতনতাকে জাগ্রত করে, অধীন হওয়া থেকে আত্মরক্ষার সুযোগ করে দেয়। মোট কথা যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় একটি জাতিকে সংহতির মধ্যে নিয়ে আসে। আর কোনো একটি রাষ্ট্রে একক ভাষা যা সবার বোধগম্য সে তো জাতিকে শক্তিশালী সমাজ কাঠামোতে উত্তোরিতে প্রবল সহযোগিতা জোগায়।
আমরা বাঙালি এবং ভাষার দিক থেকে একটি অখণ্ড ভাষার বন্ধনে আমরা যুক্ত রয়েছি পরস্পরে বহুকাল। বঙ্কিম, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ বা তদপরবর্তী কবি সাহিত্যিকরা আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথই বাংলা ভাষাকে তার সৃজনকৃতির মাধ্যমে বিশ^-দরবারে উপস্থাপিত করে এর আজকের মর্যাদা লাভের পথ করে দিয়ে গেছেন। সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের ভাষা-সাহিত্য। নজরুল অনেক আরবি ফার্সি উর্দু শব্দ বাংলায় অবলীলায় ব্যবহার করে ভাষার শব্দভাণ্ডারে নতুন শব্দের যোজনা দিয়েছেন। জীবনানন্দ তার সৃষ্টিতে শব্দের ব্যবহার বহুমাত্রিকতাসহ ভাষ্যগুলোতে এক অন্তর ভাষা সৃষ্টি করে বহুস্বরিক ভাষা কাঠামো তৈরি করে গেছেন। এভাবেই আমাদের মাতৃভাষা শক্ত পোক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারল এবং বাঙালির চেতনা জগতে তার একটা পরিচিতি তৈরিতে স্পষ্ট হলো।
আমাদের ভাষা আন্দোলনও আজ স্বীকৃত পেয়েছে মর্যাদায় আসীন হয়েছে। এখন দরকার এর সমৃদ্ধি, এর চেতনাকে সর্বমাত্রিকতায় বিকশিত করা ও ছড়িয়ে দেয়া যা ক্ষমতাবানেরা কুক্ষিগত করেছে এবং এর অন্তরসত্যকে শুধু ভাষা আন্দোলন এই বলে চালিয়ে দিচ্ছে। সংস্কৃতির উন্নয়ন, সাহিত্য চর্চা, গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুবাদ মনস্কতার মধ্য দিয়ে সামগ্রিকভাবে এই চেতনাকে উজ্জ্বল করা যেতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন ভাষার উৎকর্ষতার মধ্য দিয়ে একটা জাতি যেমন শক্তিশালী হয় তেমনি বিশ্ব থেকে নেয়া ও বিশ্বকে দেয়ার ক্ষমতাও অর্জন করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের ভাষার ওপরও ক্রমান্বয়ে আগ্রাসন তীব্র হচ্ছে। দেশীয় সৃজনশীলতা আক্রান্ত হচ্ছে, লেখক শিল্পীরা নানা কিছুতে বিভ্রান্ত হয়ে সৃষ্টির ক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করছে। পুরস্কার ও প্রাপ্তির লোভ তীব্র হয়ে উঠেছে। বাংলা একাডেমি তার দায়িত্ব যথাযথ পালন না করে ভাষা সংহতকরণের ক্ষেত্রে দায়সারা কাজ করছে। ফলে বাংলা একাডেমির বানানরীতি, অন্য কিছু প্রতিষ্ঠানের বানান রীতি, কিছু কিছু বুদ্ধিজীবীদের ভাষা রীতি ভাষাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে আতঙ্কই সৃষ্টি করছে এবং মুছে যাচ্ছে ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত তাৎপর্য।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.