হারিয়ে যাচ্ছে জারি সারি ও কবিগান

মোহাম্মদ মহসীন

যদি শুনে কবির কথা, ঠেইল্যা ফেলে গায়ের কাঁথা। কবিগান যেন মনে করিয়ে দেয় আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের বাঁধনের কথা। এরই ধারাবাহিকতায় সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া শায়খ আবুতাওয়ামা, ইব্রাহিম দানেশমান্দের সমাধি, শেখ মুহাম্মদ ইউসুফ এর দরবারে প্রতি বছরের মতো ১২ মাঘ কবিগানে হাজারো দর্শকের সমাগম ঘটে। এখানে এসে কেউ বা হাসে কেউ বা কাঁদে বোঝা বড় দায়। পাশাপাশি ভবনাথপুর গ্রামে ছালাম ফকিরের বাড়িতে অগ্রহায়ণের ১৯ তারিখ, লাহাপাড়া গ্রামে লিংকনের বাড়িতে ১ অগ্রহায়ণ এবং আহম্মদ ফকিরের বাড়িতে পৌষের ৭ তারিখে প্রাচীন ঐতিহ্যের কবিগানের আসর দিন তারিখে উভয়ের বাড়ির ঠোনে নিজ নিজ উদ্যোগে দু’দিন আবার কারো বাড়িতে দিনব্যাপী বার্ষিক কবিগানের আসর বসে দিন তারিখে। শীতের আগমন ঘটলে বিদ্যালয়ের মাঠে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হতো,পাড়া-মহল্লায় স্টেজ করেও অনুষ্ঠান হতো। গ্রামবাংলায় বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকত পাশাপাশি গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সমন্বয়ে কবিগান, জারিগান, সারিগান, যাত্রা, পালাগান, গম্ভীরাগান, গাজী- কালুরগান, লাইলী-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, রাধা-কৃষ্ণ (একনাম) প্রভৃতি পরিবেশন ও উপস্থাপিত একসময় করা হতো। বর্তমানে সোনারগাঁ কারুশিল্প মেলায় অনুষ্ঠানে আছেÑ বাউলগান, পালাগান, কবিগান, যাত্রাপালা, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালী গান, জারি-সারি গান, হাছন রাজার গান, লালন সঙ্গীত, মাইজভাণ্ডারী, মুর্শিদী গান, আলকাপ গান, শরিয়তি-মারফতি গান, লোককবিতা পাঠের আসর, পুঁথিপাঠ, লোকগল্প বলা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে লোকসঙ্গীত পরিবেশনও করেন।

আর এই পালাগানের মাঝে বাঙালির প্রাণের অস্তিত্বের আনন্দ জাগরিত হতো। আর অতীতের কবিগানে মিলনমেলার মজাই ছিল আলাদা। আবার অতীতে গাঁও-গ্রামের প্রচলিত উৎসবকে কেন্দ্র করে মেয়ে নাতি নাতকর ও কুটুমকে মেলা উপলক্ষে বক্শিশ করা। সেই প্রথা এখন নেই। সেকালের মিলনমেলায় সারাটা দিন কাটত আনন্দ আর উৎসবে। সেই ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও পাণ্ডুলিপির স্মৃতিচারণে মলিন মুখে আওয়াজ চায়ের দোকানে বর্ষীয়ানরা বলা বলি করে থাকেন। পাড়া মহল্লায় আনাগোনা এখনো বিদ্যমান। জনশ্রুতিতে ‘হারানো ধন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর’। ইতিহাসে থাকবে শিক্ষণীয় কবিগান স্মৃতি খোঁজে পাওয়া যাবে না। এতিহ্যের সেই কথা এখন অতীত। এদিক ওদিক তাকালে অতীত ঐতিহ্য আর বর্তমান ঐতিহ্যে মলিন বলা চলে। গাঁও-গ্রামের খোরাক জনপ্রিয় এ কবি গান প্রায় বিলুপ্তির পথে। এই কবিগানের সাথে নতুন প্রজন্মের পরিচিতি না থাকলেও বর্ষীয়ানেরা আজও কল্পনায় খুঁজে বেড়ান অতীতের আসর। যেখানে মুহূর্তে কবিতা, গান কথার ছলে কথা বের হয়। সেই কবিগান আয়োজনে থাকে, তর্ক আর গানে-গানে পাল্টাপাল্টি যুক্তি দুই কবিয়ালের লড়াইয়ে কবিগান শুরু হয়। তাদের হাতিয়ার হারমনিয়াম, ঢোল, বাঁশি, কাশা, বেহালাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটায়। কাছের ও দূরের শত-শত পুরুষ, মহিলা শ্রোতা এ গান উপভোগ করেন। এবারের আসরে পালা গান পরিবেশন করছেন কয়েক বাড়িতে ও সোনারগাঁ লোক-কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত লোকজ মেলায় শিল্পী লিপি সরকার, লুতু সরকার, কবির সরকার, আলম দেওয়ান, সাগর দেওয়ান, মারিয়া দেওয়ান, রুবী সরকার, জীবন দেওয়ান, কুদ্দুস বয়াতি, স্বনামধন্য শিল্পী ঝর্ণা, সাঈদা ইসলাম ও পাগল মনির। এ গানের আসরকে কেন্দ্র করে খানাপিনার পাশাপাশি চলে ঐতিহ্যের বাঁধনে গ্রামীণ মেলা। পাশর্^বর্তী উপজেলা মেঘনা থানার গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবেও বড়সর করে এ কবিগানের আয়োজন করে থাকেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা কাজে সময় ব্যয় করতে হয় আর শত ব্যস্ততার মাঝেই মনের খোরাক হয়ে থাকে গ্রামীণ কবিগানের আসর। এই কবিগান এখনো শোনা যায় পাশাপাশি ঐতিহ্যের সংস্কৃতির সাথে আধুনিক প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দেয়ার সুযোগও কম নয়। হারানো ঐতিহ্যের স্বাদ বর্তমান ঐতিহ্যের স্বাদ এক নয়। জনশ্রুতিতে আছে আজকের ‘দিনটি’ ভালো পরের দিনটি কেমন যাবে তা বলা মুশকিল। সেই গানের ঐতিহ্য এখন আর চোখে পড়ে না, হারিয়ে যেতে বসেছে প্রকৃতি থেকে। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় নানা আয়োজনে পুনরুদ্ধার করা হলে গ্রামবাংলায় আগের রূপবৈচিত্র্যের সমন্বয়ে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। কবিগানে আনন্দ আর উল্লাস এখন নেই, তারপরও বৈশাখ উপলক্ষে শহরকেন্দ্রিক ব্যস্ত মানুষ বৈশাখী ছুটিতে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরেন অনেকে।
গ্রামবাংলায় লোক সংস্কৃতির ঐতিহ্য জারি, সারি কবিগান হারিয়ে যাচ্ছে। একে রক্ষা করা প্রয়োজন। বাংলার বিখ্যাত বাউল গায়ক আবদুল করিমের প্রচলিত গানটির কথা মনে পড়ে গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম...!

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.