নিজ আঙিনায় পরবাসী ভারত
নিজ আঙিনায় পরবাসী ভারত

নিজ আঙিনায় পরবাসী ভারত

আসিফ হাসান

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত। আয়তন, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি- কোনো দিক থেকেই তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কেউ নেই। এ অঞ্চলকে সে নিজের আঙিনা মনে করত। করার কথাই। দু-একটি দেশ ছাড়া সব দেশের ওপর তার একচ্ছত্র আধিপত্যও ছিল। ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপের ওপর তার প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু কী থেকে যেন কী হয়ে গেল। একে একে সব দেশই হাতছাড়া হয়ে যেতে লাগল।

পাকিস্তান কোনোকালেই ভারতের প্রভাব-বলয়ে ছিল না। এই বৈরিতা দেশ দু’টির সৃষ্টির সাথে সম্পৃক্ত। নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে এই কিছু দিন আগেও প্রবল প্রভাব ছিল। শ্রীলঙ্কায় তো তারা বিপ্লবই (!) করে ফেলেছিল। চীনা প্রভাবে থাকা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসেকে যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, সেটাকে নির্বাচনী ক্যুই বলা যায়। রাজাপাকসের ঘনিষ্ঠজন মাইথ্রিপালা সিরিসেনাকে সামনে রেখে রনিল বিক্রমাসিঙ্গেকে দিয়ে জোট গঠন করা হয়েছিল। তাতে বাজিমাত। অকল্পনীয়ভাবে হেরে যান রাজাপাকসে। খুশি হয়েছিল ভারত। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে দেখা গেল, এই সরকারও ভারতের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।
তবে চলতি সপ্তাহে যা হলো, তাতে আরো ভয়ের কারণ সৃষ্টি হয়েছে ভারতের জন্য। শ্রীলঙ্কার জনগণ সিরিসেনা-বিক্রমাসিঙ্গের বিরুদ্ধে জবাব দিয়ে দিয়েছেন। আর বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের। এবার তিনি নির্বাচন করেছেন তার নতুন দল শ্রীলঙ্কা পোদুজানা পেরামুনার (এসএলপিপি) ব্যানারে।

ফুলের কুঁড়িকে প্রতীক হিসেবে নিয়ে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটেছে রাজাপাকসের। তারই নতুন দল প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার নেতৃত্বাধীন এসএলএফপির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনে সাধারণত যেমনটা হয়ে থাকে, চলতি মাসের নির্বাচনে সেরকম ছিল নাম। অর্থাৎ ড্রেনেজ সিস্টেম, পয়োনিষ্কাশন বা রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের ব্যাপারগুলো খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি যে পরিবর্তন এসেছিল ক্ষমতায়, তার পক্ষে-বিপক্ষে একটা মতের প্রকাশ এই নির্বাচন। নির্বাচনের একটা প্রধান বিষয় হলো গত তিন বছরে সরকারের দুর্বল কর্মক্ষমতার প্রতি একটা প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে উন্নয়নের বিষয়গুলোকে অবজ্ঞা করার জবাব দেয়া হয়েছে এই নির্বাচনে। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বেশ কিছু দেশের সাথে অনেক সমঝোতা স্মারক সই করা হলেও সেগুলো বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

তবে, ভোটের ধরনটা অনেকটা জাতি ও ধর্মীয় ধারায় প্রভাবিত হয়েছে। তামিল, মুসলিম ও স্থানীয় খ্রিষ্টানদের ভোট গেছে মূলত ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির কাছে। অন্য দিকে বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু এলাকার ভোট গেছে মূলত রাজাপাকসের কাছে।
যদিও যুদ্ধে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের শোক প্রশমনে বা নতুন সংবিধান বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে খুব সামান্য পদক্ষেপই নেয়া হয়েছে। তার পরও তবু সংখ্যালঘু তামিল ও শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা অপেক্ষাকৃত ‘কম ক্ষতিকর’ রনিল বিক্রমাসিঙ্গের দলকে ভোট দেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় খুঁজে পায়নি।

তবে, সার্বিক ভোটের ধরনে এটা পরিষ্কার, ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারির নির্বাচনে যে লিবারেল ভোটগুলো সিরিসেনার পক্ষে গিয়েছিল, সেগুলো এবার গেছে রাজাপাকসের কাছে। আর একে ভর করেই নতুন ছক কষতে পারবেন রাজাপাকসে।
এসএলএফপির ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ পরাজয়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার সান্ত¡নার জায়গাটুকু হলো তার নিজের নির্বাচনী এলাকা পোলোন্নারুয়াতে দলের বিজয়। সেখানে এসএলপিপির ৫৫৩০ ভোটের (৩ আসন) বিপরীতে সিরিসেনার এসএলএফপি পেয়েছে ৯০২০ ভোট (৫ আসন)।
ইউএনপি জিতেছে মাত্র ৩২.৩১ শতাংশ ভোট (২১৬২ স্থানীয় সরকার সদস্য), এসএলপিপি জিতেছে ৪৫.১৪ শতাংশ ভোট (৩১০৯ সদস্য)।

প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ইউএনপি মাত্র ২৬টি স্থানীয় সরকার ইউনিটে জিতেছে, বিরোধী এসএলপিপি জিতেছে ২০০টিতে। তবে কলম্বোতে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছে ইউএনপি, যেখানে তাদের মেয়রপ্রার্থী রোজি সেনানায়েক কলম্বোর প্রথম নারী মেয়র হিসেবে জয়ী হয়েছেন।
সিরিসেনার ঘনিষ্ঠজনরা বলেছেন, নির্বাচনে জয়ের আশা করেননি সিরিসেনা, কিন্তু এত বড় পরাজয় তার কল্পনায় ছিল না। নির্বাচনের ফলাফলে কথিত ‘হতভম্ব’ প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা এসএলএফপি সদস্য এবং মন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক ডাকেন এবং বেশ কিছু পরিবর্তন আনার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।

এসএলএফপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে যৌথ সরকারের এমপি মিডিয়াকে বলেছেন, পরাজয়ে বিব্রত দলের নেতাদের কথা ধৈর্যের সাথে শুনেছেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা।
জানা গেছে, এসএলএফপির প্রায় সব সদস্যই এসএলপিপির সাথে কাজ করার ব্যাপারে মত প্রকাশ করেছেন এবং মাহিন্দা রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী সুশীল প্রেমাজয়ন্ত বলেন, যেহেতু ইউএনপি এবং এসএলএফপি নজিরবিহীন পরাজয় বরণ করেছে, এখন জনগণের রায় অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এসেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার সিরিসেনার রয়েছে।
তবে এর মাধ্যমে রাজাপাকসের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ল। পার্লামেন্টারি ক্যুর মাধ্যমে রাজাপাকসে হতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। তা ছাড়া শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের হাতে অনেক ক্ষমতা। তিনি চাইলে রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করতে পারেন। রাজাপাকসেকে ঠেকানোর জন্যই মূলত সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কেউ দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। ফলে সংবিধান পরিবর্তনের আগে প্রধানমন্ত্রী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে রাজাপাকসেকে। আর তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে লাইমলাইট থাকবে তার ওপরই। তিনিই দেশের হাল ধরবেন।

মালদ্বীপ থাকছে চীনেরই
বিচার বিভাগীয় ক্যুর মাধ্যমে মালদ্বীপে বড় ধরনের পরিবর্তন সৃষ্টির আভাস দেখা গিয়েছিল। কিন্তু যতটুকু মনে হচ্ছে, চীনা-সমর্থনপুষ্ট ইয়ামিন টিকে যাচ্ছেন। বিচার বিভাগ আবার সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। পার্লামেন্টেও সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এখন আবদুল্লাহ ইয়ামিন যদি তার প্রতিশ্রুতি মতো নির্বাচন দিয়ে কাক্সিক্ষত জয় হাসিল করতে পারেন, তবে দেশটিতে চীনা প্রভাব টিকে থাকতে পারে। মোহাম্মদ নাশিদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভারত দেশটিতে সেনাবাহিনী পাঠায়নি। ফলে অন্তত প্রকাশ্যে ভারত মহাসাগরীয় দেশটিতে চীন-ভারত লড়াই দেখা যায়নি।

যে মালদ্বীপে ২০১১ সালের আগে চীনা দূতাবাসই ছিল না, সেই দেশে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। মালদ্বীপের একসময়ের স্লোগান ছিল ‘ভারত প্রথম’। এখন তা হয়ে গেছে ‘চীন প্রথম’। মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি সইসহ বিভিন্নভাবে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে চীন ও মালদ্বীপ। মালদ্বীপ এখন চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অন্যতম কেন্দ্র। ভারত মহাসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মালদ্বীপের অবস্থান। চীন চাইবে না একে হাতছাড়া করতে। আবার ভারতের কষ্ট এখানে। গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রটি হাত ফসকে যাওয়ায় অনুতাপে মরছে ভারত।
আর নেপালকে বলা যায়, জোর করে চীনের কাছে ঠেলে দিয়েছে ভারত। বড় ভাইসুলভ নীতির কারণে নেপাল বাধ্য হয়েছে চীনের কাছে ছুটতে। আর সেই ছোটা হয়েছে জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই। ভারতকে এখন তা হজম করতেই হচ্ছে।

ভুটানেও কিন্তু বাড়ছে চীনা প্রভাব। চীন ক্রমান্বয়ে ভুটানে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। দূতাবাস খোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভারতের প্রত্যক্ষ বিরোধিতার কারণে তা পেরে উঠছে না। তবে খুব বেশি দিন ভুটানকে আটকেও রাখতে পারবে না বলে মনে হচ্ছে। দোকলামের মতো ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভারতের জন্য তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে। দোকলাম নিয়ে তাদের সমীকরণ নেই। এই মালভূমি হারালেও তাদের ক্ষতির কিছু নেই। চীন তো আরো বেশি ভূমি দিয়ে বিরোধের মীমাংসা চাচ্ছে। হয়তো কোনো একদিন তারা তা লুফে নেবে। তখন এই ভুটানও হাতছাড়া হয়ে যাবে তাদের। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.