দুই কোরিয়ার সম্পর্কের বরফ গলছে
দুই কোরিয়ার সম্পর্কের বরফ গলছে

দুই কোরিয়ার সম্পর্কের বরফ গলছে

আনিসুর রহমান এরশাদ

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দশককাল ধরে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া দুই প্রতিবেশী দেশ। বৈরী সম্পর্ক ও দীর্ঘ দিনের উত্তেজনা চলা দেশ দু’টির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলছে। পায়োংচ্যাংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকে জনসম্মুখে দুই দেশই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। পানমুনজমে দুই কোরিয়ার প্রতিনিধিদের বৈঠক, উত্তর কোরিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সফর ও ব্লু হাউসে মধ্যাহ্নভোজ, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের ছোট বোনের সাক্ষাৎ, খোলামেলা-উদার-উষ্ণ আলোচনা, নিজে হাতে চিঠি লিখে মুনকে পিয়ংইয়ংয়ে বৈঠকের জন্য কিমের আমন্ত্রণ ও মুনেরও এ ব্যাপারে সদিচ্ছা প্রকাশ- এসবই দুই কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন ও সিউলের মধ্যে মিত্রতায় ছেদ এবং দুই কোরিয়ার পুনর্মিলনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

দুই কোরিয়া পরস্পরের সাথে কথা বলাকে ভালো লক্ষণ ও ভালো উদ্যোগ বলেছে জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হেলি। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স জানিয়েছেন, ‘শীতকালীন অলিম্পিক উপলক্ষে দুই কোরিয়ার মধ্যে সংলাপ আলোচনা-অনুষ্ঠিত হলেও উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একজোট রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া সব ধরনের চাপ অব্যাহত রাখবে এবং উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। উত্তর কোরিয়াকে চাপে রাখতে সিউলের সাথে ওয়াশিংটনের ঐকমত্য ও পূর্ণ সমঝোতা রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ও দূরপাল্লার-আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চূড়ান্তভাবে বন্ধ না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখতে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় যুক্তরাষ্ট্র।’

অপর দিকে জাতিসঙ্ঘকে দেয়া এক চিঠিতে উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ইয়ং হো জানিয়েছেন, ‘শীতকালীন অলিম্পিকের পর স্থগিত থাকা কোরীয় উপদ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার কার্যক্রম আবারো শুরু হলে অলস বসে থাকবে না উত্তর কোরিয়া। ফলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠবে এবং সেজন্য দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকাকে দায়ী থাকতে হবে।’ উত্তর কোরিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হান সং রিয়ল বলেছিলেন, ‘আমাদের শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা রয়েছে। আর মার্কিন হামলার মুখে আমরা নিশ্চিতভাবেই সে অস্ত্র হাতে নিয়ে বসে থাকব না। মার্কিনবাহিনী যেভাবে আক্রমণ করবে আমরা তার সমুচিত জবাব দেয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। উত্তর কোরিয়া মানসম্পন্ন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে সরে আসবে না।’ দেখা যাচ্ছে সম্পর্কের বরফ গলার নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনাও রয়েছে।

উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে জাতিসঙ্ঘ। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, অবরোধ কঠোর করার কারণেই সংলাপে আগ্রহ দেখিয়েছে উত্তর কোরিয়া। ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে- ‘পাগলা কুকুর’, ‘পুঁচকে রকেট মানব’ থেকে শুরু করে ‘ঢ্যাপসা বামন’সহ আরো কত কিছু বলেছেন! তিনি উত্তর কোরিয়াকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করতে চেয়েছেন এবং পিয়ংইয়ংয়ের সাথে আলোচনাকে ‘সময় নষ্ট’ করা বলে আখ্যায়িত করেছেন। উত্তর কোরিয়ার আশপাশে যুদ্ধজাহাজ ও বোমারু বিমান মোতায়েন করে আতঙ্ক ছড়াতে চেয়েছেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে বলেছে, উত্তর কোরিয়ার ওপর কিভাবে হামলা চালানো যেতে পারে, সেই পরিকল্পনার প্রতিবেদন পেন্টাগনের কাছে চেয়েছে হোয়াইট হাউজ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তা না হলে তিনি বিশ্বের মানচিত্র থেকে পিয়ংইয়ংয়ের নাম মুছে ফেলবেন। অন্য দিকে পিয়ংইয়ং বলেছে, যতদিন দেশটির বিরুদ্ধে মার্কিন হুমকি অব্যাহত থাকবে ততদিন পরমাণু অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাবে উত্তর কোরিয়া। এভাবে আমেরিকার কাছে গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার সাথে গলায় গলায় পিরিত এখন রাশিয়া ও চীনের। অন্য দিকে আমেরিকার সাথে তাল মেলাচ্ছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘বস্তুনিষ্ঠ আলোচনাই কোরীয় উপত্যকার সঙ্কট সমাধানের একমাত্র উপায়। সঙ্কট নিরসনের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে চীন। প্রথমত, উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করার পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সবপক্ষকে আলোচনার টেবিলে আসতে হবে। এর লক্ষ্য হবে, কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করে শান্তিচুক্তি সই, যা পুরনো কোরিয়ান ওয়ার আর্মিস্টাইস অ্যাগ্রিমেন্টকে প্রতিস্থাপন করবে।

উত্তর কোরিয়ার সাথে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ বহুদিনের। অথচ বিরল এক ঘোষণায় দুই কোরিয়ার একত্রীকরণের ডাক দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। উভয় কোরিয়ার একত্রীকরণের এ ডাককে সাদরে গ্রহণও করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। উত্তর কোরিয়া ঘোষণায় বলেছে, ‘অন্য কোনো দেশের সাহায্য ছাড়াই পুনরায় একত্রীরণের জন্য দেশে-বিদেশে থাকা সব কোরীয়দের পদক্ষেপ নিতে হবে। কোরীয় উপদ্বীপে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি ও সামরিক উত্তেজনা দমাতে কোরীয়দের ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া উচিত। তাদের উচিত উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে যোগাযোগ, ভ্রমণ ও সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা। কোরীয় উপদ্বীপের পুনরেকত্রীকরণের ক্ষেত্রে পিয়ংইয়ং সব প্রতিবন্ধকতা গুঁড়িয়ে দেবে। কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি একত্রীকরণের জন্য বিপজ্জনক। উপদ্বীপজুড়ে বিরাজমান সামরিক উত্তেজনা দুই কোরিয়ার সম্পর্কোন্নয়ন ও পুনরেকত্রীকরণের ক্ষেত্রে মৌলিক বাধা। উত্তর ও দক্ষিণের সম্পর্কের উন্নতির ক্ষেত্রে বাইরের শক্তির সাথে চালানো যৌথমহড়া অকেজো। চলতি বছরটি দুই কোরিয়ার জন্য অর্থবহ।’ এখন দু’দেশে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মধ্যে বৈরী সর্ম্পক কাটিয়ে কতটা সামনে এগিয়ে যেতে পারে তা দেখার বিষয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.