ঢাকা, সোমবার,১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

মধ্যপ্রাচ্য

'ইরানের নির্দেশনা অনুযায়ী চলে মার্কিন জাহাজ'

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ১৭:১৮


প্রিন্ট
'ইরানের নির্দেশনা অনুযায়ী চলে মার্কিন জাহাজ'

'ইরানের নির্দেশনা অনুযায়ী চলে মার্কিন জাহাজ'

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি'র নৌ বিভাগের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ফাদাভি বলেছেন, পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরে আমেরিকা ও তার ছয়টি মিত্র দেশের জাহাজ চলাচলের জন্য জলপথ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ইরানের নির্ধারণ করে দেয়া পথ ধরেই ওই সব দেশের জাহাজ চলাচল করছে।

মঙ্গলবার তেহরানে নৌবাহিনীর এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

ফাদাভি আরো বলেছেন, ইরান তার সার্বভৌমত্ব অনুযায়ী পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী এবং ওমান সাগরে ওই সব দেশের জাহাজ চলাচলের জন্য পথ নির্ধারণ করে দিয়েছে। তারা সেটা মেনেই চলাচল করছে। এসব দেশ এখন পর্যন্ত নির্ধারিত নীতিমালা লঙ্ঘন করে নি বলে তিনি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে কোনো বিদেশি জাহাজকে সেখানে বর্জ্য ফেলতে দেয়া হয় না।

ইরানের বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ বিনিয়োগ

ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে এলেও এর পেছনে মিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন তথ্য দিয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক নাফিজ আহমেদ। ব্রিটিশ এই লেখক দ্য গার্ডিয়ানে একসময় টানা ১৬ বছর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন তার সাংবাদিক জীবনে। ইনস্টিটিউট ফর পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

শুধু নাফিজ আহমেদ নন, ইরানে এর আগেও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি বা অন্য কোনো অচলাবস্থা কাজে লাগিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা যে হয়েছে তা মার্কিন মিডিয়াগুলো বলেছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইরানে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে এমন দাবি করেন সিআইএ’র সাবেক এক বিশ্লেষক কেনেথ কাৎজম্যান। ইউএস ডিপার্টমেন্ট ও ইউএসএইডের বিভিন্ন দলিল উপস্থাপন করে তিনি কোটি ডলারের ওপর এ উদ্দেশ্যে খরচ হয় বলে দেখিয়েছিলেন। এসব টাকা খরচ হয়েছিল ন্যাশনাল এনডোওমেন্ট ফর ডেমোক্র্যাসির মাধ্যমে। এই একই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার কাজেও।

তবে এবার ইরানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও বেকারত্ব নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হতে না হতেই তাতে সমর্থন দিয়ে বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার অনুসারী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও এমনকি সৌদি আরব। একপর্যায়ে ট্রাম্প বলেও ফেলেন, সঠিক সময়েই ইরানের জনগণ দেখতে পাবে মার্কিন সমর্থন। ইরান সরকার শুরু থেকেই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল দেশটির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী রাস্তায় নামে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি দাঙ্গার বিরুদ্ধে সরকারের সমর্থনে আরো ব্যাপক মিছিল ও সমাবেশ রাজপথে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একই সাথে ইরান সরকারের ওপর দেশটির সংসদে এমন অর্থনৈতিক উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানান, যা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ বেকারত্ব লাঘবে সহায়ক হয়। তেলের ওপর যে মূল্যবৃদ্ধি করে ইরান সরকার, সেই আয় সরাসরি কর্মসংস্থানভিত্তিক বিনিয়োগে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার মার্কিন উদ্যোগ ভেস্তে যায়। নিরাপত্তা পরিষদের প্রায় সব সদস্য দেশ স্পষ্ট বলে বসে, ইরানে বিক্ষোভ নিয়ে আলোচনার স্থান জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ নয়। কোনো কোনো দেশ এ কথাও বলে, তা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস ও সহিংসতা নিয়ে এ প্ল্যাটফর্মে আলোচনা হতে পারে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়, ইরানের সাথে যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছে; তা ভেস্তে দেয়ার জন্যই দেশটিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের প্লান অ্যান্ড বাজেট অর্গানাইজেশন বলছে, দেশটিতে বেকারত্বের হার ১২.১ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে পাঁচ শতাংশে। সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইরান বলছে, মুদ্রাস্ফীতির হার রয়েছে ১০ শতাংশে। বুঝতে হবে, তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ চেপে বসেছিল। এর ফলে ইরানের রফতানি আয় ব্যাপক হ্রাস পায়। বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মানে হয়নি। প্রায় দেড় দশক ধরে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় ইরান পারমাণবিক চুক্তি করতে সমর্থ হয়, যা এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সৌদি আরব একযোগে এর বিরোধিতা করে বলছে। কার্যত ইউরোপ, ব্রিটেন, চীন, ভারত ও রাশিয়াসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এ চুক্তির পক্ষে এবং ইরানের সাথে এ চুক্তি ভঙ্গ করলে তা উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি থেকে সরে আসতে কোনো ধরনের সমঝোতায় নেয়া খুবই কষ্টকর হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

একই দিন দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পরমাণু শক্তির অধিকারী হতে কখনোই তার দেশ দেবে না। এর বিপরীতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফ বলেছেন, তার দেশ গত ৩০০ বছরে বিশ্বের কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালায়নি। জারিফ বলেন, রিয়াদকে ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে পরস্পরের ওপর আস্থা তৈরির আহ্বান জানিয়ে জারিফ বলেন, পর্যটনশিল্পের বিকাশ, পরস্পরের সামরিক স্থাপনা পরিদর্শন এবং একে অন্যের ওপর আগ্রাসন না চালানোর চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই আস্থা সৃষ্টি হতে পারে। তিনি সৌদি আরবসহ এ অঞ্চলের সব দেশের সাথে ‘আগ্রাসন না চালানোর চুক্তি’ সই করতে তেহরানের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, সৌদি আরব ও চীনসহ এ অঞ্চলের আরো অনেক দেশের কাছে ইরানের চেয়ে বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো পরমাণু ওয়্যারহেড পর্যন্ত বহন করতে সক্ষম। অথচ তার দেশের কোনো ক্ষেপণাস্ত্রকে পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম করে নির্মাণ করা হয়নি। কারণ, ইরান গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারে বিশ্বাসী নয়।

দ্য ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্ট বুকের গত বছরের হিসাবে ইরানের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা সমতা হচ্ছে ১.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। পশ্চিম এশিয়া ও ইউরো এশিয়ার সাথে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত। পাকিস্তানের সাথে মার্কিন সম্পর্কে যত দূরত্ব বাড়ছে, ইরানের সাথে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক ততই বাড়ছে। চীনের সিল্ক রুটে যোগ দিতে ইরান অনেকখানি এগিয়েছে। ইরানে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা স্থায়ী হলে দেশটিতে আশ্রয় নেয়া ৩০ লাখ আফগান শরণার্থীর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নজর পড়ত স্বাভাবিকভাবেই। যে সৌদি জোট কাতারের ওপর অবরোধ দিয়ে বসে আছে, তার পাশে ইরান বিপদের দিনে হাত বাড়িয়েছে। ভূকৌশলগত এসব সমীকরণের দিকে লক্ষ্য রেখেও ইরানকে টিকে থাকতে হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান প্রভাব বিস্তার করছে এবং এ প্রভাব মোকাবেলায় ইসরাইল সৌদি আরবের অনেক কাছাকাছি অবস্থান করছে। কিন্তু সামরিক ব্যয়ের পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ২০১৬ সালে ইরানের সামরিক ব্যয় ছিল ১২.৪ বিলিয়ন ডলার। একই বছর সৌদি আরব ৬১.৪, ২০১৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ২৩.৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। একই সাথে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে চলতি বাজেট ঘাটতি দেশটির জিডিপির ২.১ শতাংশ, অর্থাৎ ৯.৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর তুলনায় সৌদি আরবে গত বছর বাজেট ঘাটতি ছিল দেশটির জিডিপির ৮.৯ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু সৌদি আরবে কেন ইরানের মতো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও বেকারত্ব নিয়ে বিক্ষোভ হচ্ছে না? কারণ সৌদি আরব ব্যাপক ভতুর্কি দিচ্ছে ও তেলের দামও বৃদ্ধি করেছে।

ইরানে বিক্ষোভ রাজনৈতিক সঙ্কট, কিন্তু তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির প্রশাসন। নেয়া হয়েছে সংস্কার উদ্যোগ। টেলিভিশন ভাষণে রুহানি বলেছেন, জনগণের চাহিদার একটি হলো আরো খোলা পরিবেশ। আমাদের উচিত তাদের কণ্ঠস্বর ও বক্তব্য শোনা এবং তাকে সুযোগে পরিণত করা। আমাদের উচিত সমস্যা কী জানা এবং এর সমাধান কী তাও বের করা। জনগণ তাদের মতামত প্রকাশ করছে এমন একটি উপায় যা তাদের জীবনধারণের শর্ত এবং তাদের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ইরানকে বিনিয়োগের দিকে নিয়ে যাবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫