ঢাকা, রবিবার,১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

রাজশাহী

মান্দায় সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ

এম এম হারুন আল রশীদ হীরা, মান্দা (নওগাঁ)

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ১৪:২১


প্রিন্ট

দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ। যতদুর চোখ যায় শুধু হলুদ আর হলুদ রঙে সরিষা ফুলের মাখামাখি। সরিষা ফুলের হলুদ বরণে সেজেছে নওগাঁর মান্দা উপজেলার অধিকাংশ ফসলের মাঠ। সরিষার ক্ষেতের পাশে মৌবাক্স স্থাপন করে ভ্রাম্যমান কৃত্রিম পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহ শুরু করেছেন বেকার শিক্ষিত অনেক যুবক। সচেতনতা বৃদ্ধি, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং ঋণের সুবিধা দিলে আগামীতে বাণিজ্যিক ভাবে মধু সংগ্রহ সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অফিস যায়, এ বছর উপজেলায় ৪ হাজার ২শত হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে। গত বছর সরিষার আবাদ হয়েছিল ৬ হাজার ৭শত হেক্টর জমিতে। বোরো ধান চাষ বাড়ায় সরিষা আবাদ কমেছে। মান্দা উপজেলায় প্রায় ৯০০ টি মৌবাক্স স্থাপন করা হয়েছে। গত বছর ৮ হাজার কেজি মধু আহরণ করা হয়েছিল। এ মৌসুমে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কেজি মুধ আহরণ করা হয়েছে। মধু সংগ্রহ করে লাভবান ও স্বাবলম্বী হচ্ছেন মৌচাষিরা।
মান্দা উপজেলার ভারশোঁ, বাঁকাপুর, কৈইকুড়িসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের ফসলের মাঠে সরিষা ফুল থেকে কৃত্রিম পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা। তবে স্থানীয় ভাবে মধু সংগ্রহ না হলেও রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলার দর্শনপাড়া থেকে এসে মধু সংগ্রহ করছেন দুই মৌচাষি। সরিষা ক্ষেত এলাকায় অভিনব পন্থায় ইউরোপিয়ান মেলিফেরা জাতের মৌমাছি দিয়ে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত দেখা যায় তাদের। ক্ষেতের পাশে ৬০ টি মধুবাক্স স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি বক্সে ৮টি করে ফ্রেম সাজানো আছে। সপ্তাহ পর পর ফ্রেম থেকে সংগ্রহ করা হয় মধু। গত ৬০দিনে প্রায় ২৫ মণ মধু সংগ্রহ হয়েছে।
সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি বসায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে এমন ভ্রান্ত ধারনা আছে কৃষকদের মাঝে। ফলে অনেক স্থানে মৌচাষীদের বসতে দেয়া হয়নি। এছাড়া সরিষা ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে করা হয়। ফুলে মৌমাছি বসায় মৌমাছি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
মৌচাষি রুস্তম আলী বলেন, রাজশাহী, দিনাজপুর, পাবনা, নাটোর ও নওগাঁ জেলায় প্রায় ৭মাস মধু সংগ্রহ করেন। বাকী সময় মৌমাছিকে রয়েল জেলী খাওয়াইয়ে পুষতে হয়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ হয়। মুলত সরিষা, কালাই জিরা ও লিচু ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করেন। সরিষা ও লিচুর মধু পাইকারি ২৫০ টাকা ও খুরচা ৩০০ টাকা কেজি এবং কালাই জিরা মধু পাইকারি ৪০০ টাকা ও খুরচা ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন। বেঙ্গল কোম্পানি সহ বিভিন্ন প্রসাধনী তৈরী কোম্পানির কাছে পাইকারী করেন। আমাদের মতো ক্ষুদ্র যারা খামারি আছেন তাদের উন্নত প্রশিক্ষন এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে আগামী বাণিজ্যিক ভাবে মধু সংগ্রহ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
গত নভেম্বর মাস থেকে উপজেলার কৈইকুড়ি গ্রামের মাঠে মৌবাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষি আরিফ হাসান। তিনি বলেন, রাজশাহী নিউ ডিগ্রী কলেজে অর্নাস শেষ বর্ষে পড়াশুনা করছেন। ২০১৩ সালে মৌচাষের উপর বিসিক থেকে এক মাসের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ৭০০ টাকা করে ৩৫টি ফ্রেম কিনে আনুষঙ্গিক প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে মৌচাষ শুরু করেন। খামারের নাম দিয়েছেন ‘বরেন্দ্র মৌখামার’। ২০১৬ সালে কয়েকটি জেলায় প্রায় ৫২ মণ মধু সংগ্রহ করে প্রায় ৪ লাখ টাকার মতো বিক্রি করেছিলেন। আর খরচ হয়েছিল প্রায় ৮০-৯০ হাজার টাকা। এছাড়া মৌমাছি বিক্রি করেছিলেন ৭০-৮০ হাজার টাকা। এ বছর প্রায় ৫ লাখ টাকার মতো মধু বিক্রি করবেন বলে জানান তিনি।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বলেন, কৃষকদের মধ্যে একটি ভূল ধারনা আছে এবং সচেতনতার অভাব। সেটা হচ্ছে মৌমাছি ফুলে বসলে হয়তো ফসলের ক্ষতি হয়। মৌচাষিদের কৃষকরা ক্ষেতের পাশে মৌবাক্স স্থাপনে নিষেধ করেন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। মৌমাছি ফুল থেকে রেণু সংগ্রহ করে। এতে ফুলের পরাগায়ন হয়। ফসলের জন্য এটি খুবই উপকারি এবং ফলন বৃদ্ধি করে। আগামীতে নওগাঁ জেলাকে মধু উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত পাবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় ভাবে যারা বেকার এবং যুব সমাজ আছে তারা এখনো মৌচাষে উদ্বৃদ্ধ হতে পারেনি। উদ্যোগক্তা তৈরী হলে আমরা কৃষি বিভাগের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারব। বিশেষ করে বেদে জাতী (ভ্রাম্যমান বসবাস) যদি প্রশিক্ষন নিতে চায় তাদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। একটি প্রকল্প আছে প্রশিক্ষণের জন্য এবং স্থাণী ঠিকানা হলে স্বল্পকালীন ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫