কেঁচো সার ভাগ্য বদলেছে আকবর আলী দম্পতির

আব্দুর রশীদ তারেক,নওগাঁ

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কোলা ইউপির আক্কেলপুর কামাপাড়া গ্রামের ষাট উদ্ধো দম্পতি আকবর আলী- মিনি আরা। এক মেয়ে দুই ছেলে নিয়ে সংসার তার। পৈতিক সূত্রে পেয়েছেন তিন বিঘা জমি । মেয়ে ও বড় ছেলেকে বিয়ে দিয়ে আলাদা করে দিয়েছেন। মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আর ছেলেকে আলাদা করে দিয়ে অবশিষ্ট্য সামান্য জমি দিয়ে দিন কাটত অনাহারে অর্ধাহারে। তবে আকবর আলী- মিনি আরা দম্পতির এ গল্প দুই বছর আগের। কেঁচো সার এখন ভাগ্য বদলেছে এ দম্পতির। এ সার তৈরী করে তারা এখন মাসে ১২ হতে ১৫ হাজার টাকা বাড়তি আয় করে থাকেন।

সামন্য জমি আর দুইটি গরুর দুধ বিক্রি করে যখন এ দম্পতির দিন কাটত অনাহারে-অর্ধাহারে তখন কেঁচো সার তৈরী করার পরিকল্পনা দেয় মিনি আরার ছোট ভাই। আর এ বিষয়ে পরামর্শ নিতে স্থানীয় কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শে সামান্য কিছু কেঁচো সংগ্রহ করে মাত্র চারটি চাঁড়িতে (এক ধরনের মাটির পাত্র) সার তৈরীর কার্যকম শুর করেন। ফলাফল ভাল আর লাভজনক হওয়ায় বাড়তে থাকে তাদের সার তৈরীর কার্যকম। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এখন তাদের চাঁড়ি দাড়িয়েছে ১৫০ টি। এমনকি বাড়ির আঙ্গিনা,বারান্দার পাশাপাশি শোবার ঘরেও রেখেছেন কেঁচো সারের চাঁড়ি। প্রতি চাঁড়ি হতে সার তৈরী হয় ৫ হতে ৬ কেজি। নিজের জমিতে ব্যবহার বাদে প্রতি কেজি সার বিক্রি করেন ১৫ হতে ১৬ টাকা কেজি দরে। স্থানীয় কিটনাশক ও সার ব্যবসায়ীরা এ সার পাইকারী নিয়ে যান । আবার অনেক কৃষক সরাসরি তাদের কাছ থেকেও সার কিনেন। এতে এ দম্পতির শুধু মাত্র কেঁচো সার হতেই মাসিক বাড়তি আয় হয় ১২ হতে ১৫ হাজার টাকা। আর তাদের দেখাদেখি এখন কেঁচো সার তৈরীতে আগ্রহ তৈরী হচ্ছে এলাকার কৃষকের মধ্যে। অনেকেই উদ্যোগ নিচ্ছে কেঁচো সার তৈরীর জন্য।

কেঁচো সার তৈরী করতে বেশি বেগ পেতে হয়না তাদের। কেঁচো সার তৈরীর প্রধান কাঁচামাল গোবর (গরুর বিষ্ঠা)। বাড়িতে তিনটি গাভী গরু আছে। খামারে গরুগুলো সবসময় বাঁধা থাকে। সেখানে গরুর পরিচর্যা করা হয়। কেঁচো সার তৈরীতে প্রথমে গোবরকে বালু ও আবর্জনা মুক্ত করেন। এরপর গোবরগুলো স্তুপ আকারে ১২ হতে ১৫ দিন ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দেন। এসময়ের মধ্যে গোবর থেকে গ্যাস বেরিয়ে যায় এবং কালচে রং ধারণ করে। এরপর ঐ গোবর চাঁড়িতে দিয়ে সংগৃহিত কেঁচো তার মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে। ছায়াযুক্ত স্থানে চাঁড়িটি রেখে দিলে সার তৈরীর কার্যক্রম শুরু হয়।ভাল ফলাফলের জন্য মাঝে মাঝে গোবরগুলো উলোটপালট করে দিলে ভাল হয়। আর কেঁচো যেন ইদুর বা অন্য কিছুয়ে খেয়ে ফেলতে না পারে সেজন্য কোন কিছু দিয়ে চাঁড়ি ঢেকে রাখলে আরও ভাল ফলাফল পাওয়া যায়। ১৫-২৫ দিন পর গোবরগুলো সার হয়ে গেলে নেট দিয়ে চালিয়ে কেঁচোগুলো আলাদা করে সার বাহির করে নিতে হবে। এই সার বেগুন, লাউ, আদা, হলুদ, সীম, মরিচসহ যেকোন ধরনের ফসলে ব্যবহার করা যায়। এতে ফসলে ভাল ফলাফল পাওয়া যায় এবং রাসায়নিক সার খুবই সামান্য পরিমান লাগে।

উপজেলার পার-আধাইপুর গ্রামের কৃষক ফাজেদুল ইসলাম বাচ্ছু বলেন,দশ কাঠা লাউয়ের জমিতে কেঁচো সার ব্যবহার করে আমি চমৎকার ফলাফল পেয়েছি। রাসায়নিক সার তো তেমন লাগেনি আর লাউ হয়েছে অনেক বড় বড়। আকবর ভাইয়ের এই উদ্যোগটি খুবই ভাল উদ্যোগ। আমিও কেঁেচা সারের একটি খামার করব বলে ভাবছি।

আকবর আলী ও মিনি আরা বলেন,কেঁচো সার আমাদের জীবনের একটি সৌভাগ্য ।এই সারের কারনে আমার নিজের জমিতে ফসল করতে তেমন টাকা খরচ হয় না। এখান হতে উর্পাজিৎ অর্থের কারনে সংসার চালাতে আর বেগ পেতে হয় না।

স্থানীয় উপ-সহকারী আলমগীর হোসেন বলেন, প্রথমে সামান্য কিছু কেঁচো সংগ্রহ করে দিয়ে কিভাবে সার তৈরী করতে হয় সেটা আমি আকবর আলী ও মিনিআরাকে শিখিয়ে দেয়। এভাবেই ওদের সার তৈরীর যাত্রা শুরু। তবে আমি মাঝেমাধ্যে এসে খোজ নিতাম এবং কোন সমস্যা হলে পরামর্শ দিতাম। তবে এখন ওরা আমার চেয়েও এ বিষয়ে বেশী অভিজ্ঞ।

বদলগাছী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান আলী বলেন,বর্তমানে রাসায়নিক সার ব্যবহার করার কারনে মাটি দিন দিন তার গুনাগুন হারিয়ে ফেলছে।সেকারনে পরিবেশ বান্ধব প্রদ্ধতির মধ্যে কেঁচো সার সময় উপযোগি প্রদ্ধতি। আমরা ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কৃষকদের পশিক্ষন দিয়েছি এবং আমাদের উপ-সহকারীরা সব সময় এবিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছে। সেজন্য অনেক কৃষকই এখন কেঁচো সার তৈরীতে আগ্রহি হচ্ছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.