ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বরিশাল

অন্যরকম ভালোবাসা

আমিনুল ইসলাম কাঠালিয়া (ঝালকাঠি)

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৫:০৭ | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৫:২৪


প্রিন্ট
অন্যরকম ভালবাসা

অন্যরকম ভালবাসা

উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় যদিও গ্রামীণ সেই মেঠোপথ আজকের বাংলাদেশে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না, তবুও পিচঢালা রাস্তায় গ্রামের পথে পথে এখনো মাটির গন্ধ হারিয়ে যায়নি। আর এরই মধ্যে সুনসান নীরবতা। তারই ভেতর মাঝে মাঝে ডাহুক-শালিক আর ঘুঘুর ডাকে মন ভরে যায়। হারিয়ে যাই আবহমান বাংলার রূপ রসে। দারুণ ভালোলাগায় আবিষ্ট হতে হয়।

রূপসি বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তাই লিখেছেন ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি,/তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।’ সংবাদ সংগ্রহ বা পেশাগত অন্য কোনো কাজে নয়, কেবলই বেড়ানোর উদ্দেশ্য এক পড়ন্ত বেলায় বেড়িয়ে পড়লাম আমরা দু’জন। মোটর সাইকেলে গ্রামের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া কৃষিনির্ভর ভীমরুলি গ্রাম আমাদের গন্তব্য। ছোট্ট খালের পাশ দিয়ে আঁকা-বাঁকা রাস্তা কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে চলছে। হঠাৎ এক দৃশ্য আটকে গেলাম। মোটরবাইক চালক বন্ধু রানাকে বাইক থামাতে বললাম। রাস্তার পাশে এক টুকরো আমনের ক্ষেত। পাকা ধান যেন হেসে হেসে দোল খাচ্ছে মৃদু বাতাসে। আর মাঠে একা এক কৃষক ধান কাটায় ব্যস্ত। রবি ঠাকুরের কবিতার চরণ দুটি নিজের অজান্তেই উচ্চারিত হলো ‘রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হলো সারা/একখানি ছোট ক্ষেত আমি একলা।’ আসলে ওই কৃষক একা নন। আর আমার থমকে যাওয়ার প্রধান কারণ এ কৃষক বা তার ধানের ক্ষেত নয়।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের গ্রামটির নাম খাজুরা। এক সময় গ্রামটিতে ব্যাপক খেজুর গাছ ছিল বলে খাজুরা নাম করণ হয়েছে জানান গ্রামের জ্যেষ্ঠরা। এ পথ দিয়েই আমাদের গন্তব্য ছিল ভীমরুলি গ্রাম। গ্রামের ছোট্ট হাটের খুপড়ির দোকানে গরুর দুধের তৈরি চায়ের কাপে ডুবিয়ে রুটি পোড়া খাওয়ার কথা ছিল সেদিন। কিন্তু ওই দৃশ্য আমাদের আটকে দেয়, থমকে দেয়। এক অকৃত্রিম ভালোবাসার স্বাদ পাইয়ে দেয়। নতুন করে না হলেও গভীরভাবে পরিচয় করিয়ে দেয় লেনদেনহীন এক মমতার সাগরের সাথে। সে গল্পেই ফিরে আসছি।

সাদা কাপড়ে এক বৃদ্ধা মিষ্টি রোদে আধামড়া একটি খেজুর গাছের তলায়। কতটা বৃদ্ধ তা দূর থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। ধানক্ষেতের পাশে এ বয়সে তার কী কাজ হতে পারে, তাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তার ওপর দেখা যাচ্ছিল মধ্য বয়সী এক ব্যক্তি আপন মনে ধান কেটে যাচ্ছেন। মেলাতে পারছিলাম না। কৌতুহল নিয়ে সাদা কাপড় পরা বৃদ্ধার কাছে পৌঁছাতেই আঁতকে উঠলাম। সমস্ত শরীরে যেন মাংসপেশী নেই। হাড়গুলো যেন শরীর থেকে বের হয়ে আসতে চায়। আর হাড়ের সাথে আষ্টেপিষ্ঠে থাকা চমড়া অমসৃণ, পড়েছে ভাঁজের পর ভাঁজ এবং থ্যাতলানো। বয়সের ভারে জীবনের শেষদিন গোনার পালা তার। ক্যামেরাটা সাথে নিয়েই এদিক-ওদিক বেড় হই হঠাৎ করে। বেশ ক’টা ছবি তুললাম। এরমধ্যে ধান কাটা রেখে মাঠ থেকে দৌড়ে এলেন মধ্য বয়সের ব্যক্তিটি। বললেন, ‘আহারে ভয় পাবে বন্ধ করেন, বন্ধ করেন, আর ছবি তুলবেন না।’

এবার আরো কৌতুহল বেড়ে গেল। ক্যামেরা ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে আমি বললাম, ‘ভুল হয়ে গেছে দাদা। যাক বলেন তো কে এই বৃদ্ধা। আর এখানে উনি কী করছেন?’ এরপর যা শোনালেন তিনি তা স্তব্ধ করে দিলো আমাদের।

শতবর্ষী ওই নারী হিমাঙ্গিনী চক্রবর্তী। আর যিনি মাঠে ধান কাটছিলেন বা যার সাথে কথা হলো তিনি ছেলে স্বর্ণ কুমার চক্রবর্তী। মধ্যবয়সী এ কৃষক স্বর্ণ কুমার জানালেন, তার মা এখন চলাফেরা করতে পারেন না। ক্ষেত থেকে কিছুটা দূরে তাদের বসতভিটা। সংসারে তেমন অভাব অনাটন নেই। ১২ মাস ধান আর সবজির চাষে সংসার সুখেই চলে। তবে মাঠে কাজ করার সময় মাকে আনতে হয় রোজ। তিনি মাঠের পাশে বসে থাকেন আর ছেলে আপন মনে কাজ করে যান। এ রোজকার রুটিন। আবার এক সাথেই বাড়ি ফেরেন তারা। প্রায় অচল বৃদ্ধা মাকে কোলে তুলে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে। নিজেকে সামলে ভালো করে হাঁটতে পারেন না এই মা। তবু কেন এই মাঠে আসা আর কেনই বা মাঠের পানে বৃদ্ধার ঝাঁপসা চোখে তাকিয়ে থাকা?

ছেলে স্বর্ণ কুমারের উত্তর জেনে আরো স্তব্ধ হই। আসলে ছেলেকে চোখের আড়াল করবেন না বলে মায়ের আবদার তাকেও মাঠে নিয়ে যেতে হবে। যতক্ষণ তার মানিক কাজ করবেন, তিনিও কাছেই বসে থাকবেন অকৃত্রিম মমতার আঁচল পেতে, এই বয়সে যতই কষ্ট হোক তার। মায়ের সান্তনা বুকের মানিক বুকে, আর আছে তার চোখে চোখে!

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫