ঢাকা, শনিবার,২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

আইন ও বিচার

যে চলন্ত বাসে ধর্ষণ, সেই বাসের মালিকানা পাবে রূপার পরিবার

বিবিসি বাংলা

১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,সোমবার, ১৮:৪২ | আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,সোমবার, ১৮:৪৭


প্রিন্ট
যে চলন্ত বাসে ধর্ষণ, সেই বাসের মালিকানা পাবে রূপার পরিবার

যে চলন্ত বাসে ধর্ষণ, সেই বাসের মালিকানা পাবে রূপার পরিবার

রূপা ধর্ষণ এবং হত্যা মামলায় মাত্র ছয় মাসের মধ্যে যেভাবে আসামীদের বিচার শেষ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশে খুব বিরল। যে চলন্ত বাসে এই অপরাধ হয়েছিল, সেটিও নৃশংসতার শিকার তরুণীর পরিবারকে দিতে বলেছেন বিচারক। কোন অপরাধের রায়ে এ ধরণের নির্দেশ, সেটিও সচরাচর দেখা যায় না।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে চলন্ত বাসে এক তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে আশ্চর্য মিল ছিল রূপা ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনায়। রূপাকেও চলন্ত বাসে ধর্ষন করা হয়েছিল, এরপর হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়া হয়েছিল জঙ্গলে। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই সেই ঘটনার বিচার হলো।

নির্ভয়া ধর্ষণের ঘটনা যেভাবে ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল, রূপাকে ধর্ষণ-হত্যার ঘটনাও একইভাবে আলোড়িত করে বাংলাদেশের মানুষকে।

ঘটনার পরপরই বাসটির চালক হেলপার সহ ৫জনকে আটক করে মামলা দায়ের করে পুলিশ। এরপর গত ২৯শে নভেম্বর আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো আদালতে।

টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি এ কে এম নাছিমুল আক্তার বলছেন ঘটনার ১৭৩ দিনের মধ্যে মাত্র ১৪ কর্ম দিবসেই সব কার্যক্রম শেষ করে আজ চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় দিলো আদালত।

তিনি বলেন, পাঁচ আসামীর মধ্যে ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড আর একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়ে তাকে এক লাখ জরিমানা করেছে আদালত। এ টাকা এবং যে বাসে ঘটনাটি ঘটেছে সে বাসটি আদালতের আয়ত্তে নিয়ে রূপার পরিবারকে দেয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।

নাছিমুল আক্তার বলেন মাত্র ১৪ কর্ম দিবসে মামলাটি নিষ্পত্তি করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এ ট্রাইব্যুনাল।

যেভাবে ঘটেছিল:

ময়মনসিংহের একটি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে কাজ করতেন রূপা, পাশাপাশি পড়তেন একটি ল কলেজে। বগুড়ায় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে গত বছরের ২৫শে অগাস্ট বাসে ময়মনসিংহ ফিরছিলেন তিনি। পরে তার মৃতদেহ পাওয়া যায় মধুপুর এলাকার জঙ্গলে।

পরিচয় না পেয়ে প্রথমে বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন করা হলেও খবরটি ছড়িয়ে পড়ে গণমাধ্যমে। দুদিন পর মধুপুর থানায় গিয়ে ছবি দেখে নিজের বোনকে সনাক্ত করেছিলেন রূপার ভাই হাফিজুল ইসলাম প্রামানিক।

আসামীদের আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তি থেকেই জানা গিয়েছিলো যে রূপা যে বাসে ফিরছিলেন সে বাসটি ঐদিন রাতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা অতিক্রম করার পর সব যাত্রী নেমে যায়।

এরপর বাসটি কালিহাতি এলাকায় পৌঁছালে বাসের মধ্যেই ধর্ষণের শিকার হন রূপা। মৃত্যু নিশ্চিত করে তাকে মধুপুর এলাকায় জঙ্গলের মধ্যে ফেলে দেয় বাসের হেলপারসহ অন্যরা।

রায়ে প্রতিক্রিয়া:

রূপার ভাই হাফিজুল ইসলাম প্রামানিক বিবিসিকে বলেছেন রায়ে ন্যায়বিচার পেয়েছে তাদের পরিবার। তিনি বলেন, আমরা সন্তুষ্ট। এখন আমরা চাই রায় দ্রুত কার্যকর হোক। তাহলেই আমার বোন অর্থাৎ রূপার আত্মা শান্তি পাবে। আর উচ্চ আদালতে গেলেও রায়টি যেনো বহাল থাকে,আমরা সেটিই চাইছি।

তবে আসামী পক্ষের আইনজীবী শামীম চৌধুরী বলছেন তারা এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি বলেন, আমরা প্রত্যাশিত ন্যায় বিচার পাইনি। এ মামলায় রাষ্ট্র পক্ষ কোনভাবেই প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি। আমরা উচ্চ আদালতে যাবো এবং আশা করি সেখানে ন্যায় বিচার পাবো।

তবে রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া যাই হোক রুপা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে ও গণ পরিবহনের নারীদের নিরাপত্তা হীনতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছিলো। বিশেষ করে যেসব শিক্ষিত নারীরা দূরদূরান্তে শিক্ষা বা কাজের প্রয়োজনে গণ পরিবহনে যাতায়াত করেন তারা কতটুকু নিরাপদ তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিলো।

আর সে কারণেই মানবাধিকার সংস্থাসহ অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তাতেই এগিয়ে এসেছিলো যাতে রূপা ধর্ষণ ও হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

 

রূপা ধর্ষণ ও হত্যায় ৪ জনের ফাঁসির আদেশ

টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে কলেজছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চারজনের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। এসময় একজনের ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আবুল মনসুর মিয়ার আদালতে আজ সোমবার এ রায় দেন।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, ময়মনসিংহ-বগুড়া রুটের ছোঁয়া পরিবহনের হেলপার শামীম (২৬), আকরাম (৩৫) ও জাহাঙ্গীর (১৯) এবং চালক হাবিবুর (৪৫)। এছাড়া সুপারভাইজার সফর আলীকে (৫৫) সাত বছরের দণ্ড ও একলাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

সোমবার বেলা সোয়া ১১টায় এ রায় ঘোষণা করা হয়। এ সময় আদালতে মামলার আসামিরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গত ১৫ অক্টোবর এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা টাঙ্গাইলের বিচারিক হাকিম আদালতে পাঁচ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলাটি বিচারের জন্য পরদিন ১৬ অক্টোবর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বদলী করা হয়। গত ২৫ অক্টোবর আদালত এই অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। গত ২৩ জানুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। মোট ৩২ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৭ জন সাক্ষ্য প্রদান করেন।

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে রূপাকে চলন্ত বাসে পরিবহন শ্রমিকেরা ধর্ষণ করে এবং বাসেই তাকে হত্যার পর টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় পঁচিশ মাইল এলাকায় বনের মধ্যে তার মৃত দেহ ফেলে রেখে যায়। এলাকাবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ওই রাতেই অজ্ঞাত পরিচয় তরুণী হিসেবে তার লাশ উদ্ধার করে। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে মধুপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। ঘটনার দুই দিন পর রূপার বড়ভাই হাফিজুর রহমান নয়া দিগন্ত পত্রিকায় মধুপুরে অজ্ঞাত যুবতীর লাশ উদ্ধারের খবর দেখে মধুপুর থানায় যান। সেখানে গিয়ে তিনি রক্তাক্ত লাশের ছবি ও সেলোয়ার কামিজ দেখে শনাক্ত করেন যে এই অজ্ঞাত যুবতীই তার আদরের ছোট বোন। ৩১ আগস্ট রূপার মরদেহ উত্তোলন করে তার ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাকে সিরাজগঞ্জের তারাশ উপজেলার নিজ গ্রাম আসানবাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫