শিল্প সংস্কৃতির ধারক সোনারগাঁও মেলা

শওকত আলী রতন

এক সময়ে আমাদের গ্রামীণমেলাগুলোতে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বায়োস্কোপ দেখার দৃশ্য চোখে পড়লে আজ তা কেবলই স্মৃতি। গ্রামের মেলাগুলোতে সচরাচর আর দেখা মেলে না বায়োস্কোপের। কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধরে রেখে আজো বায়োস্কোপ নিয়ে ঘুরে বেড়ান রাজশাহীর আবদুল জলিল। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আয়োজিত গ্রামীণমেলাতে এখনো আগের মতো বায়োস্কোপ দেখানোর মাধ্যমে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। আবদুল জলিলের দেখা মিলে সোনারগাঁওয়ের লোককারু শিল্প মেলায়। হঠাৎ কানে আসে, এই বারেতে দ্যাহেন দার্জিলিংয়ের পাহাড় আছে, পাহাড়ে ঝর্ণা আছে। এর পরেতে কলিকাতা টাউন আছে, বড় লাটের বাড়ি আছে। এই বারেতে মুর্শিদাবাদ আইসা গেল, দেখতে কত বাহার আছে, বনের রাজা সিংহ আছে, বাঘ ভাল্লুক সবই আছে। এমন গল্প আর সুর ও ছন্দের তালে তালে বায়োস্কোপ দেখান রাজশাহীর আবদুল জলিল। 

দুই যুগ আগে এই পেশায় জীবন জীবিকার কাজ শুরু করলেও প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটায় এখন আর কেউ বায়োস্কোপ দেখতে চায় না। তিনি জানান, মানুষ আগের মতো নেই কেমন যেন স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। সব কিছুতেই স্বার্থ খোঁজে। সব কিছুতে স্বার্থ খুঁজলে হয় না। দেশকে ভালোবাসতে হবে। দেশের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে তবেই দেশের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হবে। আবদুল জলিলের মতো আর প্রায় অর্ধশতাধিক কারুশিল্প নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেলায় এসেছেন।
ঢাকার সন্নিকটে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকায় বাংলাদেশ লোককারু শিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে ১৪ জানুয়ারি থেকে মাসব্যাপী শুরু হয়েছে লোককারু শিল্পমেলা ও লোকজ উৎসব। মেলা শেষ হয় গতকাল। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ ও সংস্কৃতির ব্যবহার্য জিনিসপত্র যুগ যুগ টিকিয়ে রাখতে ও নতুন প্রজন্মকে সেগুলোর সাথে পরিচয় করানোর জন্য ফাউন্ডেশন এ মেলার আয়োজন করছে। আমাদের দেশের প্রাচীন গ্রামীণমেলাগুলোর মধ্যে সোনারগাঁওয়ের লোককারু শিল্পমেলা অন্যতম।

এ বছর মেলায় বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চল থেকে ৫৪ জন কারুশিল্পী অংশ নিয়েছেন। প্রতি বছরই কারুশিল্পীরা এ মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। এসব শিল্পীর সাথে কথা বলে জানা যায়, শুধু বিক্রির উদ্দেশ্যেই নয়, মাটির ভালোবাসা ও বাপ-দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্যই সারা বছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে এসব পণ্যের সাথে মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়াই মূল উদ্দেশ্যে। শিল্পীরা আরো বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদেশী সব পণ্য। কিন্তু আমাদের শিল্পকে যদি আমরা নিজেরাই টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ না নেই তাহলে এক সময় হারিয়ে যাবে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির সব পণ্যসামগ্রী। পুরান ঢাকার নারিন্দা থেকে মেলায় আসা পটশিল্পী নমিতা চক্রবর্তী জানান, মেলায় বিক্রি হোক আর না হোক প্রতি বছরই মেলায় আসি। আমরা যত দিন বেঁচে আছি তত দিন মেলায় অংশগ্রহণ করব। কিন্তু আগামী প্রজন্মকে এ পেশায় টিকিয়ে রাখতে সরকারকে সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে তা না হলের এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। মেলায় কাঠখোদাই রফিকুল ইসলাম কাঠের তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র নিয়ে মেলায় স্টল নিয়েছেন। প্রতি বছরই সোনারগাঁওয়ের মেলায় অংশগ্রহণ করে বলে জানান রফিকুল ইসলাম। এ বছর বেচাবিক্রি সন্তোষজনক নয় বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

মেলায় ঐতিহ্যবাহী নানা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করেছেন শখের সব জিনিসপত্র। এদের মধ্যে ঝিনাইদহ ও মাগুরার শোলা শিল্প, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি, চট্টগ্রামের পাখা, রংপুরের শতরঞ্জি, সোনারগাঁওয়ের হাতি ঘোড়া পুতুল ও কাঠের কারুশিল্প, নকশিকাঁথা, হাতপাখা, মুন্সিগঞ্জের শীতল পাটি, মানিকগঞ্জের তামা-কাঁসা ও পিতলের কারুশিল্প, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কারুপণ্য, কিশোরগঞ্জের টেরা কোটা শিল্প, সোনারগাঁওয়ের পাটের কারুশিল্প, নাটোরের শোলার মুখোশ শিল্প, মুন্সিগঞ্জের পটচিত্র, ঢাকার কাগজের হস্তশিল্প ইত্যাদি এ মেলায় স্থান পেয়েছিল।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.