ঢাকা, শনিবার,২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

সরকার কি আগেই জানত?

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,শনিবার, ১৮:৫৯


ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

প্রিন্ট

এটাই এখন জনমনে ধারণা যে, সরকার হয়তো জানত, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আখতারুজ্জামানের বিশেষ আদালতে কী দণ্ড দেয়া হবে। আমরা সবাই জানি, নিম্ন আদালত স্বাধীন নয়, বরং তা নির্বাহী বিভাগের অধীন। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য নিম্ন আদালতের বিচারকদেরও সুপ্রিম কোর্টের আওতায় আনার চেষ্টা করেছিলেন। তা নিয়ে সরকারের সাথে প্রথম থেকেই তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। সে দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র সঙ্ঘাতে রূপ নেয়। যে এস কে সিনহা সরকারের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন, যিনি যুদ্ধাপরাধীদের একের পর এক মৃত্যুদণ্ড দিয়ে গেছেন, তাকেও সরকার শেষ পর্যন্ত হেনস্তার চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপিরা একযোগে সিনহার বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির পদ তো বটেই, সিনহাকে তারা দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছেন। তারপর থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দুঃস্বপ্নে রূপ নিয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে ষোড়শ সংশোধনী রায়ের পর্যবেক্ষণ পছন্দ হয়নি বলে বিদায় নিতে হয়েছে। দৃশ্যত এটাই মনে হতে পারে। কিন্তু আরো সত্য এই যে, তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নিম্ন আদালতকে সরকারের কব্জা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। 

সেটাও ছিল তার একটি বড় ‘অপরাধ’। সুতরাং তাকে শায়েস্তা করার জন্য প্রবাসে হলেও পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ নাকি আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিকে বলেছেন, সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ রয়েছে। আর সে কারণে আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতি তার সাথে একই বেঞ্চে বসতে অস্বীকার করেছেন। ‘অস্বীকার করেছেন’ কি না তা প্রমাণিত হয়নি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাসহ কোনো বিচারপতি ওই প্রজ্ঞাপনের কোনো প্রতিবাদ করেননি। আবার সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলেই যে তিনি দোষী হয়ে গেলেন, তাও নয়। অতএব, সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল আর বিচারকগণ তার সাথে একই বেঞ্চে বসতে অস্বীকার করলেন, তাই বা কী করে হতে পারে? সে ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই প্রমাণ করতে হবে যে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য। আর দুর্নীতির অভিযোগ? সেটা তো রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ করবেন না, এই অভিযোগ প্রমাণ করার কথা দুর্নীতি দমন কমিশনের। দুর্নীতিবাজ প্রমাণিত হলেই কেবল সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, তার সাথে অন্যরা বসবেন কি বসবেন না। আর কে দুর্নীতিবাজ তা আদালতের বিবেচ্য বিষয়। যখন তা বিবেচনার জন্য আদালতের কাছে আসে, তখন মাননীয় আদালত বিবেচনা করবেন। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দুর্নীতি করেছেন কি না, তা প্রমাণের আগেই তার সহযোগীরা তাকে স্বেচ্ছায় বয়কট করলেন! তখনই বোঝা গিয়েছিল, সামনে বিচার বিভাগের ওপর ঝড় আসছে। বিচারপতিগণ যদি একবার সরকারের অন্যায় আবদার মেনে নেন, তাহলে সরকার সে অন্যায় বারবার করে যেতেই থাকবে। ঘটলও তাই। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে বিদায় নিতে হলো। এরপর মাস তিনেকের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের কারণে পদত্যাগ করলেন আপিল বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র বিচারপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা।

এবার অ্যাটর্নি জেনারেল উচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করে বসলেন। নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হাসানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি উচ্চ আদালতের ওপর একহাত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিছু বিচারপতির আদালত চালানোর অব্যবস্থা দ্বারা গোটা বিচারালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তিনি অবশ্য জানান, ঢালাওভাবে সব বিচারপতির বিরুদ্ধে এসব কথা বলছেন না। মাহবুবে আলম বলেন, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটা বিরাট অংশ দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছেন এবং এখনো যারা সৎ আছেন, এভাবে চলতে থাকলে তাদের সততা বজায় রাখা কঠিন হবে। বহু ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের আদেশ ও নির্দেশ লঙ্ঘন করে হাইকোর্ট বিভাগ আদেশ প্রদান করতে থাকে বলে উল্লেখ করে মাহবুবে আলম বলেছেন, আমি ঢালাওভাবে সমস্ত বেঞ্চের জন্য এ কথা বলছি না। অনেক বিচারকই বিচারকার্য হাতের মুঠোয় রেখেছেন এবং আদালতের কর্মকর্তারা তাদের কথামতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা সঠিকভাবে আইনজীবীদের প্রত্যাশামতো তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছু বিচারপতির আদালত চালানোর অব্যবস্থা দ্বারা সমস্ত বিচারালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তার কারণ ‘সুগন্ধের পরিধি হয় সীমিত, অথচ দুর্গন্ধের পরিধি বিস্তৃত’।

তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের বিচার বিভাগের অবক্ষয় ঘটেছে। সাধারণ জনগণের কাছে এ আদালতের যে ভাবমূর্তি ছিল, তাতে পরিবর্তন ঘটেছে। ইতঃপূর্বে একজন প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনা দেয়ার সময় এ আদালতের কিছু অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরেছিলাম। এ বক্তব্যে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি তদন্তের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তদন্ত অনেকটা অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু যখন পরবর্তী বিচারপতি এলেন, তখন তার দফতর থেকে সে ফাইলটি নিখোঁজ হয়ে গেল।
তিনি বলেন, হয়তো দেখা যায়, চার বছর আগে করা মামলা লিস্টে বহাল তবিয়তে আছে; অথচ দুই মাস আগে করা মামলার চূড়ান্ত শুনানি হয়ে যাচ্ছে। আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারী মামলা নিচের থেকে উঠানোর কাজে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, ‘আদালতে যোগদানের পর দেখেছি, সকাল সাড়ে ১০টায় কাঁটায় কাঁটায় অনেক বিচারপতি এজলাসে বসতেন এবং কোর্টে আসীন হওয়া ও কোর্ট থেকে নেমে যাওয়ার ব্যাপারে কজলিস্টে যে সময় দেয়া আছে, তার কোনো ব্যত্যয় হতো না। কিন্তু এখন কজলিস্টে যে সময় ধার্য করে দেয়া হয়েছে, তার সাথে বিচারকদের আদালতে ওঠা বা নামার কোনো সঙ্গতি নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।’

এখানেই থেমে থাকেননি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, বিশেষ বিশেষ কোর্ট বিশেষ ‘বিশেষ আইনজীবীর কোর্টে’ পরিণত হয়ে গেছে। অনেক সময় অনেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর কাছ থেকে ব্রিফ নিয়ে তাদের নিয়োগ করা হচ্ছে। বিচারপ্রার্থী ব্যক্তিরা অনেকে জেনে গেছেন, কোন কোর্টে কাকে নিয়ে গেলে মামলায় জেতা যাবে। এটা ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ বিষয়ে অনেকেই ছুটছেন বিচারপতিদের সন্তান-স্ত্রী যারা আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত আছেন, তাদের দিকে। এটা করছেন এই চিন্তা করে যে, এদের নিয়ে গেলে হয়তো মামলায় জেতা যাবে। বিচারপতিদের আত্মীয় বা সন্তান আগেও এ পেশায় ছিলেন; কিন্তু কখনো এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। এখন কেন বিচারপ্রার্থীদের আচরণ এরূপ হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

মাহবুবে আলম আরো বলেছেন, কোনো কোনো বেঞ্চের বিচারপতিরা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তার বেঞ্চ অফিসারের ওপর। আইনজীবীদের কথায় তারা কোনো কর্ণপাত করেন না। বরং তারা পরিচালিত হন তাদের বেঞ্চ অফিসারদের প্রভাবে। ইতোমধ্যে একজন বিচারপতি অবসরে গিয়েছেন। তার প্রতিটি মামলার রায়ই ছিল একই রকম বাক্যসমৃদ্ধ। অনেকে হাসাহাসি করতেন এই বলে যে, তার হয়ে রায় লিখে দিচ্ছেন তার বেঞ্চ অফিসার। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আদালতের রায় নিয়ে জাল-জালিয়াতি শুরু হয়ে গেছে। আদালত থেকে জামিন দেয়া হয়নি, অথচ জামিনের কাগজ তৈরি করে আসামিরা জেল থেকে বেরিয়ে গেছে। ফৌজদারি মামলার জামিনের শুনানির ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, এই মাহবুবে আলম এত দিন কোথায় ছিলেন? যে বিচারপতি খায়রুল হক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা অনুদান নেয়ার পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার রায় বদলে দিলেন, তার বেলায় নৈতিকতা নিয়ে কোথায় ছিলেন মাহবুবে আলম? সেই রায় নির্দেশিত পথে ছিল বলে কি তখন চুপ ছিলেন? এখন দুই প্রধান বিচারপতি চলে যাওয়ার পর তার সাহস অনেক বেড়েছে। যদি মুরাদ থাকত, তবে তার দৃষ্টিতে অভিযুক্ত বিচারপতিদের নাম ধরে ধরে তিনি বলতে পারতেন; কিন্তু ঢালাও অভিযোগ করতেন না।

অনেকের মতে, উত্থাপিত এসব অভিযোগের অর্থ হলো উচ্চ আদালতের বিচারপতিগণও নিম্ন আদালতের বিচারকদের মতো এই সরকারের কথামতো চলুন। সরকার পক্ষ বলছে, নিম্ন আদালতে খালেদা জিয়ার মামলার যে রায় হয়েছে, তাতে সরকার হস্তক্ষেপ করেনি। বিচারক নিজের বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী রায় দিয়েছেন; দিয়ে থাকলে তিনি বাহবা পেতে পারেন। এখানেও মাহবুবে আলমের কথায় ফিরে যাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, উচ্চ আদালতে কোনো কোনো মামলা চার বছরেও নড়ে না।
কোনো কোনোটা দুই মাসেই শেষ হয়ে যায়। বেগম জিয়ার মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য সপ্তাহে চার দিন পর্যন্ত তাকে আদালতে টেনে আনা হয়েছে অসুস্থতা সত্ত্বেও। একেবারে রকেটের গতিতে তার মামলার রায় দেয়া হলো। আর রায় হলো কার্যত সরকারের আকাক্সক্ষার অনুরূপ। তার পরও দাবি করা হচ্ছে, এ রায় সম্পূর্ণ সরকারি প্রভাবমুক্ত। কিন্তু যে আদালতে দুর্নীতির একটি মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে খালাস দেয়া হলো, সেই আদালতের রায় ও বিচারককে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো কেন? শুধু প্রশ্নই তোলা হয়নি, সেই বিচারককে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। শঠতার একটা সীমারেখা আছে। সরকার সে সীমরেখা বহু আগেই অতিক্রম করেছে বলে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে।

সুতরাং মনে হওয়া স্বাভাবিক, ৮ ফেব্রুয়ারি কী রায় দেয়া হবে, তা আগে থেকেই জানতেন ক্ষমতাসীনেরা। আর সে কারণে রায়ের আগে সারা দেশে সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়া দমানোর জন্য বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। রাজধানীকে করেছে অবরুদ্ধ। কোটি মানুষকে জিম্মি করেছে। নগরীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তার পরও বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার আদালতে যাত্রাপথে পুলিশ ও আওয়ামী ক্যাডারদের বাধা উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো তার পেছনে পেছনে আদালত পর্যন্ত ছুটে গেছে। ‘এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ? কে রুধিবে এই জোয়ারের জল গগনে যখন উঠিছে চাঁদ’।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫