ads

ঢাকা, শুক্রবার,২০ এপ্রিল ২০১৮

বিবিধ

বইমেলা মিলনমেলা

শওকত আলী রতন

১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,শনিবার, ১৬:৫৮


প্রিন্ট

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালে এ মাসেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রাজপথে লড়াই সংগ্রাম করতে গিয়ে পুলিশের বুলেটের আঘাতে বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন দিয়ে মাতৃভাষাকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে শহীদ হন রফিক জব্বার, শফিউল, সালাম, বরকতসহ নাম না-জানা আরো অনেকে। তারপরই মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করে নেয় বাঙালি জাতি, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনায় জন্ম দেয়। ভাষা আন্দোলনের আত্মদানকারী শহীদদের স্মরণে প্রতি বছরের মতো ভাষার মাসে বাংলা একাডেমির আয়োজনে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী শুরু হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। একটি বছর অধীর অপেক্ষার পর আবার বইমেলার আসর বসায় খুশি লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও সাধারণ দর্শনার্থীরা। বইয়ের সাথে পরিচিতি হওয়া কিংবা বই কেনার জন্য মেলায় আসছেন ক্রেতারা। প্রতিদিনই মেলায় আসছে নতুন নতুন বই। বইপ্রেমীরা প্রিয় লেখকের বইয়ের খোঁজে ছুটে আসছেন প্রাণের মেলা বইমেলায়।

বইমেলায় দেখা মেলে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের। তেমনি লেখকদের দেখা মেলে বইমেলাতেই। অন্য সময়ে সবাই কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে সময় পার করলেও অন্তত বইমেলা এলে আলাদাভাবে সময় নিয়ে মেলায় আসেন তারা। প্রতীক্ষার প্রহর শেষে প্রিয় লেখকদের সাথে সাক্ষাৎ হয় ভক্ত-অনুরাগীদের। লেখকদের পাশাপাশি পেশাজীবী বিভিন্ন সংগঠনের মানুষও মেলায় আসেন মাতৃভাষার টানে। বাংলা সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে নানা ব্যবস্থার মাঝে একটিবারের জন্য হলেও বইমেলায় ছুটে আসেন। তাই প্রতিটি স্টলের সামনে চোখে পড়ে কবি-সাহিত্যিক আর সাংবাদিকদের জমজমাট আড্ডা। বছরের অন্য সময় এসব মানুষের দেখা মেলা অনেকটাই দুরূহ। এ ছাড়া বইমেলায় প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, আলোচক, চিকিৎসক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, খেলোয়াড়সহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয় বইমেলা। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ সুদূর প্রবাস থেকে মেলায় আসেন। এক কথায় বইমেলা পরিণত হয় মিলনমেলায়।

এবারের মেলার দ্বিতীয় দিন শুক্রবার শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হয়। মেলায় শিশুদের বই কেনার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে এ উদ্যোগ নেয় বাংলা একাডেমি। শিশুপ্রহর উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বইমেলায় শিশুদের আকর্ষণীয় বিষয়ে পরিণত হয় সিসিমপুর। টেলিভিশনের পর্দায় শিশুরা যেমনিভাবে ইকরি, টুকটুকি আর হালুমের শিশুসুলভ সব অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়; তেমনি বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেলা ১১টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে বিরতি দিয়ে চলে ইকরি, টুকটুকি আর হালুমের মাতামাতি। শিশুরা আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে ইকরি, টুকটুকি আর হালুমের সাথে। বইমেলায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পাঠের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রকাশিত বই নিয়ে ব্রেইল প্রকাশনী ১৪টি বই বের করেছে। বই বিক্রি নয়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা যেন পড়তে পারে, সে তথ্য জানাতেই হাজির হয়েছে ব্রেইল প্রকাশনী। শুধু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নয়, সব বয়সী মানুষের সব বিষয় জানার সুযোগ আছে প্রাণের মেলায়।
বাংলাদেশ জাতীয় টেস্ট ও টি-২০ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান।

মেলার পঞ্চম দিন সোমবার বিকেলে নিজের লেখা বই ‘হালুমের’ মোড়ক উন্মোচন করেন তিনি। এ সময় ক্রিকেটভক্তরা ঘিরে ধরেন সাকিব আল হাসানকে। শিশুদের উপযোগী জীবনকথা ‘হালুম’ বইটি প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স।   সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এর প্যাভিলিয়ন নম্বর ৬। হালুমের অনুলিখনের দায়িত্ব পালন করেছেন আহমেদ রিয়াজ, মিলু আমান ও চিশতী ইকবাল। বইটির ব্যাপারে আহমেদ বিয়াজ বলেন, বইটি প্রথম দিনেই এক হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। বইটি শিশুদের জীবনের ওপর লেখা হলেও সব বয়সের পাঠকের কাছে ভালো লাগবে আশা করি। প্রতিদিনই মেলায় আসছে নতুন বই। এসব বইয়ের পরিচিতিসহ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করছেন দেশের প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিকেরা। এবার বই পরিচিতি ও মোড়ক উন্মোচনের স্থান সোওরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্ধারত করা হয়েছে। এ বছর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৯২টি প্রতিষ্ঠানকে ১৩৬টি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে ৩৬৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৫৮৩টি ইউনিটসহ মোট ৪৫৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৭১৯টি ইউনিট এবং বাংলা একাডেমিসহ ২৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৫ হাজার ৫৩৬ বর্গফুট আয়তনের ২৪টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ১৩৬টি লিটল ম্যাগাজিনকে লিটল ম্যাগাজিন কর্নারে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যারা বই প্রকাশ করেছেন তাদের বই বিক্রি ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে। মেলার দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য পুরো এরিয়াকে সিসি টিভির আওতায় আনা হয়েছে সেই সাথে মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থা নিয়োজিত রয়েছে। এ বছর রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে পুরো মাসই বই বেচাবিক্রি ভালো হবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন প্রকাশনা সংস্থাগুলো। পাশাপাশি মেলায় দর্শনার্থী এলে বিক্রিও সন্তোষজনক হবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন তারা। মেলার প্রথম দিকে বিক্রি কম হলেও ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়ছে বলে জানা যায়। তাই শেষ দিকে বেচাবিক্রির দিকে তাকিয়ে আশায় বুক বাঁধেন। এ বছর মেলায় শিশুতোষ স্টলগুলোতে বই বিক্রি হচ্ছে তুলনামূলক বেশি। বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়নে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। এ বছর নারী লেখকদের উল্লেখযোগ্য বই বেরিয়েছে। প্রতিটি স্টলেই নারী লেখকদের বই শোভা পাচ্ছে। এসব বইয়ের মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ও উপন্যাসের সংখ্যাই বেশি। নারী লেখকদের বইয়ের বিক্রিও তুলনামূলক ভাল বলে জানা যায় স্টলগুলো থেকে।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের যে করুণ ঘটনা ঘটে, সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই এই মাসে আয়োজিত বইমেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।
এই মেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই প্রাচীন। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। এই ৩২টি বই ছিল চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমান মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের লেখা বই। এসব বই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সালে পর্যন্ত তিনি একাই বইমেলা চালিয়ে যান নিজের উদ্যোগে। ১৯৭৬ সালে অন্যরা অনুপ্রাণিত হন বইমেলার প্রতি। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে মেলার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে মেলার সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি; এই সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন সম্পন্ন করেন। ১৯৮৪ সালে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়। সেই ৩২টি বইয়ের ক্ষুদ্র মেলা কালানুক্রমে বাঙালির সবচেয়ে স্বনামধন্য বইমেলায় পরিণত হয়েছে।

মেলার শুরুর কয়েক দিন আগে থেকে ঠিক করা হয় প্রকাশনীসমূহের স্টলগুলো প্রকাশক এলাকা, প্রকাশক-বিক্রেতা এলাকা, শিশু কর্নার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং লিটল ম্যাগাজিন ইত্যাদি এলাকা বিভাজন করে স্থান বরাদ্দ দেয়া হয়। এ ছাড়া মেলা চত্বরকে ভাষাশহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ প্রমুখ ব্যক্তিত্বের নামে ভাগ করা হয়। এই মেলায় দেশের খ্যাতনামা সব প্রকাশনী, বই বিক্রেতা ছাড়াও দেশের বাইরে যেমন- ভারত, রাশিয়া জাপান প্রভৃতি দেশ থেকেও অংশনেয় নানা প্রকাশনা সংস্থা। এই মেলায় সরকারেরও বহু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, যেমন- বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ইত্যাদি তাদের স্টল নিয়ে মেলায় অংশ নেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও অংশ নেয়।

এ ছাড়া এ বছর বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী প্রাঙ্গণে বৃহৎ পরিসরে দুটি স্টল বসানো হয়েছে। ক্রেতারা সাধারণত বাংলা একাডেমির বই ৩০ শতাংশ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রয়েছে বাংলা একাডেমির স্টল যেখান থেকে সারা বছরই পাঠকেরা বই কিনতে পারেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮.৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকবে। শিশু কর্নারে এবার নতুন সংযোজন মাতৃদুগ্ধ সেবাকেন্দ্র রয়েছে। রয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের একটি ক্যান্টিন এবং বাংলা একাডেমির অংশে আরো দু’টি ক্যান্টিন চালু করা হয়েছে।

মেলা চলাকালীন প্রতিদিনই বিভিন্ন আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আসর বসে। সন্ধ্যায় থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া মেলায় লেখককুঞ্জ রয়েছে, যেখানে লেখকেরা উপস্থিত থাকেন এবং তাদের বইয়ের ব্যাপারে পাঠক ও দর্শকদের সাথে মতবিনিময় করেন।

 

ads

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫