ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

পাঠক গ্যালারি

রোহিঙ্গা সঙ্কট ও বিশ্ব বাস্তবতা

আবদুল কাদির মুহাম্মদী

০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ১৯:৩২


প্রিন্ট
রোহিঙ্গা সঙ্কট ও বিশ্ব বাস্তবতা

রোহিঙ্গা সঙ্কট ও বিশ্ব বাস্তবতা

মিয়ানমার সরকার দ্বারা রোহিঙ্গা মুসলিমগণ নজিরবিহীন অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে বিতাড়িত হওয়ার কারণে বিশ্ববিবেক আজ রোহিঙ্গাদের পক্ষে। দুর্দশাগ্রস্ত অসহায় একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে বুকে জড়িয়ে নেয়ার কারণে আমাদের দেশ এবং এ দেশের জনগণ বিশ্বমানবতার কাছে সম্মানের আসন পেয়েছে। মগের মুল্লুকের নরপিশাচ সৈনিকেরা রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগ আর লুটতরাজ করে সর্বহারা বানিয়ে বিতাড়িত করে, আর আমাদের সৈনিকেরা পরম সমাদরে তাদের মেহমানদারি করে। তারা বনের পশুর মতো আচরণ করে; আমরা সৃষ্টির সেরা মানুষের মতো আচরণ করি। তারা যুদ্ধের উসকানি দেয়, আমরা যুদ্ধ না করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। অর্থাৎ, তারা নিন্দিত, আমরা নন্দিত। তারা জাতিগত নিধন অভিযান চালায়, আমরা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান একসাথে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করি। তাদের নেত্রী ডাইনি সেজে বিশ্বের বিবেকবান মানুষের নিন্দা ধিক্কার পাচ্ছেন। আমাদের এক নেত্রী ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খেতাব অর্জন করেছেন। সীমাহীন অত্যাচারের সাক্ষী নাফ নদ পাড়ি দিয়ে জীবন রক্ষার জন্য রোহিঙ্গারা ছুটে এসেছে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো। স্বজনহারা মানুষের বুকফাটা কান্নায় রক্তনদের দুই কিনারা যেন নতুন কারবালা! সব প্রশংসা সেই সৃষ্টিকর্তার, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। যিনি অসহায় দুর্বলদের অছিলায় তার সৃষ্টিকুলকে রক্ষা করেন।

বাঙালি জাতির মহত্বের ও গৌরবের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। মধ্য যুগের শেষ প্রান্তে দিল্লির সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করতে এসেছিলেন বঙ্গবীর ঈসা খাঁর বিরুদ্ধে। দুই সাহসী বীরের দুই বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান গড়ে তুলেছিল কিশোরগঞ্জের এগারসিন্দুরের ময়দানে। যুদ্ধ সেদিন হয়নি। ঈসা খাঁ প্রস্তাব রেখেছিলেন, ‘যুদ্ধ করলে দুই দলেরই সৈন্যক্ষয় হবে। উভয় পক্ষের সৈন্য মারা পড়বে। আসুন, যুদ্ধের বদলে দুই সেনাপতি মল্লযুদ্ধ শুরু করি। মল্লযুদ্ধেই সাব্যস্ত হোক জয়-পরাজয়।’

মানসিংহ সেই প্রস্তাব কবুল করেছিলেন। শুরু হলো দুই বীরের মল্লযুদ্ধ। শুরুতেই ভেঙে দুই টুকরা হয়ে গেল মানসিংহের তলোয়ার। ভয়ে থর থর করে কাঁপতে শুরু করলেন মোগল সেনাপতি। ঈসা খাঁর কোমরের খাপে রক্ষিত ছিল আরেকটি তলোয়ার। সেটি বের করে ঈসা খাঁ মানসিংহের হাতে তুলে দিলেন। আবার যুদ্ধ শুরু করতে তিনি মানসিংহকে আহ্বান করলেন। বঙ্গবীরের মহত্ব দেখে মানসিংহের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি বঙ্গবীরকে। দুই বীরের আলিঙ্গন দেখে আনন্দে নেচে ওঠে দুই পক্ষের সৈন্যরা। যুদ্ধের বদলে স্থাপিত হলো সন্ধি। সৈন্যবাহিনী নিয়ে সেনাপতি মানসিংহ ফিরে গেলেন সম্রাট আকবরের দরবারে। সম্রাট সব জানতে পেরে ঈসা খাঁকে রাজ দরবারে আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি দিল্লির রাজদরবারে সম্মানিত মেহমান হয়ে আতিথ্য গ্রহণ করেন। বাদশাহ আকবর ঈসা খাঁকে ভূষিত করলেন ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধিতে। স্বাধীন নবাবের মতো অধিকার নিয়ে ঈশা খাঁ ফিরে এলেন এই বাংলায়।

এ দেশ বঙ্গবীরের বংশধরদের, তথা শান্তিকামী একটি জাতির স্বাধীন আবাসভূমি। আমরা বিশ্বে যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। রোহিঙ্গা সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘে বিষয়টি উপস্থাপন করেছে। তারা আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মিয়ানমার সরকারকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার রোহিঙ্গা বিতাড়ন অব্যাহত রেখেছে নতুন নতুন কৌশলে। ফলে জাতিসঙ্ঘ মিয়ানমারের জেনারেলদের এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচার শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে। সর্বহারা রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে গিয়ে বাঁচবে কিভাবে? তাদের জান-মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা কে দেবে? উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকদের সাথে সে দেশে আছে সন্ত্রাসী রাজনৈতিক কর্মীরা। রাখাইনকে কারবালা বানিয়েও অনাচার-অপরাধে তাদের লজ্জা বা ক্লান্তি নেই। এমন পরিস্থিতিতে তাদের সাথে দৈনিক ১০০ কিংবা অর্র্ধশত রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার আলোচনা অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। তাদের ঔদ্ধত্য আরো বেড়ে যেতে পারে। আমরা এমন কিছু কৌশল নিতে পারি যাতে তারা ভয় পেতে থাকে। জাতিসঙ্ঘে আমরা বাদি, তারা আসামি।

আমাদের প্রকৃত বন্ধুরাষ্ট্র খোঁজা দরকার। বিপদেই বন্ধুর পরিচয়। আসল আর নকল বন্ধু চেনার এখনই উপযুক্ত সময়। রোহিঙ্গা সঙ্কট সৃষ্টিকারী মিয়ানমার একই সাথে আমাদের চাল দেয়, আবার ‘শরণার্থী’ও দেয়। আমরা দুটোই সানন্দচিত্তে গ্রহণ করি। তারা রোহিঙ্গা তাড়ানো এখনো শেষ করেনি। তবু আমরা তাদের সাথে রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার আলোচনা চালাচ্ছি। তারা তো বলেই গিয়েছে- দৈনিক ১০০ জন করে রোহিঙ্গা ফেরত নেবে। দৈনিক ১০ জন করে নিলেও যেন আমরা রাজি। 

মিয়ানমারের ঘটনাপ্রবাহ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। চীনের সাথে বন্ধুত্ব থাকলেও চীন সরকার জাতিসঙ্ঘে আমাদের বিরোধিতা করেছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে। তারা আমাদের সাথে বিশেষ দূতের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করেছে। চীন সরকার আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পারদর্শী। কার্যত আদর্শ নয়, সওদাগরি চোখ দিয়ে তারা দুনিয়াটা দেখে। তারা জাতিসঙ্ঘে ভেটো দেয়া জাতি হিসেবে ‘প্রসিদ্ধ’। ‘কোকিলকণ্ঠী’দের কূটজালে ধরা দিলে আমাদের বিপদ আছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫