ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বিবিধ

ফজল শাহাবুদ্দীন : স্মৃতির আয়নায়

শাহীন রেজা

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৬:২১


প্রিন্ট

কিশোর কুমারের একটি গান আমার খুব প্রিয়। গানটি এরকম- ‘আমি নেই ভাবতেই ব্যথায় বুক ভরে যায়’। সত্যি কি তাই! প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেই কি এমনটি ঘটে? চলে যাওয়ার আশঙ্কায় হৃদয়টা মেঘ হয়ে যায়, পাখি হয়ে যায়। কখনো কখনো বৃষ্টি ঝরায়। হয়তো বা আমি থাকব না, কিন্তু পৃথিবীটা থাকবে সেই আগের মতো। সবকিছু সেই একই নিয়মে। শুধু আমি থাকব না। বসব না জানালার ধারের সেই চেয়ারটায়। দেখব না দুরন্ত শালিক। দূরে বোগেনভিলিয়ায় উড়ে আসা ফাগুন প্রজাপ্রতি। এ ভাবনা হয়তো সংক্রমিত হয়েছিল তার মধ্যেও। আর তাই তিনি লিখেছিলেন-

‘আমরা মরিয়া গেলে পৃথিবীটা থাকিবে বাঁচিয়া
এ কথা ভাবতে বড় কষ্ট লাগে বড় নিদারুণ
আমি থাকিব না কিন্তু প্রজাপ্রতি নাচিয়া নাচিয়া
খেলিবে বর্ণাঢ্য খেলা প্রেমে মত্ত তরুণী-তরুণ
কী আশ্চর্য নিষ্ঠুর প্রকৃতি কী নিয়ম তার
যা কিছু পুরনো আর জীর্ণশীর্ণ দেয় সে ফেলিয়া
নিজকে সাজাতে আনে ক্রমাগত তারুণ্য সম্ভার
আমরা মরিয়া গিয়া উঠিব কি আবার জ্বলিয়া’।
(আবার জ্বলিয়া)

ফজল শাহাবুদ্দীন। বাংলা কবিতার রাজপুত্র। যাকে আমি শনাক্ত করেছিলাম আমার ‘কাব্যপিতা’ হিসেবে। অত্যন্ত আড্ডাবাজ এ মানুষটি ভেতরে ভেতরে ছিলেন দারুণ একা, নিঃসঙ্গ। তিনি বলতেন, একাকিত্বই একজন কবিকে আত্মোপলব্ধি করার সুযোগ এনে দেয়। কবি অবগাহন করতে পারেন তার আপন চৈতন্যে। মীমাংসা করে নিতে পারেন তার সব দ্বন্দ্বের, যে দ্বন্দ্ব তার হৃদয়ে দোলায়িত হয় প্রতিটি মুহূর্তে একান্তে, সঙ্গোপনে। একজন কবিকে সবার আগে প্রকৃত অর্থে নিজেকেই চিনে নিতে হয়। আর সেই চেনার একমাত্র উপায় নিজের ভেতর ডুব দেয়া। সে জন্যে তাকে একা হতে হয়, নিঃসঙ্গ হতে হয়। গভীর অভিনিবেশে আত্মস্থ হতে হয় নিজ অভ্যন্তরে।
ফজল শাহাবুদ্দীন শুধু কবি নন, আমাদের ভাষায়- কবিদের কবি। কবিতা ছাড়া জীবনে অন্য কিছু ভেবেছেন এমনটি মনে হয়নি কখনো। যে পেশাতেই সংযুক্ত থেকেছেন, অবলীলায় তার সাথে যুক্ত করে নিয়েছেন কবিতাকে। কবিতার জন্য, শুধুমাত্র কবিতার জন্য অকাতরে জীবনের সব দরোজা-জানালা খুলে দিয়ে একান্তে শব্দ বাতাস ধারণ করার দুঃসাহস একমাত্র ফজলেই দৃশ্যমান। তাকে আমরা ভালোবাসতাম। তাকে ঘিরে ছিল আমাদের কাব্যরাজ্য। আমরা যখনই একত্র হতাম, যে বিষয় নিয়েই কথা বলতাম, অনিবার্যভাবে তাতে উঠে আসতো কবিতা। কবিতা নিয়ে এমন আশ্চর্য পক্ষপাত আমি কোথাও দেখিনি।
ফজল ভাই বলতে ভালোবাসতেন। কবিতার যেকোনো বিষয় নিয়ে অনর্গল বলে যেতে পারতেন তিনি। সত্তর বছর বয়সেও তিনি লাইনের পর লাইন কবিতা মুখস্থ আবৃত্তি করে আমাদের চমকে দিতেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা জীবনানন্দ তার প্রিয় হলেও তিনি বিশেষ আসনে রেখেছিলেন মাইকেল মধুসূদনকে। র্ফরুখ আহমদ কিংবা সৈয়দ আলী আহসানকে নিয়ে যখন বলতেন তখন গর্বে তার চোখ চিকচিক করত। র্ফরুখকে নিয়ে লেখা তার ‘একাকি সিন্দবাদ’ বাংলা সাহিত্যে একটি অনন্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে। মাইকেলের ‘কপোতাক্ষ নদ’ আবৃত্তি করতে করতে তিনি হারিয়ে যেতেন অন্যলোকে। কবিতা নিয়ে এই অবসেশানই তাকে আমাদের কাছে ‘হিরো’তে পরিণত করেছিল। তিনি পরিণত হয়েছিলেন ‘মিথ্’ এ।
ফজল ভাই আমাকে সতীর্থ বলতেন। কখনো কখনো নতুন কারো সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলতেন, ‘আমার বন্ধু’। প্রথম প্রথম লজ্জা পেতাম। পরে বুঝলাম আসলে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সম্পর্ক এই ‘বন্ধুত্ব’। বন্ধুত্ব, যা হতে পারে সৃষ্টিকর্তার সাথেও। হতে পারে বাবা-মা, ভাইবোন এমনকি স্ত্রীর সাথেও। এই সম্পর্ক অনেকটাই প্রেমের মতো। নিস্পাপ নিষ্কলুষ এবং সম্পূর্ণই চাওয়া-পাওয়া বর্জিত। ফজল ভাইয়ের সতীর্থের তালিকায় একসময় এসে যুক্ত হলেন কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ। আমরা তখন ‘ত্রয়ী’। একসাথে খাই, আড্ডা দেই, বেড়াতে যাই। কথায়, আড্ডায়, কবিতায় পার হয় অজ¯্র সময়। এরপর এই ত্রয়ীতে এসে যুক্ত হয় কবিজাকির আবু জাফর। আহ্ কি সুন্দর দিন, কি অপূর্ব সময় পার করেছি আমরা। সে সব আজ ইতিহাস। জানি সে কাহিনী অন্ধকারেই চাপা পড়ে থাকবে কিন্তু আমরা যে তিনজন এখনো বেঁচে আছি তাদের হৃদয়ে সে স্মৃতি ফুলের মতো শুধু সুগন্ধ ছড়াবে। আমরা হয়ে উঠব নস্টালজিক। হারিয়ে যাব সেই মধুসময়ে। ফজল ভাই কি তখন থাকবেন আমাদের মধ্যে? মৃত্যুর পর উড়ে বেড়ানো আত্মারা কি শুনতে পায় সতীর্থের ডাক, তাদের বোবাকান্নার করুণ আর্তনাদ?
ফজল ভাই ‘জন্মদিন’ কে প্রাধান্য দিতেন। ঘটা করে যেমন নিজের জন্মদিন পালন করতেন, তেমনি অন্যের জন্মদিন নিয়েও তার আগ্রহের কমতি ছিল না। প্রতি জন্মদিনে বিশাল বড় একটি পোস্টার ছাপাতেন তিনি। একবার সেরকম একটি পোস্টারে তিনি আমার একটি কবিতা ছেপেছিলেন। তিনি চমক দিতে ভালোবাসতেন। সেই জন্মদিনের আগে পরপর পাঁচদিন তার সাথে কাটিয়েও আমি জানতে পারিনি সেই পোস্টারের কথা। জন্মদিনের সকালে অফিসে গিয়ে সাঁটানো পোস্টারে আমার কবিতাটি দেখে হোঁচট খেয়েছিলাম। কৃতজ্ঞতায় চোখে পানি এসে গিয়েছিল। ফজল ভাই হেসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কি মিয়া; কেমন হলো? আমি শুধু মাথা নেড়েছিলাম। কিছু বলতে পারিনি। একজন মানুষের সাথে মনে রাখার মতো কত স্মৃতি থাকতে পারে? এক-দুইটা হাজারটা? ফজল ভাইয়ের সাথে আমার স্মৃতি লাখ লাখ কিংবা তারও অধিক। আমি জানি না এ স্মৃতির বোঝা বয়ে নিয়ে আমি কিভাবে এগুবো। স্মৃতি কাঁদায়, স্মৃতি হাসায়। আমি ক্রমাগত শুধু হাসতেই আছি, কাঁদতেই আছি। এর গন্তব্য কোথায়?
ফজল ভাইয়ের একটা দোষ ছিল। তিনি কবিকণ্ঠ দিয়েই বই প্রকাশ করতেন, অন্য প্রকাশককে দিতেন না। এতে করে তার বইয়ের প্রচার খুব একটা হতো না। কিন্তু এতে তিনি গা করতেন না। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে আমি তার গল্পের একটি পাণ্ডুলিপি একপ্রকার জোর করেই দিয়েছিলাম গ্লোব পাবলিকেশন্স এ। বইটি তারা বেশ যত্নের সাথেই ছেপেছিল। এরপর মৃত্যুর আগের বছর অনন্যা’র কাছে ‘কবিতা সমগ্র’। যার প্রথম খণ্ডটি ছাপা হয়েছিল। দ্বিতীয়টি আর আলোর মুখ দেখেনি।
গত বছর বইমেলায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা তার কবিতাগুলো একত্র করে আমারই সম্পাদনায় ‘সাহিত্যদেশ’ থেকে বের করেছিলাম ‘ফজল শাহাবুদ্দীনের মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’। গ্রন্থটি প্রমাণ করবে, এদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো কবির এটাই সর্ববৃহৎ প্রকাশনা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এককভাবে কোনো কবি এত কবিতা লেখেননি।
ফজল ভাই একটা গান প্রায়ই শুনতেন। আমরা দু’জন যখন একান্তে থাকতাম, আমার মোবাইলে তুলে রাখা সুজাতা চক্রবর্তীর সেই গানটি ছেড়ে দিতে বলতেন। এরপর চোখ বুঁজে একবার-দু’বার কখনো তিনবার গানটি শুনতেন। সেই ‘ভুল সবই ভুল’ গানটির দুটো লাইন ছিল এরকম- ‘চলে গেলে ডাকবে না তো কেউ পিছু, স্মৃতি আমার থাকবে না তো আর কিছু’। গানটি শোনার পর তার চোখ ভিজে উঠত। তিনি কোথায় যেন হারিয়ে যেতেন। ফজল ভাই আজ নেই।
তার এই পঞ্চম মৃত্যু দিবসে সমস্ত হৃদয় দিয়ে তাকে বলতে ইচ্ছে করছে- প্রিয় কবি, আপনি এসে দেখে যান, চলে যাওয়ার পরও কারো কারো কিছু কিছু থেকে যায়। কারো কারো কথা, কারো কারো লেখা স্মৃতি জ¦লে আর ঘ্রাণ ছড়ায়। আপনি বেঁচে আছেন। আপনি বেঁচে থাকবেন। আপনার অনাবিষ্কৃত ভুবন একদিন পৃথিবীটাকে ঘ্রাণময় আলোময় করে তুলবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫