মালদ্বীপে অস্থিরতার নেপথ্যে
মালদ্বীপে অস্থিরতার নেপথ্যে

মালদ্বীপে অস্থিরতার নেপথ্যে

আসিফ হাসান

আট ডিসেম্বর, ২০১৭। নয়াদিল্লির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মালদ্বীপ ও চীন মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সই করেছে। আর তা করেছে এমন গোপনে ও তাড়াহুড়ো করে যে, কাকপক্ষীটি পর্যন্ত টের পায়নি। কিন্তু বুঝে ওঠার আগেই খেল খতম। বিশ্লেষকেরা বলতে থাকলেন, মালদ্বীপে ভারতকে কোণঠাসা করে চীনা আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। ভারত প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়। তারা ক্ষোভ প্রকাশ্যেই উগড়ে দেয়। ভারতের রাগ প্রশমিত করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্যন্ত ভারতে পাঠিয়েছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন। এরপর ভারত প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তাদের রাগ যে পড়েনি তা নিশ্চিতভাবেই বোঝা গিয়েছিল। নিজের আঙিনায় একের পর এক দেশের হাতফসকে চীনা প্রভাববলয়ে চলে যাওয়াটা মেনে নেয়া ভারতের জন্য সত্যিই কঠিন ব্যাপার।

কিন্তু দুই মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে গেল। এবারো কেউ বুঝে ওঠার আগেই কাজটি হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট কেবল রাজবন্দীদেরই নয়, বরখাস্ত হওয়া এমপিদের সদস্যপদ ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ জারি করা হয়। এই নির্দেশ কার্যকর করা মানে মালদ্বীপ পার্লামেন্টে বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া। এই ক্ষমতা নিয়ে বিরোধী দল স্পিকার তো বটেই এমনকি প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনকে পর্যন্ত সরিয়ে দেয়ার ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যায়। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার তিক্ততা এমনপর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, তারা প্রেসিডেন্টকে সরানোর সুযোগ এক সেকেন্ডের জন্যও নষ্ট করবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

সুপ্রিম কোর্টই খোদ প্রেসিডেন্টকে ইমপিচমেন্ট ও গ্রেফতার করার নির্দেশ দিতে চাচ্ছে বলেও খবর প্রকাশ পায়। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন নিজেও এই অভিযোগ করেছেন প্রকাশ্যে। এ প্রেক্ষাপটে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট ও আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী মামুন আবদুল গাইয়ুমকে গ্রেফতার করা হয়। পরে প্রধান বিচারপতি আবদুল্লাহ সাইদকেও গ্রেফতার করা হয়। বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন সদস্যও বন্দী হন। সেনাবাহিনী পার্লামেন্ট ভবন ঘিরে রাখে। পার্লামেন্ট অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

ইয়ামিন যেকোনোভাবেই হোক না কেন, পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু কতটুকু পারবেন তা বলা যাচ্ছে না। এত বেশি শত্রু সৃষ্টি করে ফেলেছেন যে, সামাল দেয়া কঠিন। মালদ্বীপের রশি মালদ্বীপেই থাকলে এত সঙ্কট সৃষ্টি হতো না, সমাধানও সহজ হতো। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। দেশে যেমন তিনি সবাইকে বিরোধী বানিয়ে ফেলেছেন, বিদেশেও তার মিত্রের সংখ্যা খুবই কম।

জরুরি অবস্থা জারির পর ইয়ামিন বলেছেন, তার বিরুদ্ধে কোনো ক্যু-চেষ্টা হয়েছে কি না তা তদন্ত করতেই এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। অন্য দিকে নাশিদ দ্রুত সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ভারত অবশ্য এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে সাড়া দেয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকার দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনের মধ্যে রশি টানাটানি চলছে। চীন তাদের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ গ্রহণ করার পর অনেক দেশের সাথেই তার সম্পর্ক ঝালাই করে নিচ্ছে। এর মধ্যে মালদ্বীপও রয়েছে। অথচ এই দেশটিকে দীর্ঘ দিন উপেক্ষা করেছিল চীন, এমনকি দূতাবাস পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু ভারত মহাসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা দেশটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ সফল করার জন্য বিপুলভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এই দেশটির কাছ দিয়েই গেছে অত্যন্ত ব্যস্ত একটি সামুদ্রিক রুট। তা ছাড়া আগামীতে ভারত মহাসাগর হতে যাচ্ছে বিশ্বের স্নায়ুকেন্দ্র। ফলে মালদ্বীপের গুরুত্ব গেছে বেড়ে।

ভারতকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিঙ্গে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা অনেকটা প্রকাশেই আবদুল্লাহ ইয়ামিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বরখাস্তকৃত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নশিদের পক্ষালম্বন করছেন। ফলে জটিলতা নানামুখী।
সাম্প্রতিক সময়ে নেপালেও প্রভাব বিপুলভাবে বাড়িয়েছে চীন। শ্রীলঙ্কায় মহিন্দা রাজাপাকসেকে পরাজিত করে বেশ খুশি হয়েছিল ভারত। কিন্তু ঋণের ফাঁদে ফেলে চীন তাদের অবস্থান অনেকাংশেই তার অবস্থান ফিরে পেয়েছে।

দুই পরাশক্তির লড়াই এখন বেশ প্রকট আকার ধারণ করেছে এই অঞ্চলে। মুক্তি কিভাবে আসবে তা হয়তো কেউ জানে না।
তবে ভারত সম্ভবত সামরিক পদক্ষেপ নেবে না। কারণ এর ফলাফল হবে ভয়াবহ। তবে সে এই সুযোগ যে হাতছাড়া করবে না, তা বলাই বাহুল্য। কূটনৈতিক পন্থায় সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে হারানো জমিন কিছুটা হলেও ফিরে পাওয়া নিশ্চিত করবে।

আবার চীনও বসে থাকবে না। চীন জানিয়ে দিয়েছে, তারা আলাপ-আলোচনার মাধ্যম পরিস্থিতির সমাধান চায়। চীন এখন পর্যন্ত কোনো দেশেই সরকার গঠন-পতনের সাথে সরাসরি জড়িত হয়নি। আর্থিক শক্তিতে চীন আত্মবিশ্বাসী বলে মনে করে, যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাকেই সে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবে। শ্রীলঙ্কা হলো এর ভালো উদাহরণ। ইয়ামিন আরেকটি কারণে আশ^স্ত হতে পারেন, তা হলো চীন কিন্তু মিত্রকে নিঃসঙ্গভাবে ফেলে যায় না। মিয়ানমারের ক্ষেত্রে তা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ সবাই মিয়ানমারের বিরোধিতা করলেও চীন কিন্তু ঠিকই আগলে রেখেছে মিয়ানমারকে। ইয়ামিনও হয়তো সেই ভরসা করছেন। অবশ্য সবক্ষেত্রেই যে চীন সফল হবে, তা নয়।
তবে মালদ্বীপের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর গণতান্ত্রিক ভিত শক্তিশালী নয়। দেশটির গণতন্ত্রের বয়স মাত্র ১০ বছর। ছোট্ট দেশটিতে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতির প্রভাব প্রবল। সম্পদও গুটিকতেক খাত ও লোকের হাতে সীমাবদ্ধ। ফলে উদার গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা খুবই কঠিন। আবার পরাশক্তিগুলোর কলকাঠি নাড়ানোর ফলে ওই পরিস্থিতিও আরো জটিল হয়ে পড়ে। সব সমাধান মালদ্বীপবাসীর হাতে সবসময় থাকে না। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.