ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

পাঠক গ্যালারি

গ্রামপুলিশদের ৭০ কাজ : বেতন মাত্র তিন হাজার

শিপন রবিদাস প্রাণকৃষ্ণ

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ১৭:১৫ | আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ১৭:৩৫


প্রিন্ট
গ্রামপুলিশদের ৭০ কাজ : বেতন মাত্র তিন হাজার

গ্রামপুলিশদের ৭০ কাজ : বেতন মাত্র তিন হাজার

ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না ৪৬ হাজার ৮৭০ জন গ্রামপুলিশের। খুবই অবহেলিত অথচ সর্বাধিক দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত আছেন গ্রামপুলিশরা। তারা দফাদার ও মহল্লাদার হিসেবে পরিচিত। বারবার মানবেতর জীবনযাপনের খবরের শিরোনাম হয়েছেন এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। অভাবের তাড়নায় ভিক্ষাবৃত্তি করছেন, অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারাও গেছেনÑ এমন ঘটনাও বিরল নয়।

ব্রিটিশ আমল থেকে গ্রামপুলিশের সদস্যরা কাজ করে আসছেন। সর্বশেষ তাদের ‘স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন-২০০৯’ এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর অধীনে ২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) গ্রামপুলিশ বাহিনী গঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও চাকরির শর্তাবলি সম্পর্কিত বিধিমালা তৈরি করে। কিন্তু এ বিধিতে তাদের চাকরির শ্রেণী নির্ধারণ করা হয়নি। ২০০৮ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গ্রামপুলিশদের চতুর্থ শ্রেণীর স্কেল নির্ধারণে অর্থ বিভাগকে চিঠি দিলেও সিদ্ধান্ত হয়নি। এ কারণে গ্রামপুলিশদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। গ্রামপুলিশ বাহিনীর (চৌকিদার) সদস্যদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

দফাদার ও চৌকিদার নামে পরিচিত গ্রামপুলিশ ট্যাক্স কালেকশন, জন্ম-মৃত্যুর তালিকা প্রণয়ন, ভিজিভি-ভিজিএফ বণ্টন, বিধবাভাতা ও বয়স্কভাতার বিষয়ে অনুসন্ধান ও তালিকা প্রণয়ন, ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ জারি, পুলিশের সাথে আসামি ধরা, নির্বাচনী ডিউটি পালনসহ নানাবিধ কাজ করে থাকেন। এ ছাড়াও সরকারি অনুষ্ঠানের চিঠি বিলি, রাতে পাহারা দেয়া, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশ পালন, থানার অর্পিত দায়িত্ব পালন, রুটিন অনুযায়ী পরিষদের পাহারা ও নিয়মিত থানায় হাজিরাসহ রয়েছে বহুমুখী কাজ।

প্রায় ৭০ ধরনের কাজ করে বেতন মাত্র তিন হাজার টাকা! এরাই গ্রামপুলিশ। চাকরির শুরুতে ৫০০ টাকা ছিল ভাতা। দীর্ঘকাল পর দফাদাররা দুই হাজার ১০০ টাকা ও চৌকিদারেরা এক হাজার ৯০০ টাকা বেতন পেতেন। এখন দফাদারদের তিন হাজার ৪০০ ও চৌকিদারদের বেতন তিন হাজার টাকা। বেতনের অর্ধেক সরকারি কোষাগার আর অর্ধেক ইউনিয়ন পরিষদ অফিস দেয়। স্থানীয় সরকার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা নিয়মিত পেলেও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিয়মিত পান না। মাসের প্রথম সপ্তাহেই সামান্য ভাতার টাকা ফুরিয়ে যায়। বাকি দিনগুলো ধারদেনা করে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে অথবা পরের বাড়িতে কাজ করে চলতে হয়। সারা দেশে গ্রামপুলিশরা ২৪ ঘণ্টা ডিউটি পালন করতে হয়। বর্তমানে একজন ভিক্ষুকও দৈনিক ৩০০ টাকা আয় করে। অথচ গ্রামপুলিশের দৈনিক বেতন মাত্র ১০০ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে এ দিয়ে জীবন ধারণ করা অসম্ভব। সন্তানদের পড়াশোনা করানো স্বপ্ন বলাই চলে। বেতন সরকারি চতুর্থ শ্রেণীর বেতন স্কেলে উন্নীত করা হলে গ্রামীণ উন্নয়ন আরো জোরদার হবে বলে আশা করেন তারা।

চাকরির বিধিমালা পরিবর্তনসহ কয়েক দফা দাবিতে অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন গ্রামপুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। যে আইনটি সংশোধনের দাবি তারা করছেন, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররাও তা সংশোধনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের দাবি, গ্রামপুলিশকে চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীর মতো জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তকরণ, স্থায়ী হেডকোয়ার্টার ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন, স্বল্পমূল্যে রেশনিং চালু, ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকা অবসরকালে প্রদান, গ্রামপুলিশদের ছেলেমেয়েদের জন্য সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটা, ঝুঁঁকি ভাতাসহ চাকরির নিশ্চয়তা প্রদান ইত্যাদি। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি পালন করেছে ‘বাংলাদেশ গ্রামপুলিশ কর্মচারী ইউনিয়ন’।

গ্রামপুলিশ সদস্যরা দেশের ৬৮ হাজার গ্রামে নিরাপদ রাখার কাজে নিয়োজিত আছেন। অথচ নামে পুলিশ হলেও তাদের কোনো মূল্যায়ন নেই। সব ক্ষেত্রেই তারা অবহেলিত। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, যেন তাদের জাতীয় পে-স্কেল দেয়া হয়। ৪৬ হাজার ৮৭০ জন গ্রামপুলিশ যেন ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে এবং মনোযোগ দিয়ে সরকারি আদেশ পালন করতে পারেন। সারা দেশের চার হাজার ৫৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদের গ্রামপুলিশদের সরকার যদি ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ ও সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হবে, তেমনি সন্ত্রাস-উগ্রবাদ নির্মূল করাও সম্ভব হবে। তদুপরি, মাদকের কালো থাবা থেকে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে গ্রামপুলিশদের সহায়তা ও কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ রবিদাস ফোরাম

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫