ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

ইতিহাস-ঐতিহ্য

উৎসব আমেজে লোককারুশিল্প মেলা

হাসান মাহমুদ রিপন

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,শনিবার, ১৭:১০


প্রিন্ট

বারো মাসে তেরো পার্বণ পালনের ঐতিহ্যের অনুসরণে প্রতি বছর লোকও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন তাদের বিশাল চত্তরে কারুপণ্য মেলার আয়োজন করে। ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পর চার শ’ তিন বছরের রাজধানী সোনারগাঁও ইতিহাসের পাতা থেকে নির্বাসিত হয়। খাপখোলা তরবারির ঝনঝন শব্দ, বেগবান অশ্বখুরের টকবগ আওয়াজ, রঙমহলের অন্দরে বাঈজীদের নূপুরের ধ্বনি- সব কিছু হারিয়ে গৌরবোজ্জ্বল জনপদ সোনারগাঁও পরিত্যক্ত হয়। সেই শান্ত জনপদ আবার মুখরিত হয়ে উঠেছে কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবের আমেজে। আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির শক্তি ও সম্ভাবনা আবহমান বাংলার লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যে নিহিত। আর মহাকালের জগদ্দলে চাপা পড়া আমাদের এই আত্মজ ঐতিহ্যকে নিয়মিতভাবে সবার সামনে সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করে আসছে লোকশিল্পের ঐতিহ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও পুনরুদ্ধারকারী কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। প্রতিদিন অগণিত মানুষ কর্মব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে আসছে সোনারগাঁওয়ে। গ্রামের প্রতি নাড়ির চিরন্তন টান আর ভালোবাসার আকর্ষণে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের মানুষও দলবদ্ধভাবে ভিড় করছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের গড়ে তোলা শিল্পগ্রামে। সোনারগাঁওয়ে এই লোকজ উৎসবে গ্রামীণ ঐতিহ্যের কী না আছে! রাঙামাটির নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর তাঁত শিল্প থেকে শুরু করে সোনারগাঁওয়ের হাতি ঘোড়া, জামদানি, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি, বাঁশ-বেত, সোনারগাঁওয়ের দারুশিল্প, নকশিকাঁথা, টেপা পুতুল, কিশোরগঞ্জের মৃৎশিল্প, মাগুরার লুপ্তপ্রায় শোলা শিল্প সবই আছে এই মেলায়।

ফিরে দেখা
১৯৭৬ সাল থেকে এ ফাউন্ডেশনে মেলা শুরু হয়। প্রথমে বৈশাখী মেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও পরে লোককারুশিল্প ও লোকজ উৎসব হিসেবে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ৭ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা এবং ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মাসব্যাপী লোক ও কারুশিল্প মেলা হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ২০০২ সালে ২১ দিন, ২০০৩ সালে ১৯ দিন, ২০০৪ সালে আবার ২১ দিন এবং ২০০৫ সাল থেকে পুনরায় মাসব্যাপী এ মেলা হয়ে আসছে। ১৯৯১ সাল থেকে এ মেলা লোকজ উৎসবের আঙ্গিক আনা হয়েছে।

মেলার মাঠে প্রদর্শিত হচ্ছে বিয়ের অনুষ্ঠান

মেলার মাঠে প্রদর্শিত হচ্ছে বিয়ের অনুষ্ঠান

বর্ণাঢ্য সাজে মেলা চত্বর
মাসব্যাপী লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব যেন এক সার্বজনীন উৎসব। মেলা উপলক্ষে ১৫০ বিঘা আয়তনের ফাউন্ডেশনের বিশাল চত্বরকে সাজানো হয়েছে বর্ণাঢ্য সাজে, ভিন্ন আঙ্গিকে ও বর্ণিল ঢঙে। লাল-নীল বাতি দিয়ে মালার মতো করে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে ভবনগুলোর ইট নির্মিত শরীরে। এই বাতিগুলো সন্ধ্যা নামতে-না-নামতেই জ্বলা-নেভার লুকোচুরি খেলায় মেতে ওঠে। গতানুগতিকতার প্রাচীর ভেঙে অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য ফাউন্ডেশনের প্রধান ফটকের পাশে ‘কাদায় পড়া গরুরগাড়ি’ ভাস্কর্যের সামনের রাস্তার দুই পাশে দুটো বর্ণাঢ্য মুরালে গেট নির্মিত হয়েছে। এ সড়কটির উভয় পাশ দিয়ে বিভিন্ন ফুলের উষ্ণ অভিবাদন জ্ঞাপন করেছে এবং প্রবেশে ডান হাতের পাশে বাঁশ ও কাগজের তৈরি আকর্ষণীয় একটি ময়ূর পাখি দাঁড়িয়ে আছে, যা মেলার সৌন্দর্যকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কী দারুণ দেখাচ্ছে মেলার বিশাল চত্বর! মেলা উপলক্ষে বিভিন্ন দেয়ালে চিত্রিত হয়েছে ফাউন্ডেশনের প্রদর্শন কর্মকর্তা এ কে এম আজাদ সরকারের লোকজীবনের চিত্রকল্প ‘ম্যুরাল’। ফাউন্ডেশনের মূল আঙিনা থেকে মেলার দিকে ধাবিত বিভিন্ন রঙিন পতাকাশোভিত রাস্তার ধারে ধারে বিভিন্ন লোকজ প্রবাদবাক্য ও খনার বচন সংবলিত প্ল্যাকার্ড ফেস্টুন দিয়ে মেলার পুরো চত্বর সাজানো হয়েছে। সোনারগাঁওয়ের লোককারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পুরো আঙিনা যেন আরেক বাংলাদেশ। প্রকৃতির ছায়াঘেরা নয়নাভিরাম স্থানটিতে বৃক্ষরাজির সমাহার, সাঁকো, লেক, পুকুর, নৌকা, এখানে-সেখানে গ্রামবাংলার নানা নিদর্শন- সবই আছে ফাউন্ডেশন চত্বরে। মাঘের শীতার্ত পরিবেশে এ ফাউন্ডেশনের চলছে লোককারুশিল্প ও লোকজ উৎসব। এ মেলায় যেন পুরো বাংলাদেশকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

 মেলায় প্রদর্শিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খেলা

মেলায় প্রদর্শিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খেলা

নানা অনুষ্ঠানে লোককারুশিল্প মেলা
বাঙালি জীবনের প্রতিদিনের আচার অনুষ্ঠান এবং নিজস্ব আনন্দ উৎসবের সহজ-সরল শৈল্পিক প্রকাশই লোককারুশিল্প মেলা। ফলে লোকসংস্কৃতির ফসল লোককারুশিল্প এবং লোকসঙ্গীতের বাজারজাতকরণ, প্রসার, উজ্জীবন মেলা আমাদের জীবনধারায় সুপরিচিত। এই পরিচিত রূপই পাওয়া যাবে এ মেলায়। লোকজ শিল্পীদের জারি-সারি, ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া, বাউল, পালাগান, মুর্শিদী, মারফতি, লালনগীতি, হাছন রাজার গান, কবিগান, গম্ভীরা, বিয়ের গান, আলকাপ গান, রাধা-রমণের গান, গায়েহলুদের গান, পুঁথিপাঠ, লোকজ নাটক, গীতিনাট্য, লোককাহিনীর যাত্রাপালা, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনের জমজমাট আসর হাজারো দর্শককে মাতোয়ারা করে তুলছে। এ ছাড়া লোকসমাজের জীবনধারণ রীতি থেকে শুরু করে শস্য উৎপাদনরীতি, খেলাধুলা, লৌকিক উৎসব, অভিনয়, নৃত্য, কারুশিল্প, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, পোশাক পরিচ্ছন্ন, অলঙ্কার, জামদানি, মাটির হাঁড়িপাতিল, পুতুল, নকশিকাঁথা, পোড়ামাটির ফলক, দেয়ালচিত্র, লোকজ বাদ্যযন্ত্র, একতারা প্রভৃতি স্থান পেয়েছে মেলায়। লোককারুশিল্পের প্রসারের জন্য প্রতি বছরের মতো আকর্ষণীয় বিভিন্ন খেলা, গান, প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ছাড়াও এবারের উৎসবে গ্রামবাংলার আর্থসামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি উপস্থাপন করা হয়েছে বৈচিত্র্যময়ভাবে। মেলা ও উৎসবে বিলুপ্তির অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে বাঙালির শৈশবের সম্পদ গ্রামীণ খেলাধুলা যেমন- কানামাছি, বৌচি, এক্কা-দোক্কা, লাঠিখেলা, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, হা-ডু-ডু, ওপেনটি বায়স্কোপ, মোরগলড়াই, আঁকুনি টুকুনি, ইছোন বিছোন প্রভৃতি খেলাও পরিবেশিত হচ্ছে।

কর্মময় কারুশিল্পী : বিশেষ প্রদর্শনী
হারানো ঐতিহ্য পুনরাবিষ্কার করা, অজানা কারুশিল্প ও শিল্পীকে লোকসমক্ষে তুলে ধরা, কৃর্তী কারুশিল্পীদের কাজের প্রেরণা জোগানো কারুশিল্পীকে পুনরুজ্জীবিত করা এই ফাউন্ডেশনের অন্যতম উদ্দেশ্য। মেলার বিশেষ আকর্ষণ হলো আয়োজক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ প্রদর্শনী দেশের প্রথিতযশা কারুশিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে ‘কর্মময় কারুশিল্পী’ প্রদর্শনী। এটি মেলার মূল চত্বরের মাঠের মাঝে অবস্থিত। এই বিশেষ প্রদর্শনীতে ৩০টি স্টলে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ৬০ কারুশিল্পী দেশের হারানো ঐতিহ্যকে নতুন করে আবিষ্কার করছে। প্রদর্শনীর গ্যালারিগুলো কারুশিল্পীরা তাদের স্বহস্তে তৈরি করছেন সিলেট ও মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের শীতলপাটি, নওগাঁ ও মাগুরার শোলা শিল্প, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি ও মুখোশ, ঢাকার শাঁখাশিল্প ও মৃৎশিল্প, চট্টগ্রামের তালপাতার হাতপাখা, রংপুরের শতরঞ্জি, ঠাকুরগাঁওয়ের বাঁশের কারুশিল্প, সোনারগাঁওয়ের এক কাঠের চিত্রিত হাতি ঘোড়া পুতুল ও কাঠের কারুশিল্প, নকশিকাঁথা, বেতের কারুশিল্প, কুমিল্লার তামা-কাঁসা পিতলের কারুশিল্প, রাঙামাটি, বান্দারবান ও সিলেটের ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর কারুপণ্য, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা শিল্পসহ ইত্যাদি কারুপণ্য। এখানে শিল্পীরা বসেই তাদের নিপুণ হাতে নিজস্ব মেধা ও মননে তৈরি করছে বাহারী কারুপণ্য এবং তা প্রদর্শন ও বিক্রি করছে। প্রদর্শনীর গ্যালারিগুলোতে থরে থরে সাজানো কারুপণ্যের পসরা দেখে কেউ কেউ লোভ সামলাতে না পেরে কেনাকাটা করছেন শখের চিত্রিত হাঁড়ি, শোলা শিল্প, কাঠেরসামগ্রী, শতরঞ্জি, নকশিকাঁথাসহ বিভিন্ন কারুপণ্য সামগ্রী। এ ছাড়া এ বছরের মেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম ‘কাঠের কারুশিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন’ শিরোনামে প্রদর্শনী আয়োজন করেছে আয়োজকেরা।

লোকজীবন প্রদর্শনী
কারুশিল্প মেলার এক পাশে চলছে জীবন্ত প্রদর্শনী। আবহমান বাংলার লৌকিক আচার এবং ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিই ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে এ প্রদর্শনীতে। সোনারগাঁওয়ের বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে প্রদর্শিত হচ্ছে গায়েহলুদের গান, পালকিতে বর, পণ্ডিত মশাইয়ের পাঠশালা, লোকজ নকশি পিঠা তৈরি, বর-কনে সাজা ইত্যাদি।
এবারের মেলায় মোট স্টল রয়েছে ১৮০টি। মুড়িমুড়কি, মণ্ডামিঠাই, চটপটি থেকে শুরু করে গ্রামীণ হস্তশিল্প, বাঁশবেত, কাঠ, লোহা, পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী বিলুপ্তপ্রায় কুটির শিল্পের পসরার বসেছে মেলায়। মেলা চলবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

ইতিহাসের নানা ক্রান্তিকালে এ দেশের অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। সময়ের চাকা বেয়ে অনেক ঐতিহ্য আজ বিলুপ্ত। সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পুনরায় আনয়ন করে সোনার বাংলাকে ভরিয়ে তুলতে সোনারগাঁওয়ে বসেছে এ মেলা। মেলা ও উৎসবকে আরো সরব করে রাখার দায়িত্ব পড়েছে সোলেমানের ওপর। সে মুখে রঙ মেখে সঙ সেজে নানা অঙ্গভঙ্গি করে হাস্যরসাত্মক কর্থাবার্তা বলে দর্শনার্থীদের হাসাতে হাসাতে পেটে খিল ধরিয়ে দিচ্ছে। মাসব্যাপী লোককারুশিল্প মেলায় জন মানুষের চিত্ত বিনোদনের যে ভূমিকা রয়েছে এটা অন্যান্য মেলাতে নেই বলেই চলে। এ মেলা বিনিময় ঘটায় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সংস্কৃতিবিষয়ক চিন্তা-চেতনায়। এতে দূরের মানুষ কাছে আসে এবং পর আপন হয়। মানুষ মানুষে আনন্দ হিল্লোল করার মাধ্যমে ভাবের আদান প্রদান হয়।

ছবি : মো: শফিকুর রহমান

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫