ঢাকা, রবিবার,১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

অনলাইন জগৎ

বিটকয়েন লেনদেনে সতর্কতা

আহমেদ ইফতেখার

০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ১৭:০৩ | আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ১৮:৩৯


প্রিন্ট
বিটকয়েন লেনদেনে সতর্কতা

বিটকয়েন লেনদেনে সতর্কতা

২০০৯ সালে বিটকয়েনের যাত্রা শুরু হয়। সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’ প্রচলন করে। যার নাম দেয়া হয় বিটকয়েন। ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অনলাইনে দু’জন ব্যবহারকারীর মধ্যে এটি সরাসরি আদান-প্রদান হয়। নিজের পরিচয় প্রকাশ না করে এ পদ্ধতিতে লেনদেন করা যায়। বিটকয়েন নিয়ে লিখেছেন আহমেদ ইফতেখার

বিটকয়েনের পুরো প্রক্রিয়াটি সারা হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সফটওয়্যারের মাধ্যমে, লেনদেনটি যে সার্ভারে সুরক্ষিত থাকে তাকে বলে মাইনার। মাইনারের মাধ্যমে বিটকয়েন তৈরি হয়। একটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়। বিটকয়েনের লেনদেন হয় গ্রাহক থেকে গ্রাহকের কম্পিউটারে। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বিটকয়েনের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে। বিটকয়েন মাইনারের মাধ্যমে যে কেউ বিটকয়েন উৎপন্ন করতে পারে। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াটা সব সময় অনুমানযোগ্য এবং সীমিত। বিটকয়েন উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে এটি গ্রাহকের ডিজিটাল ওয়ালেটে সংরক্ষিত থাকে। এই সংরক্ষিত বিটকয়েন যদি গ্রাহক কর্তৃক অন্য কারো অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় তাহলে এই লেনদেনের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইলেকট্রনিক সিগনেচার তৈরি হয়ে যায়, যা অন্যান্য মাইনার কর্তৃক নিরীক্ষিত হয় এবং নেটওয়ার্কের মধ্যে গোপন অথচ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত হয়। একই সাথে গ্রাহকদের বর্তমান লেজার কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে হালনাগাদ হয়।

বিটকয়েন দিয়ে কোনো পণ্য কেনা হলে তা বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় এবং বিক্রেতা পরে সেই বিটকয়েন দিয়ে আবার পণ্য কিনতে পারে, অন্য দিকে সমান পরিমাণ বিটকয়েন ক্রেতার লেজার থেকে কমিয়ে দেয়া হয়। প্রতি চার বছর পরপর বিটকয়েনের মোট সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করা হয়, যাতে বাস্তব মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্য রাখা যায়।

বিটকয়েনের লেনদেন সম্পন্ন করতে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন পরে না। এর লেনদেনের গতিবিধি কোনোভাবেই অনুসরণ করা যায় না। তাই বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বিটকয়েন ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বৈধ পণ্য লেনদেন ছাড়াও মাদক চোরাচালান ও অর্থপাচার কাজেও বিটকয়েনের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি কানাডার ভ্যানক্যুভারে বিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এটি বিটকয়েনকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে। মাদক, চোরাচালান অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য বেআইনি ব্যবহার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডীয় সরকার বিটকয়েনের গ্রাহকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা করছে।

বিটকয়েনের সাফল্য অনুপ্রাণিত হয়ে আরো প্রায় এক হাজারের বেশি ডিজিটাল মুদ্রার আবির্ভাব ঘটেছে। এর মধ্যে সফল হওয়া কয়েকটি হচ্ছে ইথেরিয়াম, জেডক্যাশ, বিটকয়েন ক্যাশ, রিপল ও লাইটকয়েন। অনলাইনে লেনদেনে বিটকয়েন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার হয়ে আসছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকে এবং দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এ ‘ক্রিপটোকারেন্সি’। বাংলাদেশেও সম্প্রতি এর লেনদেন শুরু হয়েছে।

এথেরিয়াম
২০১৫ সালে তৈরি হয় এথেরিয়াম। বিটকয়েনের মতো এই মুদ্রারও নিজস্ব হিসাব ব্যবস্থা আছে। বিনিময় মূল্যের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিটকয়েনের পরই আছে এথেরিয়াম। গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই ভার্চুয়াল মুদ্রার বাজারে পুঁজির পরিমাণ প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০১৬ সালে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর এটি দু’টি মুদ্রায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর বিনিময় মূল্য ৮৪০ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার পর প্রতিটি এথেরিয়াম মুদ্রা ১০ সেন্টে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছিল।

রিপল
২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপল। শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি নয়, অন্যান্য ধরনের লেনদেনও করা যায় এ ব্যবস্থায়। প্রচলিত ধারার বিভিন্ন ব্যাংকও এই ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করছে। বাজারে ১০ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি আছে রিপলের।

লাইটকয়েন
বিটকয়েনের সাথে বেজায় মিল আছে লাইটকয়েনের। বিটকয়েনের চেয়ে দ্রুত লেনদেন করা যায় লাইটকয়েনে। এর বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার।

---------------------------

বিটকয়েন মনিটরিং করার কোনো কর্তৃপক্ষ নেই

সম্প্রতি বিটকয়েন মুদ্রাটি আলোচনায় আসার কারণ মুদ্রাটির মূল্য হু হু করে রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গেছে। ফলে অনেকেই এই বিটকয়েন কেনার দিকে ঝুঁকছে। তবে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। অনেক সময় শোনা যায় আন্তর্জাতিক হ্যাকাররা বিভিন্ন কম্পিউটার হ্যাক করে মুক্তিপণ দাবি করছে আর সে মুক্তিপণ পরিশোধ করতে বলা হয় বিটকয়েনে।

বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, এটি ইন্টারনেট সিস্টেমে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে প্রোগ্রামিং করা আছে, যা চাইলে কেনা যায়। প্রতি বছর এটি অল্প অল্প করে বাড়ানো হয়ে থাকে। ১০-১৫ বছর পর্যন্ত হয়তো বাড়বে, তার পর আর বাড়বে না। এটি এমন একটি কয়েন যেটি কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কোনো দেশের জারি করা নয়। ইন্টারনেট সিস্টেমকে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি এ সিস্টেমকে ডেভেলপ করেছে। এটিকে বলা যেতে পারে এক ধরনের জুয়াখেলা, যার ভিত্তিতে হয়তো আমার টাকা খাটিয়ে লাভজনক কিছু করে ফেলতে পারি। এ জন্য বেশির ভাগ লোক এর পেছনে এখন ছুটছে।
এ মুদ্রার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে মনিটরিং করার কোনো কর্তৃপক্ষ নেই, এর সাথে নেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কয়েক দিন আগে এর দাম ছিল এক হাজার ডলার। তারও আগে ছিল ১০০ ডলার। এক বছরের মধ্যে ১০০ থেকে এক হাজার ডলারে দাম ওঠে যায়। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে এর দাম উঠে গেছে ১৯ হাজার ডলারে।

এটি র‌্যাশনাল বিহেভিয়ার নয়; এখানে অনেকেই এর পেছনে বিনিয়োগ করছেন আরো বেশি টাকার জন্য। এমন ক্ষেত্রে হঠাৎ করে এসব লোক বাজার থেকে সরে গেলে বিপদে পড়বেন অনেকেই। এই অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেন, এটিই আমাদের আশঙ্কা। যেহেতু এখানে কোনো কর্তৃপক্ষ নেই, টাকা আরো বেশি সরবরাহের কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং এটি যখন কলাপস করবে বা উপরের দিকে যাবে, এটি নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ম্যাকানিজম নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিটকয়েনে বিনিয়োগ না করতে। কারণ এটি কোনো অনুমোদিত কারেন্সি নয়। এটিতে বিনিয়োগ করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিটকয়েনের আইনি কোনো ভিত্তি নেই বলে ঝুঁকি এড়াতে বিটকয়েন দিয়ে লেনদেন কিংবা এর প্রসারে সহায়তা কিংবা প্রচার থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাংলাদেশে বিটকয়েনের লেনদেনের সঠিক কোনো তথ্য তাদের কাছে না থাকলেও বিভিন্ন মাধ্যমে তারাও লেনদেনের খবর পেয়েছেন। যেহেতু এই লেনদেন অবৈধ। এর আইনি কোনো ভিত্তি নেই। এই লেনদেন হলে মানুষের ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। সে কারণে মানুষ যাতে এই লেনদেন কোনো অবস্থাতেই না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করতেই এই বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নামবিহীন বা ছদ্মনামে প্রতিসঙ্গীর সঙ্গে অনলাইনে ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের দ্বারা মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫