ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

পাঠক গ্যালারি

এসব প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য কী?

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

৩১ জানুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ১৯:০০


প্রিন্ট
এসব প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য কী?

এসব প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য কী?

আমাদের সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্যই আমরা অনেক ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু গণতন্ত্রের নামে আমাদের দেশে যে রকম মহড়া চলছে, তা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর কতটা? মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে যে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়, তাকে গণতন্ত্র বলা হয়। আধুনিক কালের চিন্তাবিদ লর্ড ব্রাইস গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, ‘A government in which the will of the majority of the qualified citizens rules ...say, at least three-fourths so that the physical force of the citizens coincides with their voting power.’ অর্থাৎ যে শাসন পদ্ধতিতে অন্তত তিন-চতুর্থাংশ নাগরিকের সমর্থন পেয়ে শাসনকার্য পরিচালিত হয়, তাই গণতন্ত্র। এ ক্ষেত্রে এটাও উল্লেখযোগ্য, নাগরিকের ভোটের শক্তি যেন তাদের শারীরিক শক্তির সমান হয়।

আমাদের দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এসব এখন ‘কেতাবি হয়ে’ গেছে। এ দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ-অনুভূতি, চিন্তাচেতনা, বোধ-বিশ^াস অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হওয়ার কথা। এটি গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রও। কিন্তু আমাদের চরমদুর্ভাগ্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে দেশ তো চলছেই না, বরং তাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে গণবিচ্ছিন্ন এক অপশক্তি। তারা প্রতিনিয়ত দেশের মানুষের চিন্তাচেতনা ও বোধ-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

মূলত জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে ছিন্নমূল একটি অপশক্তি দেশ ও জাতিসত্তাবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তারা এক দিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্ম ইসলাম ও ইসলামি মূল্যবোধ নিয়ে গভীর চক্রান্ত্রে লিপ্ত। অপর দিকে, তারা দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকারকেও তোয়াক্কা করছে না, বরং নিজেরা সরকারের ‘সহায়ক শক্তি’ হিসেবে দাবি করে এমন তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে, যা সরকারকেও বিতর্কিত করছে। মূলত সরকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একশ্রেণীর বিভীষণের আশকারা পেয়ে তারা এখন অপ্রতিরোধ্যই হয়ে উঠেছে। তারা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।

অপশক্তির ভূত এখন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ঘাড়েও চেপে বসেছে। সদ্য অনুষ্ঠিত ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ২০০ প্রশ্নের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ রাষ্ট্র জিয়াউর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ-বীরোত্তমসহ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কিংবা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে একটি প্রশ্নও রাখা না হলেও শুধু কমিউনিজম তথা বস্তুবাদী আদর্শ নিয়েই রাখা হয়েছে চারটি প্রশ্ন। এ অবস্থায় প্রশ্নকর্তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থা কি তাহলে কমিউনিস্টরা নিয়ন্ত্রণ করছেন? এমন প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। এটা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য মোটেই শুভ ইঙ্গিত বহন করে না।

বিসিএসের ৩৮তম প্রিলিমিনারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিসিএসের প্রশ্নপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর ২০০টি প্রশ্নের মধ্যে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিংবা ইসলাম বা অন্য কোনো ধর্ম সম্পর্কে একটি প্রশ্নও রাখা হয়নি। অথচ শুধু কমিউনিজম বা বাম রাজনীতি নিয়েই অন্তত চারটি প্রশ্ন রাখা হয়েছে। একটি মহল দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতি ও বোধ-বিশ্বাস নিয়ে এভাবে ষড়যন্ত্র করার সাহস পায় কেমন করে?

সদ্যসমাপ্ত বিসিএস পরীক্ষার ৪ নম্বর সেট ও সুরমা কোড নামের একটি প্রশ্ন গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে এসেছে। প্রথম প্রশ্নটিই করা হয়েছে লেলিনের একটি বইয়ের নাম দিয়ে। প্রশ্নটি ছিল- ‘Imperialism, the highest Stage of capitalism’ বইটি কার লেখা? এর উত্তর হবে, ভি আই লেলিন। ১৬ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়েছে- ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল কোনটি? তার উত্তর হবে, কমিউনিস্ট পার্টি। ২০ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়েছে- অক্টোবর বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন কে? এর উত্তর হবে লেলিন। এ ছাড়া মার্কসবাদ দিয়ে ৬ নম্বর প্রশ্ন করা হয়েছে।

আমাদের দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। কমিউনিজম ধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি নাস্তিক্যবাদী মতাদর্শ। এমন পরিস্থিতিতে ধর্মবিরোধী মতাদর্শ নিয়ে চারটি প্রশ্ন করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরাও। কমিউনিজম নিয়ে প্রশ্ন রাখাটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতিসহ জাতীয় নেতাদের নিয়ে কিংবা ধর্ম বিষয়ে একটিও প্রশ্ন না করা বিস্ময়কর পক্ষপাতিত্ব। এটা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে অবজ্ঞা করা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
বাংলাদেশে কমিউনিজমে বিশ্বাসী কিংবা ধর্মবিদ্বেষী ও নাস্তিক লোকের সংখ্যা এক শতাংশেরও কম। অথচ তারাই অনেক ক্ষেত্রে সরকারের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছেন। শিক্ষামন্ত্রী ঘুষকে ‘সহনীয়’ পর্যায়ে রাখার কথা বলে লোক হাসিয়েছেন। তার আমলে প্রশ্নফাঁসের মহামারী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে। এবার দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষিত বিসিএস ক্যাডারদেরকে টার্গেট করা হয়েছে। বলা যায়, মহল বিশেষ সরকারের ঘাড়ে চেপে নিজ স্বার্থ হাসিল করতে চায়। আর এসব গণবিচ্ছিন্ন পরজীবীদের অপকর্মের দায়ভার সরকারকেই বহন করতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা আরো বলছেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ট্যাংকের ওপর উল্লাস করা জাসদ নেতা বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজানো বামনেত্রীসহ অতীতের কমরেড ও কট্টর বামরা আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে বসে আছেন। তারা পাঠ্যপুস্তক থেকে বেশির ভাগ মুসলিম লেখক ও কবির রচনাকে বিদায় করে দিয়েছেন। উপর্যুপরি সাফল্যে তারা এখন বিসিএস প্রশ্নের মাধ্যমে নিজভূমে প্রত্যাখ্যাত ও পতিত কমিউনিজমকে শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এটা জাতীয় পরিচয়কে অস্তিত্ব সঙ্কটে ফেলতে পারে।

এর আগে ঢাকা বোর্ডের উচ্চমাধ্যমিকের বাংলা বিষয়ের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে সুকৌশলে ইসলামের প্রতি অবজ্ঞা এবং সুচতুরভাবে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের চরিত্রহননের চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রশ্ন প্রণেতারা মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অপচেষ্টা করেছেন। ইসলাম, ইসলামি আদর্শ-ঐতিহ্য, ঈমান ও আমল নিয়ে আজগুবি মিথ্যা গল্পের অবতারণা করে ইসলাম এবং এই আদর্শের ধারক-বাহকদের খারাপ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। অবমাননা করা হয়েছে ইসলামি স্থাপনা, দাড়ি ও টুপিসহ ইসলামি আখলাক-সুরতকে। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রশ্নপত্রে সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেয়া হয়েছে। মুসলমানকে সন্ত্রাসী এবং হিন্দুদের মহানুভব হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। মূলত এসব বিভীষণ জনগোষ্ঠীকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাদের বস্তাপচা আদর্শের প্রচার চালাতে চায়।
পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নে ইসলাম ও ইসলামি মূল্যবোধকে আঘাত করে উসকানির চেষ্টা হয়েছে। বোর্ড পরীক্ষায় এ ধরনের প্রশ্নপত্র তৈরির মাধ্যমে কী মেসেজ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা? দেশের আলেম-উলামা ও শিক্ষাবিদরা মনে করেন, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং বস্তুবাদী চিন্তাচেতনাকে উসকে দিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই একটি মহল এ কাজ করেছে। ইসলাম ধর্মের প্রতি বিষোদগার ও ইসলামি ব্যক্তিত্বদের প্রতি অপবিশেষণে বিশেষিত করে ছাত্রছাত্রীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যেন ইসলাম, মূল্যবোধ ও ইসলামের ধারক-বাহকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পায় এবং ইসলাম থেকে দূরে সরে আসে সেই চেষ্টারই অংশ এ ধরনের কাজ।

গত বছর ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের এসএসসি পরীক্ষায় বাংলা প্রথম পত্রের প্রশ্নে ইসলাম, ইসলামী রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও উলামা-মাশায়েখদের নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী তিনটি গল্প (উদ্দীপক) তুলে ধরা হয়। বাংলা আবশ্যিক প্রশ্নে ৮ নম্বর উদ্দীপকে বলা হয়, ‘আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক এমদাদ। ধর্ম-খোদারসূল কিছুই বিশ্বাস করে না। খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়ে একেবারে বদলে গেল। পীরের মুরিদ হয়েছে এবং নিয়মিত নামাজ পড়ছে। পীরের ভণ্ডামি ও লোলুপ দৃষ্টি এমদাদের কাছে ধরা পড়ল। মুরিদের সুন্দরী বউ কলিমনকে জোরপূর্বক তালাক পড়িয়ে নিজে বিয়ে করেছে। এমদাদ এতে ক্রুদ্ধ হয়ে পীরের মেহেদিরঞ্জিত দাড়ি ধরে হেঁচকা টানে মাটিতে ফেলে দিলো।’

মূলত, এটি প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ মরহুম আবুল মনসুর আহমদের ‘আয়না’ রম্যগ্রন্থের ‘হুজুর কেবলা’ গল্পের অংশ বিশেষ। প্রশ্নপত্রে উল্লিখিত অংশ এত বছর পর উদ্বৃত হওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হওয়ার অবকাশ থাকছে। কিন্তু প্রশ্ন প্রণেতারা এটা কেন প্রশ্নের অংশ করলেন বা তারা শিক্ষার্থীদের কী বার্তা দিতে চাচ্ছেন এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। অসৎ উদ্দেশ্যেই প্রশ্নপত্রে কথাগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে।

৫ নম্বর উদ্দীপকে বলা হয়েছে, ‘মানুষ ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। হিন্দু-মুসলমানদের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে যেখানে প্রাণের মিল, আদত সত্যের মিল, সেখানে ধর্মের বৈষম্য কোনো হিংসার দুশমনীর ভাব আনে না। যার নিজের ধর্মে বিশ্বাস আছে, যে নিজেকে ধর্মের সত্যকে চিনেছে, সে কখনো অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না।’ এই উদ্দীপকের খ নং প্রশ্নে বলা হয়েছে ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই’- পঙ্ক্তিটি বুঝিয়ে লেখ। এসব প্রশ্নে দেখা যায়, ইসলাম ও মুসলমানকে খাটো করা হয়েছে। পীর, দাড়ি, টুপি, নামাজ-রোজাকে নেতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

উলামা ও শিক্ষাবিদেরা বলছেন, এই প্রশ্ন পুরোটাই উদ্দেশ্যমূলক। যদিও সরল মুসলমানরা সেটা বুঝতে পারবে না। গল্প বানিয়ে পরীক্ষার প্রশ্নে এ ধরনের প্রশ্ন করা স্বাভাবিক নয়, বরং উসকানিমূলক।

অনেক লড়াই-সংগ্রাম করার পরও আমাদের দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। জনগণের সক্রিয় সম্মতির ভিত্তিতেই দেশের শাসনকাজ পরিচালিত হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে হচ্ছে তার উল্টোটা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতকে তোয়াক্কা না করে এক শ্রেণীর পরজীবী জাতির ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। উপেক্ষিত হচ্ছেন জনসাধারণ তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।

smmjoy@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫