ঢাকা, রবিবার,১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

নারী

একাই যখন অভিভাবক

বদরুন নেসা নিপা

২৮ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ১৭:২০ | আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ১৭:৪১


প্রিন্ট
একাই যখন অভিভাবক

একাই যখন অভিভাবক

আমাদের দেশে দেখা যায়, বেশির ভাগ সিঙ্গেল মা-ই বিয়ের পর স্বামীর পরকীয়া, দ্বিতীয় বিয়ে, নির্যাতন, বিয়েবিচ্ছেদ, স্বামীর মৃত্যুর কারণে সন্তানদের নিয়ে একা জীবন কাটান। ঢাকা শহরে আলাদা থাকছেন এমন সিঙ্গেল মায়ের হার ২১ দশমিক ২ শতাংশ, বিয়েবিচ্ছেদের কারণে ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং স্বামী মারা যাওয়ায় ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ একাকী মা জীবনের সাথে যুদ্ধ করছেন। বেশ কিছু মা আছেন, যারা সন্তানের সামাজিক স্বীকৃতি পাননি। আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে সিঙ্গেল মায়েদের বেশির ভাগই মানে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ কর্মজীবী। সংসার, চাকরি ও সন্তান সামলাতে গিয়ে তারা একসময় হাঁপিয়ে যান। এই মায়েরা দীর্ঘ নিঃসঙ্গতায় বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন হন বেশি

সন্তানের সাথে মায়ের সম্পর্ক নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দরতম সম্পর্ক। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার অনেক আগে থেকেই সন্তান আর মায়ের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে যায় ভরসা ও ভালোবাসার এক নিবিড় সম্পর্ক। কোনো বিশেষণ অথবা শব্দের সাহায্যে এ সম্পর্কের গভীরতা ব্যাখ্যা করা যায় না। এবং অবশ্যই পৃথিবীর আর কোনো সম্পর্কের সাথে তার তুলনাও সম্ভব নয়। নিজেদের হাজারো ব্যস্ততা, অসুবিধা- যা-ই থাকুক না কেন, মায়েদের জীবনে সন্তানের গুরুত্ব সব থেকে বেশি হয়। আর মায়েদের সন্তানের প্রতি এই দায়িত্ব কয়েক গুণ বেড়ে যায় যদি তিনি হন সিঙ্গেল প্যারেন্ট। মা ও বাবা সন্তানের জীবনে দু’জনেরই প্রয়োজন মেটাতে হয় একা। স্বামীর মৃত্যু অথবা বিয়েবিচ্ছেদ নানা কারণেই একজন মহিলাকে তার সন্তানের দায়িত্ব সব একাই সামলাতে হতে পারে।

বয়স চল্লিশের ঘর ছুঁই ছুঁই ফারজানার (ছদ্মনাম)। স্বামী ও এক মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার। বিবাহিত জীবনের সাত বছরের মাথায় স্বামীর মৃত্যু হয়। স্বামীর প্রতিষ্ঠানেই চাকরি নেন ফারজানা। মেয়েকে নিয়ে এখন দশ বছরের সাজানো সংসার। সন্তানকে বড় করা, সংসার চালানো এবং একাই যুদ্ধ করেছেন নিজের ও সমাজের সাথে। মেয়ের কথা ভেবেই দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। স্বপ্ন শুধু একটাই- মেয়েকে উপযুক্ত করতে হবে। নিজের শখ-আহ্লাদ, নিজের মনের কথা পড়াও বন্ধ করে দিয়েছিলেন অনেক আগে। মেয়ের জন্যই এখন বেঁচে থাকার লড়াই।

একদিন সন্তানেরা বড় হয়। তাদের নিজের জগৎ সৃষ্টি হয়। সন্তানদের মনের মতো করে মানুষ করতে পেরে মা হিসেবে হন সার্থক। তবু একসময় খুব একা লাগে। সব দিক এক হাতে সামলে নিতে ক্লান্ত মনে হতে পারে নিজেকে। মনের দিকে তাকালে ধুঁ ধুঁ মরুভূমি, সেখানে শুধু ধূসরতা, বিবর্ণতা। সিঙ্গেল মায়েদের এ যুদ্ধ বাইরে থেকে বোঝা কঠিন।

বাবার বাড়ি থেকে সাহায্য পেলেও কথা শুনতে হয় অনেক সিঙ্গেল মাকে। পারভীন (ছদ্মনাম) হঠাৎ জানতে পারেন স্বামী গোপনে আরেকজনকে বিয়ে করে সংসার করছেন। তখন মনে হয়েছিল এ সংসারে আর নয়, দুই সন্তানকে সাথে নিয়ে বাবার সংসারে চলে এসেছিলেন বাবার গ্রামের বাড়িতে। স্বামী ভরণপোষণও ঠিকমতো দেন না। সেলাই করে সন্তানদের লেখাপড়ার অর্থ জোগাড় করেছেন। আজ ১৫ বছর নিজের সংসার ছেড়ে ভাইদের সংসারের সব কাজ করেন। গ্রামাঞ্চলে লোকলজ্জার ভয়ে, আর লেখাপড়ার গণ্ডিও সামান্য, তাই উপার্জন করার তেমন কোনো পথ ছিল না। ভাইদের ওপরই নির্ভর থাকতে হয়। ফুরফুরে হাসিখুশি থাকলেও মাঝে মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। মনে হয় সব ছেড়ে ছুড়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে।

আমাদের দেশে দেখা যায়, বেশির ভাগ সিঙ্গেল মা-ই বিয়ের পর স্বামীর পরকীয়া, দ্বিতীয় বিয়ে, নির্যাতন, বিয়েবিচ্ছেদ, স্বামীর মৃত্যুর কারণে সন্তানদের নিয়ে একা জীবন কাটান। ঢাকা শহরে আলাদা থাকছেন এমন সিঙ্গেল মায়ের হার ২১ দশমিক ২ শতাংশ, বিয়েবিচ্ছেদের কারণে ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং স্বামী মারা যাওয়ার কারণে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ একাকী মা জীবনযুদ্ধ করছেন। বেশ কিছু মা আছেন যারা সন্তানের সামাজিক স্বীকৃতি পাননি। আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে সিঙ্গেল মায়েদের বেশির ভাগই মানে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ কর্মজীবী। সংসার, চাকরি ও সন্তান সামলাতে গিয়ে তারা একসময় হাঁপিয়ে যান।

এসব মায়ের মনের যাতনা তাদেরকে বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন করে বেশি। গত ১২ ডিসেম্বর কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হয় মনোরোগবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব সাইকিয়াট্রিক ২০১৭’। সেখানে শহুরে মানুষের জীবনের প্রতিদিনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে অনেকগুলো অধিবেশন হয়। এর মধ্যে একটি বিষয় ছিল- ঢাকা শহরের সিঙ্গেল মায়েদের মানসিক অবস্থা কেমন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা: ঝুনু শামসুন্নাহার ১৫৬ জনের মধ্যে জরিপ চালিয়ে তিনি গবেষণাপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ১৫৬ জনের মধ্যে গবেষণা করে দেখা গেছে, অতিরিক্ত কাজের চাপে মানসিক চাপ বোধ করেন। অর্থনৈতিক চাপে আছেন এবং সামাজিক অপদস্থতা ও অপমানের কারণে কোনো-না-কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত হন সিঙ্গেল মায়েরা। এই সিঙ্গেল মায়েরা তাদের বাবার বাড়ি থেকেই বেশির ভাগ সময় সমর্থন পেয়ে থাকেন।

জরিপে দেখা গেছে, সন্তানের দেখাশোনার ক্ষেত্রে সেই হার ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ, আন্তরিক সমর্থন পান ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ। পুরোপুরি আর্থিক সমর্থন পান ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অনেকে স্বামী মারা গেলে শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছুটা সমর্থন-সহযোগিতা পেয়ে থাকেন। তবে সেই হার খুবই কম।
একাকী মায়ের সবচেয়ে বেশি দরকার নিজের ও সন্তানের জন্য সমর্থন। একাকিত্ব যেন একাকী মায়ের জীবনে অন্ধকার না নিয়ে আসে। মনের জোরে বলীয়ান হয়ে নিজের স্বপ্ন, সাধ ও লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন সেই সাহসী ও উদ্যমী মনোভাব তার মধ্যে জাগ্রত থাকতে হবে।

সমাজবিজ্ঞানী আফরোজা খানম বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীরা স্বামীর মৃত্যুর পর কিংবা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে বা পরকীয়া সম্পর্ক, পুত্রসন্তানের জন্ম না হওয়ায়, বিয়েবিচ্ছেদ, স্বামীর নিরুদ্দেশসহ বিভিন্ন কারণে সন্তানকে সাথে নিয়ে তাদের আশ্রয় হয় বাবার বাড়ি কিংবা ভাইয়ের সংসারে। যুগ যুগ ধরে তা চলে আসছে। তারা সামাজিকভাবেও অন্ধকারের এক কোণেই থাকতেন।

সব দোষ, ভুলত্রুটি অপবাদ মুখ বুজেই সহ্য করতেন। সেই প্রেক্ষাপট বেশ কয়েক বছর ধরেই পাল্টে গেছে। এখন নারীদের কর্মপরিধি বিস্তার লাভ করেছে। নারীরা স্বাবলম্বী হতে পারে, সংসারের সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারে। তাই এখন অনেকটাই অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীলতা কমে গেছে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ও পরিবর্তন হয়েছে। সিঙ্গেল মাকে অনেক ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। তার পেশাগত সন্তুষ্টি যেমন জরুরি তেমনি মানসিকভাবে তারা ভালো থাকেন, সেটা খেয়াল রাখার দায়িত্ব সবার। পরিবার সমাজ, রাষ্ট্র থেকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সামাজিক পরিবেশ আমাদের সবাইকে তৈরি করতে হবে।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫