ঢাকা, সোমবার,২৩ এপ্রিল ২০১৮

নারী

বৃটেনে কম বয়সী কাউন্সিলর বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শরিফার গল্প

মো: আবদুস সালিম

২৮ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ১৭:০২ | আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ১৭:২১


প্রিন্ট
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শরিফা রহমান

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শরিফা রহমান

ডারলিংটন বারা কাউন্সিলের ‘রেডহল অ্যান্ড লিংফিল্ড’ নামক ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হ্যাজেলডিন পদত্যাগ করেন তার স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দেয়ায়। ফলে আসনটি শূন্য হয়ে যায়। তা যেন ভাগ্য খুলে দেয় শরিফা রহমানের। যিনি ব্রিটেন শুধু নয়, সারা বিশ্বে পরিচিত একজন সক্রিয় রাজনীতিক হিসেবে। অনেকে তার নানা কৃতিত্ব দেখে তাকে সম্বোধন করেন রীতিমতো তুখোড় রাজনীতিক হিসেবেও। অথচ এখন শরিফা রহমানের বয়স মাত্র ১৮ বছর। অর্থাৎ সবে শেষ করেছেন উচ্চমাধ্যমিকের স্তর।

শরিফা মনে করেন, কাউন্সিলর পদের জন্য লড়ার এখনই উপযুক্ত সময়। অর্থাৎ হাতছাড়া করলেন না এমন সুবর্ণ সুযোগ। নেমে পড়লেন শক্ত প্রচার-প্রচারণায় (ভোটের) এবং এর সার্বিক পরিস্থিতি দেখে অনেকটা বুঝে ফেলেন, জয়ের মুকুট তার মাথায়ই আসবে এবং সত্যি সত্যি তা-ই হলো। শরিফাকে সামান্যতমও নিরাশ বা হতাশ করেননি ভোটাররা। তা যেন শরিফাকে সামনে এগিয়ে যেতে প্রচুর উদ্দীপনা আর শক্তি জুগিয়েছে। কাউন্সিলর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার। শেষ পর্যন্ত বাঘা বাঘা দল যেমন- ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি, গ্রিন পার্টি লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং ইউকে ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টির নামকরা প্রার্থীদের ব্যাপক ভোটে হারিয়ে ঠিকই বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেন এ তরুণী। ভোটের হিসাবে তিনি পান ২৪৯টি ভোট। এটি মোট ভোটের প্রায় ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

শরিফা রহমান বলেন, এ বিজয়ের আরেকটি খুশির খবর হলো, আমি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। আমার মাথায় বিজয়মুকুট আসা মানে সারা বাংলাদেশের মানুষের মাথায় বিজয়ের মুকুট আসা। জয়ের এ গর্ব তাদেরও। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের ডারলিংটন বারা (কাউন্সিলরের আরেক নাম) কাউন্সিলরের উপনির্বাচনে নির্বাচিত তরুণী। এখন তার কাঁধে অনেক দায়িত্ব। দেখভাল করতে হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সম্প্রীতি, নিরাপত্তা, পরিবেশসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। তাকে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে বর্ণবাদ নিয়ে বিরোধ, দ্বন্দ্ব ইত্যাদি।

শরিফা বলেন, সমাজের অগ্রগতির পথে বড় বাধা হচ্ছে সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার, বর্ণবাদ ইত্যাদি। এ থেকে উত্তরণের পথ আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে। এ কারণে শরিফা ইয়াং অ্যাকশন গ্রুপ গড়ে তোলেন বর্ণবাদবিরোধী সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে। এ কাজে এগিয়ে এসেছেন তার কয়েকজন বন্ধু। তাদের সমিতির প্রচেষ্টায় স্টেপ আপ টু রেসিজম নামক বর্ণবাদবিরোধী সংগঠনের শাখার যাত্রা শুরু হয় ডারলিংটনে।

শরিফা বুঝতে পেরেছিলেন, নিজের এসব মতামত তুলে ধরতে ও সেগুলোর কমবেশি বাস্তবে রূপ দিতে হলে ব্যাপক পরিচিতির মাধ্যমে তা করতে হবে। আর এ কারণেই তার রাজনীতির পথ বেছে নেয়া। রাজনীতিতে প্রবেশের পর শরিফা বর্ণবাদ প্রভৃতি নিয়ে প্রচুর সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদ, মিছিল প্রভৃতির আয়োজন করতে থাকেন এবং প্রয়োজনে চলে যান বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে। এভাবে ছুটে যাওয়ার কারণেই বিশ্বের নামকরা অনেক লেবার নেতার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ মেলে তার। তারাও শরিফাকে রাজনীতিতে প্রবেশের অনুপ্রেরণা দিতে থাকেন। এভাবেই তিনি লেবার পার্টিতে যোগ দেন। এটি প্রায় দুই বছর আগের কথা।

ডারলিংটন ইয়াং লেবার গ্রুপের যাত্রা শুরু থেকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন শরিফা রহমান। ২০১৬ সালে তাকে ইয়াং সিটিজেন অব দ্য ইয়ার নাম সম্মানসূচক পদক দেয়া হয় বৈষম্য, বর্ণবাদ, নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখার জন্য। ডারলিংটন শহরের নানা স্থানের উন্নয়নেও তার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। তার মতো অন্যান্য সমাজসেবী, যারা নগরের উন্নয়নে সফলভাবে এগিয়ে এসেছেন তাদের নিয়ে আয়োজন করা হয় বেস্ট অব ডারলিংটন শীর্ষক অনুষ্ঠান। সফলদের স্বীকৃতি দিতে দেয়া হয় পদক।

সম্প্রতি শরিফা ডারলিংটনে চালু করেছেন পিস ক্যাম্পেইন বা শান্তির জন্য প্রচারাভিযান। এতে এগিয়ে আসেন ওখানকার এমপি জেনি চ্যাপম্যান। স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সুম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও বর্ণবাদের কুফল কী সেই ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলাও এর মূল লক্ষ্য। এতে ভালো ফল আসছে বলে এগিয়ে আসে পুলিশ বিভাগও।

একপর্যায়ে সাধারণ জনগোষ্ঠীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শরিফা রহমান আবেগভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন- আমার ওয়ার্ডে নির্বাচিত হওয়াতে এবং আমার দেশের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে আমি সর্বোচ্চ সম্মানিত। আমি যে এলাকা ভালোবাসি তাকে সমর্থন দেয়া আমার জন্য রীতিমতো আনন্দের বিষয়। এতে আমি অবিশ্বাস্য রকম কৃতজ্ঞ ও নমনীয়তা অনুভব করি। আমি আমার এলাকার অধিবাসীদের মুখপাত্র হতে চাই এবং এ কাজে আর বিলম্ব করতে পারছি না।

এত কম বয়সে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া এমন নজির যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে মাঝে মধ্যে দেখা গেলেও শরিফাই তার এলাকার কনিষ্ঠতম কাউন্সিলর বা বারা। আরো আছে অবাক করার বিষয়। তা হলো- ডারলিংটন শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত স্থান। এখানে যতজন কাউন্সিলর রয়েছেন তার মধ্যে বাঙালি কিশোরী শরিফাই একমাত্র অশ্বেতাঙ্গ কাউন্সিলর। তার ওপরে তিনি মুসলিম।

শরিফাদের আদিবাড়ি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার বরমরা গ্রাম হলেও তার জন্ম ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ডারহামের ডারলিংটনে। বেড়েও ওঠেন ওখানেই। কুইন এলিজাবেথ সিক্সথ ফর্ম কলেজের ‘এ’ লেভেলের শিক্ষর্থী ছিলেন শরিফা। এখনো স্থানীয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা তার। তিনি বলেন, এতে করে পড়াশোনার পাশাপাশি কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করা সহজ হবে বলে আমার ধারণা। তবে বেশি ইচ্ছা রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করার।

শরিফা আরো বলেন, বাংলাদেশী পরিবারের সন্তান হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও কিছু করার ইচ্ছা রয়েছে আমার। কেননা, অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি। আমিও ভাবি এসব বিষয় নিয়ে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫