মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়
মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়

মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়

আবদুর রাজ্জাক

মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়ের ঐতিহ্য দীর্ঘ দিনের। এ গুড়ের সুখ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছেছে বিদেশেও। সম্প্রতি মানিকগঞ্জের হাজারী গুড় জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে জেলা প্রশাসন থেকে।

বাঙালিরা এক দিকে যেমন অতিথিপরায়ণ, অন্য দিকে ভোজনবিলাসী। বাঙালির ভোজনবিলাসী রসনা খাবারের তালিকা দীর্ঘ। এটি আবার ঋতু বা মওসুম ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। তেমনি শীতকালের অন্যতম খাবার হলো খেজুরের রস, এই রস থেকে তৈরি গুড় এবং গুড় থেকে তৈরি হরেকরকম পিঠা। খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড়ের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন রকম স্বাদ ও গন্ধ। খেজুরগাছ কাটার ক্ষেত্রে গাছিদের মধ্যে রয়েছে দক্ষতার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। তেমনি রস থেকে গুড় বানানোর মধ্যেও রয়েছে নানা পদ্ধতি। ফলে রস থেকে গুড়ের স্বাদের ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। যেমন- ঝোলাগুড়, চিটাগুড়, পাটালি গুড় প্রভৃতি। মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা এলাকা গুড়ের জন্য বিখ্যাত।

এই এলাকায় নানা ধরনের গুড় পাওয়া যায়। তবে এখানকার ‘হাজারী গুড়’ সমগ্র দেশে এক নামেই পরিচিত। লোভনীয় স্বাদ আর মন মাতানো সুগন্ধে অতুলনীয় হাজারী গুড়ের পরিধি এখন বিশ্বে সমাদৃত। ‘ঝিটকার হাজারী ও পাটালি গুড়’ বাংলার শেষ সুবেদার নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমল থেকেই সুনাম বহন করে আসছে। তখনকার সময় এই হাজারী গুড়ের সুনাম ছিল ভুবনজোড়া।

জনশ্রুতি আছে, একসময় ঢাকার বিখ্যাত নবাব পরিবারের সদস্যরা ‘হাজারী গুড়’ ছাড়া অন্য গুড় দিয়ে ফিরনি পায়েস বা ক্ষীর রান্না করলে সেটি মুখেই দিতেন না। ‘হাজারী গুড়‘ ছিল নবাবদের খাদ্যতালিকার অন্যতম পছন্দের উপাদান। ইতিহাস খ্যাত হাজারী গুড়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য- দু’হাতে গুঁড়ো করে ফুঁ দিলে তা ছাতুর মতো বাতাসে উড়ে যায়।

বিখ্যাত এই হাজারী গুড় সম্পর্কে Final report on survey and settlement operations in the district of Dacca নামক নথিতে (১৯০১-১৯১১ সালে) এসকোলি সাহেবের যে মন্তব্য ছিল, “The Cultivation of date palm is practically confined to the western thanas of the district two third of the recorded trees being found in the small thana of Harirumpur. Where 1.5 trees are found in every area. Jhitka in thana Harirumpur is the Centre of the date sugar (Gur) industry in the district 'Hazari Gur' being deservedly famous for its purely and flavors.” (তথ্যসূত্র : মানিকগঞ্জের লোক ঐতিহ্য- মো: মোশাররফ হোসেন)

মি. এসকোলির মন্তব্য থেকে ধারণা করা যায়, ঝিটকার খেজুরগাছ ও হাজারী গুড় আমাদের দেশের এক বিশাল কৃষিভিত্তিক লোকায়ত সম্পদ ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে এই গুড়ের সুনাম এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এখনো এই গুড়ের কদর দেশ-বিদেশে রয়েছে। তবে আগের সেই স্বাদ ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে কলের আবর্তে।

এই হাজারী গুড় নিয়ে রয়েছে নানা উপকথা। প্রায় দুই শ’ বছর আগে ঝিটকা অঞ্চলের হাজারী প্রামাণিক নামে একজন গাছি ছিলেন; যিনি খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি করতেন। হঠাৎ একদিন বিকেলে খেজুরগাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়ে গাছ থেকে নামামাত্রই একজন দরবেশ তার কাছে রস খেতে চান। তখন ওই গাছি দরবেশকে বলেছিলেন, সবে গাছে হাঁড়ি বসানো হয়েছে। এ অল্প সময়ে বড়জোর ১০-১৫ ফোঁটা রস হাঁড়িতে পড়েছে। তবুও দরবেশ তাকে গাছে উঠে হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ার আকুতি জানান। দরবেশের রস খাওয়ার ইচ্ছায় গাছি সত্যি সত্যিই খেজুরগাছে উঠে হতবাক হয়ে যান। গাছি দেখতে পান, সারা রাত ধরে রস পড়তে থাকলে যে পরিমাণ হওয়ার কথা ছিল মাত্র কয়েক মিনিটে পুরো হাঁড়ি রসে ভরে গেছে। গাছি হাঁড়িভরা রস নিয়ে নিচে নেমে দরবেশকে রস খাওয়ান এবং পা জড়িয়ে ধরেন। গাছিকে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে দরবেশ বললেন, ‘কাল থেকে তুই যে গুড় তৈরি করবি তা সবাই খাবে এবং তোর গুড়ের সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে। তোর সাত পুরুষ এ গুড়ের সুনাম ধরে রাখবে’ বলেই দরবেশ দ্রুত চলে যান। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওই দরবেশকে পাওয়া যায়নি। ওইদিন থেকেই হাজারী প্রামাণিকের নামে এ গুড়ের ‘হাজারী’ নামকরণ করা হয়।

ঝিটকার বিখ্যাত গুড় উৎপাদনকারী হাজারী পরিবারের সপ্তম পুরুষ মো: শামীম হাজারীর দাবি, আজ থেকে প্রায় তিন শ’ বছর আগে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার ঝিটকা গ্রামের ‘মহাম্মদ আলী’ নামে এক গুড়চাষি তার ফর্মুলার মাধ্যমে খেজুরের রস থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে ভিন্ন স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণের পাটালি গুড় উদ্ভাবন করেন। পরে তার নামানুসারে ওই পাটালি গুড় ‘হাজারী গুড়’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তিনি আরো বলেন, এই বিশেষ ধরনের গুড় আবিষ্কারের ফলে গুড়ের জন্য পরিবারের সুনাম মানিকগঞ্জ থেকে রাজদরবার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ‘হাজারী গুড়’ তৈরির অর্ডার বা ফরমায়েশ আসত ঝিটকার হাজারী বাড়িতে।

যেভাবে তৈরি হয় হাজারী গুড় : স্থানীয় গাছিরা দুপুরের পর থেকে খেজুরগাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়ে দেন। সারা রাত ওই হাঁড়িতে রস পড়ার পর ভোরে গাছ থেকে হাঁড়ি নামানো হয়। এরপর গাছি পরিবারের মহিলারা মাটির চুলায় ভোর থেকে রস জ্বাল দিয়ে ঘন করেন। রসের ঘনত্ব বেড়ে গেলে একটি মাটির হাঁড়িতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঘুঁটে ঘুঁটে তৈরি করা হয় সাদা রঙের হাজারী গুড়। বেশি শীত অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এ গুড় উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য সময়। আগের দিন বিকেলে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়। পরদিন ভোরে (সূর্য ওঠার আগে) গাছ থেকে রস নামিয়ে ছেঁকে ময়লা পরিষ্কার করে মাটির জালা অথবা টিনের তাফালে (পাত্র) বাইনে (চুলা) জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতে হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় খড়কুটো, নাড়া ও কাশবন। এ গুড় দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। তিন পুরুষ ধরে গুড় উৎপাদন করে আসা গাছি আজমত আলী হাজারী (৬৫) জানান, আগের দিন বিকেলে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়। পরদিন ভোরে (সূর্য ওঠার আগে) রস সংগ্রহ করে পরিষ্কার করে ছেঁকে মাটির তৈরি (জালা) পাত্রে চুলায় (বাইনে) জ্বালিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা হয় হাজারী গুড়। এই পদ্ধতি এখন আর হাজারী পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই গুড় দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। মিষ্টি ও টসটসে রস ছাড়া হাজারী গুড় হয় না। প্রতি কেজি গুড় ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় বলে তিনি জানান।

এই গুড়ের প্রসারতা বৃদ্ধির ফলে ঝিটকার কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে আসে পরিবর্তন। এটি তখন শিল্পে রূপ ধারণ করে। সেই আমলে গুড়ের বিশেষত্ব সুরক্ষার জন্য মহকুমার প্রশাসক অনুমোদিত গুড়ের গায়ে মার্কা বা সিল মারা হতো। উল্লেখ্য, হাজারী গুড় তৈরির ফর্মুলাটি কেবল হাজারী পরিবারই জানত। কিন্তু দুঃখজনক হলো, কালের আবর্তে এই গুড়ের স্বত্ব ও পেটেন্ট চুরি হয়ে যায়। অনেকেই আসল হাজারী পরিবারের সদস্য বলে দাবি করেন। এভাবে হাজারী গুড় ঐতিহ্য হারাতে বসে এবং বাজারে ভেজাল গুড়ের সমারোহ বাড়তে থাকে।

মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের গুড় ব্যবসায়ী মো: আবুল মিয়া বলেন, ‘এই গুড় উৎপাদন সম্পর্কে ভালো-মন্দ বলতে পারব না। তবে এখনো হাজারী গুড়ের প্রচুর চাহিদা আছে; আমরা দিতে পারি না। ক্রেতারা আসল-নকল চেনেন না। ব্যবসায়ীরা অনেকেই হাজারী সিল মেরে চলিয়ে দেন। ফলে আমাদের দুর্নাম হয়।
ঝিটকা বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো: হালিম মোল্লা জানান, শীত মওসুমে খেজুরগাছ এ অঞ্চলে একটি শিল্পে পরিণত হয়। বিশেষ করে হাজারী গুড়ের বদৌলতে এখানে অর্থনীতিতে চাঙা ভাব বিরাজ করে। রস থেকে গুড় উৎপাদন ও ভোক্তাদের হাতে পৌঁছে দিতে পেশাদার গাছি, কুমার, কামার, জ্বালানি ব্যবসায়ী, পরিবহনের শ্রমিক, ট্রাক মালিক-চালক, ভ্যানচালক, আড়তদারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সংযুক্ত রয়েছেন। পৌষের মাঝামাঝি থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই এই হাজারী গুড় দেশ-বিদেশে চলে যায়।

মানিকগঞ্জের জেলা ব্র্যান্ডিংয়ে হাজারী গুড় : ‘লোকসঙ্গীত ও হাজারী গুড় মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর’ এই স্লোগানকে মানিকগঞ্জের জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের স্বীকৃতি দিয়েছে জেলা প্রশাসন। হাজারী গুড়ের সুনাম পুনরুদ্ধারে খেজুরের বীজ বপন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিকসহ নানা প্রতিষ্ঠান। এরই ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মানিকগঞ্জে ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৭ দিনব্যাপী লোকসঙ্গীত ও হাজারী গুড়মেলা। সম্প্রতি হরিরামপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাশিদা আক্তারের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসক মো: নাজমুছ সাদাত সেলিম খেজুরের বীজ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি বলেন, এই জেলার যত ঐতিহ্য আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো হাজারী গুড়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.