মধুসূদন-এর প্রহসন সমাজ বাস্তবতা

ড. শাহনাজ পারভীন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাংলা প্রহসনের ইতিহাস এবং বাংলা নাটকের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলা সাহিত্যে প্রহসন ও নাটক একই নাট্যকারের হাতে রচিত হয়েছে এবং অনেক সময় তার বিষয়বস্তুও এক। কিন্তু কখনো তা নাটকের, কখনো তা প্রহসনের উপজীব্য হয়েছে। ফলে নাটক ও প্রহসনের ধারা একসাথে অগ্রসর হয়ে যে সমান্তরাল ধারা প্রকাশিত হয়েছে তাতে উভয়ের উচ্চতর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় না। কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রহসনের বৈশিষ্ট্য ও বিষয় এমনভাবে স্বতন্ত্র যে, তা তার আগে ও পরে রচিত সমগ্র প্রহসনের মধ্যে পৃথক স্বতন্ত্রের দাবিদার।

প্রহসন বলতে এমন এক নাট্যসৃষ্টি বোঝায়, যাতে পুরো নাটকটিতে হাস্যরসময় হালকা বুদ্বুদের জীবনঘনিষ্ঠ সংজ্ঞা রূপায়িত হয়। সামাজিক আচার-আচরণ বিশেষ করে কুসংস্কার, অনাচার, পাপাচার, ব্যঙ্গবিদ্রুপের মাধ্যমে নাট্যকার প্রহসনের পরিবেশ ও চরিত্র চিত্রণ করেন। প্রহসন নাট্যসাহিত্যের একটি উপধারা বা উপজাতি। কৌতুক-নাটক বা ব্যঙ্গ-নাটক হিসেবে তার যথার্থ পরিচয় রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রহসনে হাস্যরস সৃষ্টির মাধ্যমে দর্শককে আনন্দ দেয়ার উদ্দেশ্য বিদ্যমান থাকে। সমাজের দোষত্রুটি অবলম্বনে রচিত ব্যঙ্গবিদ্রূপ হালকা বা তীক্ষ্ণ যাই হোক না কেন, তাতে প্রকৃত গুরুগম্ভীর নাটক থেকে কিছুটা হালকা ও কৌতুকময় হয়ে ওঠে। তাই প্রহসনকে নাটক থেকে স্বতন্ত্র মনে করা যায়।
মাইকেল মধুসূদনই বাংলা সাহিত্যে প্রথম প্রহসন রচয়িতা নয়। তার রচিত একেই কি বলে সভ্যতা এবং বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁর আগেও বেশ কিছু সফল নাটক ও প্রহসন রচিত হয়েছে। ১৮৫২ সালে প্রকাশিত তারাচরণ শিকদারের ‘ভদ্রাজুন’ নাটকই বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌলিক নাটক হিসেবে পরিগণিত। তবে বাংলা প্রহসনের সফল আবির্ভাব আরো কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে।
‘অলীক কুনাট্য বঙ্গে মজে লোক রাঢ়ে, বঙ্গে
নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।
এই মনোভাব নিয়েই ১৮৫৯ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত আকস্মিকভাকে বাংলা নাটক ও প্রহসন রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ১৮৫৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম নাটক শর্মিষ্ঠা রচনা করেন। বেলগাছিয়া নাট্যশালায় শর্মিষ্ঠা অভিনয়ের মহড়ার সময় রাজা ঈশ^রচন্দ্র সিংহ মাইকেল মধুসূদন দত্তকে একটি প্রহসন লিখে দেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। প্রহসন রচনার পেছনে মূল কারণ ছিল গুরুগম্ভীর নাটকের সাথে হালকা রসবৈচিত্র্য সৃষ্টি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৫৯ সালের ৮ মের পরে প্রহসন লেখা আরম্ভ করেন এবং অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তা শেষ করেন। প্রথমে একেই কি বলে সভ্যতা এবং এটি শেষ করেই বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ রচনা করেন। প্রহসন দু’টি বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনয়ের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। ১৮৬০ সালের প্রথম দিকে পাইকপাড়া রাজাদের ব্যয়ে প্রহসন দু’টি প্রকাশিত হয়।
নাট্যকার হিসেবে মাইকেল মধুসূদনের পূর্বে রামনারায়ণের আবির্ভাব ঘটলেও প্রহসন রচনার ক্ষেত্রে রামনারায়ণ মাইকেলের কনিষ্ঠ। ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটকের পাঁচ বছর পরে মাইকেলের প্রহসন দু’টি রচিত হয়। অবশ্য কারো মতে, ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটকেও প্রহসনের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
শুধু কুলীনকুলসর্বস্বই নয়, আরো কারো কারো সাহিত্যসৃষ্টির মধ্যে প্রহসনের বৈশিষ্ট্য নিহিত থাকলেও মাইকেলের একেই কি বলে সভ্যতার মধ্যে সার্থক প্রহসনের পরিচয় ফুটে ওঠে। মাইকেলের একেই কি বলে সভ্যতা এবং বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ প্রহসন দু’টিতে তৎকালীন সমাজের বিপরীতমুখী দু’টি বৈশিষ্ট্যের যে সার্থক পরিচয় প্রকাশ পেয়েছিল, তা পরবর্তী পর্যায়ের বাংলা প্রহসনের ইতিহাসে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। প্রকৃতপক্ষে, পরবর্তী প্রহসনগুলো মাইকেলের প্রহসনের ছাঁচে ঢালাই করা। মাইকেলের প্রথম প্রহসনে নবলব্ধ ইংরেজি শিক্ষাভিমানী যুবকদের প্রকাশ্য উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচার এবং অন্যটিতে ধর্মকুঞ্চকাবৃত বৃদ্ধদের গোপন লাম্পট্য রূপায়িত হয়ে প্রহসনের যে বিষয়বস্তুর নির্দেশ করে, পরবর্তী প্রহসনগুলো এর তেমন বাইরে যেতে পারেনি।
একেই কি বলে সভ্যতা প্রহসনে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষিত যুবকদের মদপান, সভ্যতার নামে নানান অনাচার, বৈষ্ণবের ভণ্ডামি, পুলিশের দুর্নীতি, অন্তঃপুরের চিত্র, বাবুর্চি, বারবনিতা ইত্যাদি নানা ধরনের চরিত্র ও চিত্র অঙ্কন করেছেন। প্রহসনটির মধ্যে যে ঘটনা বা গল্প দেখানো হয়েছে তা একদিনের। প্রকৃতপক্ষে কয়েক ঘণ্টা সময়ের।
দুটি প্রহসনেই মাইকেল মধুসূদন যেন সমসাময়িক কালের অধিবাসী। একটিতে শহরের চিত্র, অন্যটিতে গ্রামসংশ্লিষ্ট পল্লী চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। একেই কি বলে সভ্যতা এ কোনো জোরালো গল্প নেই কিন্তু বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ এ একটি চমৎকার গল্প রয়েছে। দু’টি প্রহসনেই মধুসূদন সমান সাফল্য দেখিয়েছেন। দু’টি প্রহসনই উদ্দেশ্যমূলক কিন্তু তা নাটকীয় লাবণ্যকে খর্ব করেনি। তাঁর প্রহসন দু’টিতে সমাজের ঘুণে ধরা চিত্রের অপরূপ আখ্যান প্রকাশ পেয়েছে। দু’টি প্রহসনের পটভূমিকায় বিস্তর ফারাক রয়েছে কিন্তু উদ্দেশ্য এক। সামাজিক দুর্নীতি বা মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের বিলোপ সাধন। মধুসূদনের পক্ষে বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ প্রহসন রচনা করা তেমন কঠিন ছিল না, কিন্তু একেই কি বলে সভ্যতা রচনা করা তাঁর পক্ষে সত্যিকারার্থে কঠিন ছিল। তিনি নিজেই যে মদপানে অভ্যস্ত ছিলেন তাই নয়, মদে তাঁর আসক্তও ছিল ব্যাপক।
মাইকেল মধুসূদন তার প্রহসনে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, কিন্তু প্রতিকুল পরিবেশ তাকে ভিন্ন পথে পদচারণা করাতে বাধ্য করে। তিনি নাটকের মাধ্যমে জাতীয় চরিত্র গঠন করতে চেয়েছিলেন; হালকা হাসির বুদ্বুদ ধ্বনির মাধ্যমে তা অতটা সহজ নয় বলেই তিনি ধ্রুপদী আদর্শের নাটক রচনার ক্ষেত্রে মনোযোগী হন। তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং মেধা মৌলিক সমাজ চিন্তা অপেক্ষা পৌরাণিক রোমান্টিক নাটক রচনার অনুকূল ছিল। আমরা জানি, মধুসূদনের সাহিত্যে পুরাণই প্রাধান্য লাভ করেছে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ সত্যের একটা অংশমাত্র। তাই পরিপূর্ণ সত্যের সমসাময়িক সমাজ তার মধ্যে গভীর আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু প্রহসন দু’টি প্রকাশ পাবার পর বেলগাছিয়া নাট্যশালায় তা আর মঞ্চায়িত হয়নি। এমনকি বেলগাছিয়া নাট্যশালাও শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আহত হন। প্রহসন লেখা বন্ধ করেন এবং পুরাণকে কেন্দ্র করে সমাজের বাস্তবতার সাথে মিশিয়ে এক নবীনীকরণ করেন। যা আমরা তাঁর পরবর্তী রচনাসমূহে সমুজ্জ্বল দেখতে পাই।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.