ঢাকা, সোমবার,১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

আলোচনা

নদী বয়ে যায় কবিতায়

জাফরুল আহসান

২৫ জানুয়ারি ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৫:৫০


প্রিন্ট
নদী বয়ে যায় কবিতায়

নদী বয়ে যায় কবিতায়

[গত সংখ্যার পর]

যুগ যুগ ধরে নদীর এ পথ চলা। ভরা বর্ষায় সে ভয়াল আবার শীতে সে জীর্ণ-শীর্ণ। নদীর এ দৃশ্যপট কবি অবলোকন করে হন ধন্য। কবি উপভোগ করেন প্রাণ মন দিয়ে, আবার নদীর প্রতি অভিমানও কম নয়, অভিমানী স্বরে কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হতে শুনি ভালোবাসা নদী নয়।
কবি হাসান হাফিজের কবিতা-
১.
তুমি বহমান তুমি ছন্দশীলা তুমি অপরূপা
প্রকৃতির ডাগর স্নেহের পাত্রী
তোমার নৈকট্যে এসে
শান্ত ধীর সৌম্যশক্তি প্রাণভরে উপভোগ করি
ভুলে যাই জাগতিক দুঃখশোক বিষাদ হতাশা পাপ
আরো একা আরো ভঙ্গুর দীর্ণ হয়ে যাই এক লহমায়।
[কর্ণফুলী পাহাড় কন্যা/হাসান হাফিজ]
২.
ভালোবাসা যদি স্নিগ্ধ নদীরই উপমা তবে ধারাজলে তার করুণা সিঞ্চন হতো, পাপ তাপও স্খলনের বন্দোবস্ত হতো ভালোবাসা নদী নয়, ভুল করে নদী ভেবে আছড়ে পড়া পরাজয়
[ভালোবাসা নদী নয়/হাসান হাফিজ]
কবি সাহিত্যিকেরা বরাবরই নারীর সাথে নদীর কিংবা নদীর সাথে নারীর তলুনা করে আসছেন। নারীর যৌবনের সাথে ভরা বর্ষায় নদীর যৌবন খুঁজেছেন কেউ। যৌবনের কাম লালসায় নারী যেমন ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না নদীও তেমনি তার যৌবনতৃষ্ণা মিটাবার জন্য গর্জন করে, তীর ভাঙে, হয় বেপরোয়া। ভরা যৌবনবতী নারী বানডাকা নদীর মতোই কী?
আতাহার খানের কবিতায় নদী যেভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছেÑ
১.
মেয়েটির পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে নাকে এসে লাগে
তার ত্বক থেকে ঝরে পড়া ভরা নদীর বাতাস
নেশায় মাতাল হয়ে ওঠা কামুক পুরুষ সব
ঝাঁপ দিয়ে শরীর ভেজাতে চায় সেই নদীর পানিতে
ওড়নায় জড়িয়ে কি নিশ্চিন্তে এঁকে বেঁকে
ছুঁয়ে যায় গন্তব্যের দিকে
[অধরা/কবিতাসংগ্রহ/আতাহার খান]
২.
সবুজ তো ভীষণ সুন্দর, সেই
সবুজের কথা মনে হলে আমি জেগে উঠি
ব্যস্ত হই কখন কীভাবে যাব নদীর ওপারে।
[সবুজ আমাকে ডাকে/কবিতাসংগ্রহ/আতাহার খান]
৩.
দেখে দেখে ক্লান্তি ভর করে চোখে, সামান্য সঞ্চয়
সাথে নিয়ে আছি বাস, তবু কেন তুমি শব্দহীন?
এতটা নীরব ধ্যানলীন কেন তুমি। কথা বল
আনন্দ ব্যথায় প্রেমে মঞ্চিত রেখেছি শিশিরের
স্বচ্ছ বিন্দু জলকণা, জ্যোৎস্নায় জ্বলে সারাক্ষণ
এই জলকণা নাও, নদী তুমি বুকে তুলে নাও।
[এই জলকণা নাও নদী/কবিতাসংগ্রহ/আতাহার খান]
দেখা যাক কবি মুজিবুল হক কবীরের কবিতায় নদী কিভাবে ভাসিয়ে দিয়েছে তার কাব্যাঙ্গন।
১.
বসে পড়ি ওর পাশে, চুমু দিই গালে
প্রথম প্রণয় মেলে উষ্ণ রক্ত লালে,
ও বলে, এখানে নয়, চলো না নদীর পাড়ে,
যেখানে কাশফুল থেকে
চমৎকার জ্যোৎস্না খসে পড়ে হাওয়ার আঁচলে।
[জ্যোৎস্নাক্রান্ত ফুল/নির্বাচিত কবিতা/মুজিবুল হক কবীর]
২.
একটি নদী ভাঙতে ভাঙতে
প্রতিরোধের স্বপ্ন জাগায়
একটি নদী সোমত্ত এক নারীর রূপে
ভালোবাসার পানসি ভাসায়।
[একটি নদী/নির্বাচিত কবিতা/মুজিবুল হক কবীর]
৩.
একটি নদী পুঞ্জ আবেগ ধরে রাখে জলের লেখায় জলের ভাঁজে
হাওয়া পেলে জলারণ্যে ভাসতে থাকে ঘরগেরস্তি স্বপ্ন পুরাণ।
একটি নদী ভাঙতে ভাঙতে যায় বহুদূর
বুকের ভেতর প্রতিরোধের স্বপ্ন জাগায়;
একটি শিলা অজন্তা এক নারী যেন
জলদেবতার তুষ্টিতে সে নদীজলে পানসি ভাসায়।
[নদী পুরাণ/নির্বাচিত কবিতা/মুজিবুল হক কবীর]
নদী ও নারী একই সূত্রে গাঁথা। বিভিন্ন কবির কবিতার পাঠোদ্ধার শেষে এমনটিই মনে হয়েছে। প্রেয়সীর প্রতি অভিমান না বলা কথার পাহাড়সম ব্যথা নদীর স্তব্ধতার সাথে তুলনা করা হয়েছে। নদীকে নিয়ে অনেক গল্পের অবতারণা আছে। আছে নদীর পেছনে দেব-দেবীর লোমহর্ষক কল্পকথা। নদীর মতো অনন্ত যৌবনা নারী প্রসঙ্গে তর্কে জড়িয়ে লাভ নেই। যৌবন তো চিরস্থায়ী নয়। নদী নিয়ে এমনি আরো কিছু কবিতার উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে।
১.
জল থই থই নদী বয়ে যায় আপন কুলায়
জলরাশি তার দু’কূল ব্যাপিয়া নিজেরে লুটায়;
পাহাড়ি ঝর্ণা এঁকে বেঁকে সেও নদীতে মিলায়
সাগরের জল বুক ভরে ডাকে আয় কাছে আয়।
নদীও নারীর মতোই মিলন শয্যা সাজায়
জাগে সভ্যতাÑ বন্ধনহীন অববাহিকায়।
[নদী/কবিতাসংগ্রহ/জাফরুল আহসান]
২.
ভালোবাসা সেকি বিরহ বদন! রাধিকার মান ভঞ্জন,
নাকি সে কৃষ্ণ কালার গেরুয়া বসনে বৃন্দাবন!
ভালোবাসা বুঝি নগ্ন সময়ের অভিমান গলা নদী
নাকি সে কেবলি ভয়, দুকূল ভেঙ্গে গ্রাস করে যদি।
[অভিমান গলা নদী/কবিতা সমগ্র/জাফরুল আহসান/পৃষ্ঠ ৬০]
৩.
শালবন কিংবা নদী
আজও বলে দিতে পারে
নদী জলে হেঁটে নাক ডুবিয়ে গ্রেনেড ছুড়েছিল
একদল তরুণ; যুদ্ধ জয়ের জন্য।
যুদ্ধ জয়ের জন্য যুদ্ধ করেছিল তাঁরা
যদিও নদীটি এখন মৃতপ্রায়।
[নদীটি এখন মৃতপ্রায়/কবিতা সমগ্র/জাফরুল আহসান/পৃষ্ঠা-৯১
যত দিন সভ্যতা থাকবে তত দিন নদী থাকবে। নদী আঁকড়ে বেড়ে ওঠা জনপদে প্রাণের সঞ্চার করবে নদী। কিন্তু প্রকৃত অর্থে নদী কি নদী আছে? নদী কি ধরে রাখতে পেরেছে তার স্বচ্ছ জলপ্রবাহ! আজকের নদী যে অবস্থায় আছে, তার যে দৈন্য-দশা অতীতে কেউ কি আঁচ করেছিল? উজানে বয়ে আসা পলি কমিয়ে দিচ্ছে নদীর নাব্যতা। ফলে যত্রতত্র জেগে উঠছে চর, কমে যাচ্ছে জলপথ একশ্রেণীর ভূমিদস্যুরা নদীর তীর ঘেঁষে অপরিকল্পিতভাবে কলকারখানা তৈরি করে যেমন নদীর জায়গা আত্মসাৎ করছেন, পাশাপাশি শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক বর্জ্য ফেলছেন দূষিত হচ্ছে জলরাশি এবং পরিবেশ। তীব্র সঙ্কট দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির। নদীর এ দৈন্যদশায় কবি কি কখনো নিরব থাকতে পারে? কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজের কবিতার উদ্ধৃতাংশÑ
১.
যাকে আমি দেখেছিলাম
কেউ পারে না তাকে
ধলেশ্বরীর বাঁকে।
ধলেশ্বরী হাঁরিয়ে গেছে
ধলেশ্বরী নাই
কোথায় তারে পাই?
[ধলেশ্বরীর বাঁকে/কবিতা সমগ্র/জাহাঙ্গীর ফিরোজ/পৃষ্ঠা-৩৮৫]
২.
এদিকে সকল নদী গভীর অসুখে মুমূর্ষু
শুশ্রƒষার কেউ নেই
শিয়রের পাশে বসে গুটিকয় বিষণœ স্বজন
কোরআন পড়ছে।
হে নদী-নদগণ জেগে ওঠো ঐশ্বরিক ক্রোধে
বাঁধভেঙ্গে নেমে আসো সমুদ্র ডেকেছে তোমাকে।
[কুয়াশায় ডুবে আছে নদীগণ/কবিতাসমগ্র/জাহাঙ্গীর ফিরোজ/পৃষ্ঠা ৪৩৫]
৩.
ছিল দুরন্ত ঘোলাজল ছিল
পাড় ভাঙ্গা ঝোপঝাপ পাঙ্গাশ ইলিশের নদী ছিল
বাঁওহীন, মাছেদের দীর্ঘ ডুবতল
এখন পাদুকা তলে ঝিকিমিকি খই ভাজা বালু।
ভালো নেই
হু হু কৃষকের বুক ভেদ করে
বালু উড়ে
দিগন্তে মরীচিকা ডাকে আয় আয়।
[পাখি উড়ে যায়/কবিতাসমগ্র/জাহাঙ্গীর ফিরোজ/পৃষ্ঠা-৬৪]
[এরপর আগামি সংখ্যায়]

 

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫