ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

মতামত

বিতর্কে ট্রাম্পের প্রথম বছর

আলমগীর কবির

২৪ জানুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ১৭:১০


প্রিন্ট
বিতর্কে ট্রাম্পের প্রথম বছর

বিতর্কে ট্রাম্পের প্রথম বছর

এমন বর্ষপূর্তির অভিজ্ঞতা আগের কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের নেই। ক্ষমতা গ্রহণের দিনটিকে বড়সড় আয়োজনে উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়েও সব কিছু বাতিল করতে হয়েছিল দেশটির ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। কারণ বর্ষপূর্তির দিনেই মার্কিন মুলুকে নেমে এসেছিল অন্ধকার। রাজকোষে পড়েছিল তালা। আর্থিক সঙ্কটে থমকে গিয়েছিল সরকারি দফতরগুলোর কাজ। 

এ আশঙ্কা অবশ্য আগে থেকেই ছিল। ‘স্টপগ্যাপ ফান্ড’ বা স্বল্পকালীন বাজেটের প্রস্তাব ‘হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ’ বা মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে ২৩০-১৯৭ ভোটে আগেই পাস হয়েছিল। কিন্তু উচ্চকক্ষ অর্থাৎ সিনেটে কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিলই। সরকারি খরচ চালানো নিয়ে সিনেটে ‘টেম্পরারি স্পেন্ডিং’ পেশ করে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। কিন্তু শেষ মূহূর্তের বোঝাপড়াতেও কোনো লাভ হয়নি। রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৫১-৪৯-এ। বিল পাস করাতে হলে প্রয়োজন ছিল ৬০টি ভোট। ফলে জিততে হলে কিছু ডেমোক্র্যাটকে দলে টানতেই হতো ট্রাম্পকে। টোপও ফেলেছিলেন তাই। শিশুদের স্বাস্থ্যবিমা খাতে অনুদানের সময়সীমা ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি। ফলও পান। বেশ কিছু ডেমোক্র্যাটের ভোটও পান। কিন্তু কিছু রিপাবলিকান বেঁকে বসে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন জানান। ফলে শেষমেশ স্বল্পকালীন বাজেটের সমর্থনে প্রয়োজনীয় ৬০টি ভোট আর তুলতে পারেনি রিপাবলিকানরা। আর তাতেই এক রাতে আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়েছে মার্কিন সরকার। মুখ পুড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের। চাপে রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট দু’পক্ষই।

জাতীয় সুরক্ষা ও মানুষের নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিষেবা বাদ দিয়ে বাকি সব সরকারি দফতরের কাজই স্তব্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বিনা বেতনে কাজ করছেন স্বাস্থ্য ও আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মীরা। তবে তিনদিন পরই সমস্যার সমাধান হয়েছে। এ ঘটনার জন্য ডেমোক্র্যাটদের নিন্দা করে ট্রাম্প বলেছিলেন, সরকারের সাফল্য সহ্য করতে না পেরেই এই কাজ করছে ওরা। ডেমোক্র্যাটদের দাবি ছিল, আট লাখ অস্থায়ী কর্মীকে স্থায়ী করতে হবে। ‘ড্রিমার’দের হয়েও দাবি জানিয়েছে তারা। শিশু অবস্থায় মার্কিন মুলুকে এসেছিল তারা। কিন্তু এখনো বেআইনি অভিবাসী হয়েই রয়ে গেছে আমেরিকায়। আগামী মার্চে শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের আইনি নিরাপত্তার সময়সীমা। সে ক্ষেত্রে অন্তত সাত লাখ তরুণ অভিবাসীকে হয়তো আমেরিকা ছাড়তে হবে। রিপাবলিকানদের অভিযোগ, আমেরিকান স্বার্থে আঘাত করে অভিবাসীদের জন্য গলা ফাটাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরা। কোনো শর্তই মানতে রাজি হননি রিপাবলিকানরা। দু’পক্ষই টানা একে অপরকে বিঁধে গিয়েছে।

গত শুক্রবার গভীর রাতে বিতর্ক চলছিল সিনেটে। সমাধানে পৌঁছতে বাড়তি ৯০ মিনিট সময় দেন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা মিচ ম্যাককনেল। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত ছুঁতেই, ক্যালেন্ডারে দিন বদলে যেতেই, ‘শাট ডাউন’ হয়ে যায়। এর আগে ২০১৩ সালে বারাক ওবামার আমলে এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা। মার্কিন ‘অ্যান্টি-ডেফিসিয়েন্সি অ্যাক্ট’ অনুযায়ী এ ধরনের ফান্ডিং বিল পাস না হলে রাজকোষ ফাঁকা হয়ে যায়। সরকারি দফতরে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
সার্বিক দিক বিবেচনায় ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরে পূর্ণতার চেয়ে অপূর্ণতার পাল্লা ভারী, তথাপি যাদের জন্য ট্রাম্পের এই বিজয়; তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি তিনি রক্ষা করেছেন।
নির্বাচনী প্রাচরণায় তিনি যে সব প্রতিশ্রুতির ওয়াদা করেছেন, তা অনেকটা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় তার উচ্চাভিলাষী চাওয়া পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতিও পূর্ণ করেন। যেমন নতুন সুপ্রিম কোর্ট ন্যায়পাল নিয়োগ এবং নতুন নিয়োগ পদ সৃষ্টি করেন। যদিও এই নিয়োগে অনেক আপত্তি রয়েছে। ডিসেম্বরে ১.৫ ট্রিলিয়ন টেক্স বিল সাইন করেন যা তার উচ্চাকাক্সক্ষী স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রধম ধাপ। তার স্বাক্ষর করা এই বিলের ফলে জনগণের জীবনযাত্রার উপর প্রভাব ফেলবে, যদিও ট্রাম্প বলেন, ‘মেহনতি আমেরিকান পরিবারগুলো অনেক কর ছাড় পাবে।’ এই বিলে শিশু এবং বৃদ্ধ নিবাসদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে।
বর্ষপূর্তিতে ট্রাম্প পূর্বসূরি বারাক ওবামার নানা বিল রদ করে দিয়েছেন এবং কিছু বিলে পরিবর্তন করেছেন। যেমন- ওবামা কেয়ার বাতিল তরা মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
মেক্সিকোর সাথে সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ, যাতে অবৈধভাবে মানুষ সীমান্ত পাড়ি না দিতে পারে। ছয়টি দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় যাতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। পরিবেশ সংক্রান্ত চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লার উপর হতে নির্ভরশীলতা কমানো এবং শেল গ্যাস এবং শেল তেলের ধারণার প্রবর্তন করা।

১২তম জাতীয় বাণিজ্য চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া তার প্রথম কাজ ছিল প্রেসিডেন্ট রূপে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার পর। মিলিটারিদের বাইরে ফেডারেলে লোকবল নিয়োগ রদ করার হয়েছে তার শাসনামলে। এ ছাড়া প্রবাসী আইন সংস্কার এবং অবৈধ অধিবাসী ফেরতে তার দৃঢ় ভূমিকা দেখা যায়। ন্যাটোর সাথে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দরকষাকষিতে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলেও এই এক বছর ছিল ট্রাম্প সরকারের কঠিন বছর। সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রে ট্রাম্পের উগ্র আচরণ, কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড সবার আলোচনা-সমালোচনায় ছিল। সরকারপ্রধান রূপে সব দেশের সাথে সহনশীল ভূমিকা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করাই একজন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রত্যাশা। কিন্তু তার উগ্র মন্তব্য এবং অনিয়ন্ত্রিত শব্দচয়ন সবাইকে আঘাত করেছে। নিয়মিত সব বিষয়ে টুইট করতে তিনি পছন্দ করেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে এক বছরে মোট দুই হাজার ৫০৮টি টুইট করেছেন। গড়ে দিন দিন তার টুইট সংখ্যা দাঁড়ায় সাতটি। সম্প্রতি করা তার এক টুইট বর্ণবাদকে প্রশ্রয় দেয়। তাই আফ্রিকা মহাদেশসহ প্রায় সব দেশ এই টুইটের নিন্দা করে এবং তাকে ক্ষমা চাইতে বলে। এ ছাড়া মুসলিমদের নিয়ে তার মনোভাব এবং বক্তব্য আমেরিকাতে উগ্রবাদীদের উসকে দিচ্ছে নানা ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম ও হত্যাকাণ্ডের দিকে। সুদান, হাইতি, সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিনিসহ বিভিন্ন দেশের প্রতি তার কঠোর মনোভাব পুরো বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।

বিশ্ববাজারে আমেরিকাকে দৃঢ় অবস্থানে নিতে চীন, রশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সাথে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের পিছু হটানোর তার উদ্দেশ্য সবার চোখে পড়েছে। এ উদ্দেশ্যেই তিনি ‘আমেরিকা ফাস্ট’ শুল্ক আরোপ করেছে। এর ফলে বিশ্ব একটি অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। প্রত্যেক সরকারের নানা রকম আলোচনা-সমালোচনা থাকে। তবে ট্রাম্প সরকারের সমালোচনা সব শুভ আলোচনাকে ছাড়িয়ে গেছে। তাই সাফল্যের মাত্রা নির্ধারণে ট্রাম্প সরকার অসফল বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।

তার ক্ষমতা গ্রহণের বর্ষপূর্তির দিনে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক নেতা ন্যান্সি পেলোসি ট্রাম্পের এক বছরের অর্জন নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেতৃত্বে ব্যর্থতার জন্য ‘এফ’ পেয়েছেন।’ 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫