এরদোগানের চ্যালেঞ্জ
এরদোগানের চ্যালেঞ্জ
কুর্দিবিরোধী অভিযান

এরদোগানের চ্যালেঞ্জ

আনিসুর রহমান এরশাদ

সিরিয়ার সীমান্ত লাগোয়া দু’টি শহর আফরিন ও মানবিজ থেকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ‘কুর্দি পিপলস প্রোটেকশন ইউনিট-ওয়াইপিজির গেরিলাদের নির্মূলে বিমান ও স্থল হামলা শুরু করেছে সামরিক সক্ষমতায় অন্যতম শক্তিধর তুরস্ক। ইসলামিক স্টেট আইএসের বিরুদ্ধেও অভিযান চলবে বলে জানিয়েছে তুর্কি সামরিক বাহিনী। এই অভিযান সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য হিসেবে সামরিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তুরস্কের সীমান্তবর্তী সিরিয়ার আফরিন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ যাতে ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন পার্টি (পিওয়াইডি) ও তুর্কি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) হাতে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করতেই যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও ‘অপারেশন অলিভ ব্রাঞ্চ’ নামে এই অভিযান।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন- রাশিয়া, আমেরিকা এবং সিরিয়াসহ সব পক্ষকে জানিয়েই সিরিয়ার উত্তর পূর্বাঞ্চলে কুর্দি-অধ্যুষিত আফরিন অঞ্চলে সিরিয়ান কুর্দি মিলিশিয়াগোষ্ঠী নির্মূলে বিমান ও স্থল হামলা শুরু করেছে তুর্কি সেনাবাহিনী। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস জানিয়েছেন, ‘সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আফরিন প্রদেশে সামরিক অভিযান শুরুর আগে তুরস্ক খোলামনে আমেরিকাকে হামলার কথা জানিয়েছে। এ দিকে আফরিনে হামলা শুরু হওয়ার পর সেখান থেকে রাশিয়া তাদের সৈন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া ও সামরিক সরঞ্জাম প্রত্যাহারের মাধ্যমে তুরস্কের হামলাকে সমর্থন দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তুরস্ককে এই অভিযান চালানোর সবুজ সঙ্কেত দেয়ায় মস্কো-আঙ্কারার সম্পর্ক যে নতুন মাত্রা পেয়েছে তার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তুর্কি সেনাপ্রধান জেনারেল হুলুসি আকর বলেছেন, ‘বৈধ প্রতিরক্ষা অধিকারের ভিত্তিতে তুরস্ক এ অভিযান চালাচ্ছে। সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি ইরান-রাশিয়ার সাথে যেসব চুক্তি-সমঝোতা রয়েছে তার প্রতিও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে আঙ্কারা।’

তুরস্ক-সীমান্ত বরাবর তুরস্কে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী পিকেকের নেতৃত্বে কুর্দি বিদ্রোহীদের নিয়ে ৩০ হাজার সদস্যের একটি কুর্দি মিলিশিয়া-প্রধান সীমান্ত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর পরই তুরস্ক ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে এবং এই বাহিনীকে ‘আঁতুড়ঘরেই নির্মূল করার’ ঘোষণা দেয়। উল্লেখ্য, তুরস্কের সীমান্তে একটি কুর্দি রাষ্ট্র গড়ে তোলার ব্যাপারে ইসরাইলের জোরালো সমর্থন আছে। কুর্দি বাহিনীর প্রায় অর্ধেককেই নিয়োগ দেয়া হতো সিরিয়ায় তৎপর গেরিলাগোষ্ঠী এসডিএফের সদস্যদের মধ্য থেকে। কুর্দি মিলিশিয়া-প্রধান এসডিএফ হচ্ছে মার্কিনপন্থী বিদ্রোহীদের জোট, যা কুর্দি সংগঠন ওয়াইপিজির সমর্থনপুষ্ট একটি গোষ্ঠী। ১৯৮৪ সাল থেকে তারা তুরস্কের কুর্দি অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসনের দাবি করে আসছে।

তুরস্ক মনে করে- সন্ত্রাসী সংগঠন ওয়াইপিজির সাথে পিকেকে গেরিলাদের সম্পর্ক রয়েছে। নতুন বাহিনী গড়ার ঘোষণার মাধ্যমে মার্কিন সরকার রাশিয়াকে এ কথা বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, সিরিয়াকে মস্কোর হাতে ছেড়ে দেবে না ওয়াশিংটন। ইরান-তুরস্ক-রাশিয়ার মধ্যে সিরিয়া ইস্যুতে এখন সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অপর দিকে সিরিয়ার উত্তর দিকে একটি স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিপ্রধান এলাকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মার্কিন সহায়তা নিয়েই। কুর্দি গেরিলাদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

সিরিয়ায় এ মুহূর্তে প্রায় দুই হাজার মার্কিন সেনা আছে। সিরিয়ার কুর্দি মিলিশিয়া গোষ্ঠীর কাছে ওয়াশিংটন এ পর্যন্ত চার হাজার ৫০০ ট্রাক অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক যান পাঠিয়েছে। মূলত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার লক্ষ্য নিয়ে কুর্দিদের সমর্থন দিচ্ছে।
এর বিপরীতে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানো ও দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার নীতি মেনেই চলমান সঙ্কট সমাধানের নীতিতে অটল রয়েছে রাশিয়া। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ‘উত্তর সিরিয়ায় মার্কিন সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র চলে যাওয়ায় ওই অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সিরিয়ায় সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী এবং মার্কিনপন্থী গেরিলাদের কাছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পেন্টাগন অস্ত্র সরবরাহ করায় হামলা চালাতে উৎসাহিত হয়েছে তুরস্ক। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন দিয়ে আসছে রাশিয়া। বিপরীতে আসাদবিরোধী ভিন্ন দু’টি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক। কিন্তু কুর্দি ইস্যুতে তারা এক অবস্থানে চলে এসেছে। মতভেদ থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের দুই আঞ্চলিক শক্তি তুরস্ক-ইরানকে সাথে নিয়ে সঙ্কট উত্তরণে কাজ করছে রাশিয়া।

তুরস্ক সমর্থিত ফ্রি সিরিয়ান আর্মির যোদ্ধারাও আফরিন এলাকায় ঢুকছে। তুরস্কের এই ব্যাপক সামরিক অভিযানে সিরিয়ার সাত বছরের গৃহযুদ্ধ আবারো একটি নতুন মোড় নিচ্ছে। ওয়াইপিজির গেরিলাদের তুরস্ক সন্ত্রাসী মনে করে। ওয়াইপিজি কার্যত তুরস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দি গেরিলা সংগঠন নিষিদ্ধ পিকেকের সিরিয়া শাখা। পিকেকে সন্ত্রাসীরা ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে বলে দাবি করেছে তুরস্ক। আফরিন এলাকায় বর্তমানে পিকেকর ৮-১০ হাজার যোদ্ধা অবস্থান করছে। তবে কুর্দি মিলিশিয়া গোষ্ঠী ওয়াইপিজি বলছে, তাদের সাথে তুরস্কের কুর্দি গোষ্ঠী পিকেকের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কুর্দি মিলিশিয়া নেতারা যেকোনো মূল্যে তুরস্কের আক্রমণ প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে।
তুরস্কের সেনাবাহিনী আফরিন এলাকা থেকে কুর্দিযোদ্ধাদের তাড়িয়ে দিয়ে ৩০ কিলোমিটারব্যাপী ‘নিরাপদ এলাকা’ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে। তুর্কি সেনাবাহিনীর সাথে যোগ দিচ্ছে ফ্রি সিরিয়ান আর্মির প্রায় ২৫ হাজার সদস্য। প্রায় দুই বছর আগে ওয়াইপিজি কুর্দিদের দখলে যাওয়া আরব শহর ও গ্রামগুলোর পুনর্নিয়ন্ত্রণ নেয়ার লক্ষ্য নিয়ে এ অভিযানে যোগদানের কথা জানিয়েছে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। ফ্রি সিরিয়ান আর্মির কমান্ডার মেজর ইয়াসের আব্দুল রহিম বলেছেন, বিদ্রোহীরা আফরিনে কুর্দিদের মূল বসতি এলাকায় প্রবেশ করতে চায় না, তারা কেবল এটি পরিবেষ্টিত করে রাখবে এবং সেখান থেকে ওয়াইপিজি কুর্দিদের বহিষ্কার করবে। এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো- আফরিনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তেল রিফাত ও আরব গ্রামগুলোর পুনর্দখল নেয়া।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাজার হাজার বাসিন্দাকে তাড়িয়ে এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল ওয়াইপিজি কুর্দিরা। তুরস্ক এত দিনের সংঘাতে ৩০ লাখের বেশি গৃহহারা সিরীয়কে আশ্রয় দিয়েছে। পরিস্থিতি যাই হোক, সিরিয়া তার ভূখণ্ডে ছোটখাটো কুর্দি রাষ্ট্র সহ্য করবে না তেমনি তুরস্ক দক্ষিণ সীমান্তে আরেকটি রাষ্ট্র হতে দেবে না। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.