মোতালেব ও নাসির
মোতালেব ও নাসির

শত কোটি টাকার মালিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী মোতালেব ও নাসির

আবু সালেহ আকন

এ যেন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এলো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী মোতালেব ও নাসিরকে গ্রেফতার করেছিলেন সন্দেহজনক হিসেবে। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে তাদের মহা দুর্নীতির ফিরিস্তি, যা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি বাণিজ্য, ভুয়া সার্টিফিকেট সত্যায়িত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিকরণ, শিক্ষকদের অবসরভাতা পাইয়ে দেয়ার নামে অর্থ হাতিয়ে নেয়াসহ অনেক দুর্নীতির সাথে জড়িত এই মোতালেব-নাসির গং, যার মাধ্যমে তারা এখন শত কোটি টাকার মালিক। আজ তাদের বিরুদ্ধে বনানী থানায় ঘুষ নেয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পরিবারের অভিযোগ, গত শনিবার বিকেলে শিক্ষামন্ত্রীর পিও মো: মোতালেব হোসেনকে রাজধানীর বসিলা এলাকা থেকে ডিবি পরিচয়ে কয়েক ব্যক্তি মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায়। মোতালেব সেখানে তার নির্মাণাধীন বহুতল বাড়ির কাজ তদারক করতে গিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে ওই দিন হাজারীবাগ থানায় পরিবারের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে কর্মরত উচ্চমান সহকারী নাসির উদ্দিন নিখোঁজ হন। পরিবার এই ঘটনায়ও থানায় সাধারণ ডায়েরি দায়ের করে। তিনি খিলক্ষেত এলাকার লেকসিটি কনকর্ডে থাকতেন। এ দিকে পুলিশ বলেছে, মোতালেব ও নাসিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে নাসির উদ্দিনকে গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকা পাওয়া যায়। জানা গেছে, তারা দু’জন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ৬ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। তবে তাদেরকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক তথ্য। প্রাথমিকভাবে তারা ওই সব বিষয়ে পুলিশকে জানিয়েছেন।

জানা গেছে, এ দুই কর্মচারী কোটি কোটি টাকার মালিক, যা শত কোটিও ছাড়িয়ে যেতে পারে। মোতালেব ১৮ বছর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্টেনো টাইপিস্ট হিসেবে যোগ দেয়। তখন থেকে সে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীতে পদোন্নতি পায়। এখন সে শিক্ষামন্ত্রীর পার্সোনাল অফিসার (পিও) হিসেবে কর্মরত। এই পোস্টে থেকেই সে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছে। নিজেকে শিক্ষামন্ত্রীর পিএস, আবার কখনো কখনো এপিএস হিসেবে পরিচয় দিত সে। তার বাড়ি ঝালকাঠির নলসিটি উপজেলার আমতলি ইউনিয়নে। তার বাবার নাম দিনছের আলী।

নলসিটির মোল্লার হাট এলাকায় মোতালেব দু’টি আলিশান ভবন নির্মাণ করেছে। ওইখানে মাঝে মধ্যে গিয়ে থাকে। এ দিকে, ঢাকার হাজারীবাগের বসিলা এলাকায় ১০ তলা একটি ভবন নির্মাণকাজ চলছে তার। যার ৬ তলা ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই ভবন নির্মাণে বেশির ভাগ বিদেশী সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ভবনটি নির্মাণের সাথে সম্পৃক্ত এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ভবনটি নির্মাণে তার ১৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রকৌশলী এই ভবনটির ঠিকাদারি নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া নামে-বেনামে তার বিশাল সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। তার এলাকার মানুষ তাকে বড় কর্মকর্তা হিসেবেই চেনে।

অপর দিকে, নাসির ৯৭-৯৮ সালে অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে যোগদান করে। সেখান থেকে ২০১৩ সালে তাকে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে স্থায়ীকরণ করা হয়। তাকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে চাকরিতে স্থায়ী করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালের দিকে দুর্নীতির কারণে তাকে শিক্ষা ভবনের আঞ্চলিক অফিসে এবং সেখানেও দুর্নীতির কারণে তাকে উল্লাপাড়ায় বদলি করা হয়। সেখান থেকে সে আবারো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তি নিয়ে চলে আসে। পুরান ঢাকায় এক ধনাঢ্য পরিবারের মেয়েকে সে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বড় কর্মকর্তা পরিচয়ে বিয়ে করে। ঢাকায় বিএমএ ভবনের পেছনে একটি ভবনে তার নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে। তার চারটি গাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া কালিয়াকৈরে তার বিশাল সম্পত্তি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নাসির কম হলেও শত কোটি টাকার মালিক। মোতালেবের চেয়েও সে ভয়ানক দুর্নীতিবাজ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, মোতালেব ও নাসিরকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে আরো অনেকের নাম উঠে এসেছে। তাদের ব্যাপারেও খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রালয়ের একটি সূত্র বলেছে, তাদের এই দুর্নীতির পেছনে অনেক রাঘববোয়াল জড়িত। সম্প্রতি নাসির ঢাকায় একটি অনুষ্ঠান করে। সেখানে সরকারের প্রভাবশালী দুই ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোতালেব ও নাসিরসহ ওই দুর্নীতিবাজ গ্রুপ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিকরণ, শিক্ষকদের বদলি, শিক্ষার্থীদের রেজল্টশিটে কারচুপি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথেও এরা জড়িত বলে অভিযোগ আছে। শিক্ষকদের অবসর শিক্ষাভাতা উত্তোলনেও তারা দুর্নীতি করে আসছিল। জানা গেছে, অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আছেন যাদেরকে অবসরভাতা ও কল্যাণভাতার টাকার জন্য বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। তাদের ফাইল নড়ে না। আর এই চক্রকে একটি পার্সেন্টেজ দিলে অল্প দিনের মধ্যেই টাকা পাওয়া যায়।

এ দিকে মোতালেব ও নাসিরের গ্রেফতারের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেলের ডিসি মাসুদুর রহমান বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে আজ মামলা দায়ের হবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.