ঐতিহ্যের ঘুড়ি উৎসব

শওকত আলী রতন

পৌষ মাসের শেষ দিন। পুরান ঢাকার আকাশে দেখা যায় নানা রঙের ঘুড়ি। দিনটিকে বলা হয় সাকরাইন। সাকরাইন হলো ঘুড়ি উৎসবের দিন। ঘুড়ি উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। এ নিয়ে লিখেছেন
শওকত আলী রতন
পৌষসংক্রান্তি বা সাকরাইন উপলক্ষে আমাদের দেশে অঞ্চলভেদে বাংলা সংস্কৃতিকে পালন করে নানা ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকলেও এদিন পুরান ঢাকাবাসীর কাছে কেবল ঘুড়ি উৎসব। বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে লালন করে চিরাচরিত নিয়মে পালন হওয়া উৎসবটি ছোট-বড় সবার কাছে অতি প্রিয়। ঘুড়ি উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকা এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। বছরের অন্য দিনগুলোতে ঢাকার আকাশে কম-বেশি ঘুড়ি উড়তে দেখা গেলেও ওই দিন আকাশে দেখা মেলে নানা রঙের শত শত ঘুড়ি। নীল আকাশে নানা রঙের ঘুড়ির ওড়ার দৃশ্য সবার নজর কেড়ে নেয়। ওই দিন নবরূপে সাজে ঢাকার আকাশ। পথচারীরা পথ চলতে কিংবা যানবাহনে বসে এ উৎসব উপভোগ করে থাকেন।
ঘুড়ি উৎসবে নেই কোনো আয়োজক, তবু উৎসবের কোনো ঘাটতি থাকে না। ব্যক্তিপর্যায়ের আয়োজন রূপ নেয় সম্মিলিত আয়োজনে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও ঘুড়ি উৎসবের আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না। সকাল থেকেই পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া, মুরগিটোলা, ধুপখোলা, দয়াগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, কাগজিটোলা, বাংলাবাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, কলতাবাজার, ধোলাই খাল, নারিন্দা, শাঁখারীবাজার, রায়সাহেব বাজার, তাঁতিবাজার, সদরঘাট ও লালবাগ এলাকার বাসিন্দারা দিনব্যাপী ঘুড়ি উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। পুরান ঢাকায় কবে, কখন ও কোথায় প্রথম ঘুড়ি উৎসব শুরু হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭৪০ সালের দিকে নবাব নাজিম নওয়াজেস মোহাম্মদ খাঁনের সময় থেকে ঢাকায় ‘ঘুড়ি উড়ানো’ উৎসব হিসেবে প্রচলিত হয় এবং নবাব পরিবারেরা এ উৎসবের উৎসাহদাতা ছিলেন। সেই সময় থেকে পুরান ঢাকাবাসী এ উৎসবটি নিজেদের উৎসব মনে করে পালন করে আসছেন।
ঢাকায় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ভবনের ছাদ থেকেই ঘুড়ি উড়ানো উপযুক্ত স্থান মনে করা হয়। ঘুড়ি উড়ানোর সময় বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
ঘুড়িতে দেখা গেছে নানা রঙ ও বৈচিত্র্য। পাখি ও প্রজাপতির আকৃতি দিয়ে তৈরি করা হয় এসব ঘুড়ি। আবার কাগজে মধ্যে নানা ধরনের চিত্রাঙ্কন করে ঘুড়ি বানানো হয়। ঘুড়ির কাটাকাটি নিয়ে চলে প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা। দুরন্তপনায় মেতে উঠে প্রতিযোগীরা। পুরান ঢাকার ঘুড়ি উৎসবে পরিবারের সব সদস্যের থাকে পূর্ণ সহযোগিতা। সাকরাইন উপলক্ষে এ দিন সবচেয়ে বেশি ঘুড়ি বিক্রি হয়ে থাকে পুরান ঢাকার বিভিন্ন দোকানগুলোতে। ঘুড়ির দোকানগুলোতে থাকে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। শাঁখারীবাজার এলাকায় ঘুড়ির দোকানগুলোতে সারা বছরই ঘুড়ি বেচাকেনা হয়ে থাকে। তাই ঘুড়ি ও অন্য উপকরণের সন্ধানে এখানে আসেন সবাই।
শাঁখারীবাজারে ঘুড়ির দোকানগুলোতে চোখে পড়েÑ নারী-পুরুষেরা ঘুড়ি কিনে বাসায় ফিরছেন। শাঁখারীবাজারের ঘুড়ির দোকানগুলোতে আট টাকা থেকে শুরু করে ৪০০ টাকার মধ্যে ঘুড়ি পাওয়া যায়। ঘুড়ি উড়ানোর জন্য সব উপকরণই পাওয়া যায় এখানে।
ঘুড়ি উৎসব নিয়ে কথা হয় নারিন্দা এলাকার আব্দুর রশিদ জামানের সাথে। তিনি বলেন, এ দিনে কেউ ঘরে বসে থাকে না। ঘুড়ি নিয়েই সারা দিনের ব্যস্ততা ছোট-বড় সবার। এক সময় পুরান ঢাকাবাসীর ঘুড়ি উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য ঘুড়ি, নাটাই ও সুতার জোগান দিতে কয়েক দিন আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হতো, কিন্তু এখন সব কিছুই সংশ্লিষ্ট দোকানগুলোতে কিনতে পাওয়া যায় বলে আগের মতো ঝামেলা পোহাতে হয় না। ঘুড়ি উড়ানোর পাশাপাশি ঘুড়ি কাটাকাটিতে মাতোয়ারা হয় সবাই। কে কত ঘুড়ি কাটতে পারে এ নিয়ে চলে প্রতিযোগীদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা। ঘুড়ি উড়ানোর জন্য নেই কোনো প্রশিক্ষক কিন্তু সবাই যেন এ বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ। পড়ন্ত বিকেলে উৎসবের পরিপূর্ণতা পায়। এ সময় উৎসব উপভোগ করতে বাড়ির ছাদে ও রাস্তায় নেমে আসেন জনতা। দিনটিতে পুরান ঢাকাবাসীর থাকে না তেমন কোনো কর্মব্যস্ততা।
কেটে যাওয়া ঘুড়ি ধরতে ঘুড়ির পেছন পেছন দল বেঁধে ছুটে শিশু-কিশোরেরা। আবার কখনো কখনো বড়দেরও ঘুড়ির পেছনে দৌড়াতে দেখা যায়।
এ উৎসবে কোনো পুরস্কার বা কোনো কমিটি না থাকলেও যুগ যুগ ধরে একই নিয়মে ঘুড়ি উৎসব হয়ে আসছে। পুরান ঢাকার মুরগিটোলা এলাকার ১৬ বছরের কিশোর সায়েম সকাল থেকে ঘুড়ি উৎসবে যোগ দেয়। বাড়ির ছাদে সহপাঠী ও বন্ধুরা কয়েকজন একসাথে মিলে এ উৎসব পালন করছে। সায়েম জানায়, সন্ধ্যার পর্যন্ত চলবে ঘুড়ি প্রতিযোগিতা। সন্ধ্যার পর থেকে গান-বাজনা আর হৈহুল্লোড় করে সময় কাটানো হবে। এ সময়ে প্রত্যেক বাড়ির ছাদে চলে আনন্দ উৎসব।
প্রতি বছর সাকরাইনে পুরান ঢাকাবাসী ঘুড়ি উৎসবে আনন্দে মেতে ওঠেন। আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল, নীল, সাদা ও বেগুনি রঙের ঘুড়ি। আর ঢাকাবাসীর মনে এঁকে যায় রঙিন স্বপ্ন। তৈরি হয় নতুন এক মেলবন্ধন।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.