বালা

চারাগল্প
তারেকুর রহমান

১. রহমত সাহেব বেসরকারি চাকরি করেন। স্বল্প বেতন হলেও তার সুখের অভাব ছিল না। স্ত্রী রহিমা বেগম ও তিন সন্তান নিয়ে তার সুখের সংসার। বাসায় এলে সন্তানদের হৈহুল্লোড়ে আনন্দে ভরে ওঠে। রহিমা বেগম খুবই ধৈর্যশীল নারী। সন্তানদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে সব তিনি একাই সামলান। স্বামী চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তার ওপর একটুও প্রেশার দেন না। বেশ ভালোই যাচ্ছিল তাদের সময়গুলো। এই সুখ তাদের বেশি দিন সইলো না। হঠাৎ একদিন গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে রহমত সাহেব পঙ্গু হয়ে যান। তার চিকিৎসার পেছনে জমানো টাকা সব খরচ হয়ে যায়। এই বিপদের মুহূর্তে আত্মীয়স্বজন কাউকেই পাশে পাননি রহিমা বেগম। অসুস্থ স্বামী, ছেলেমেয়েকে নিয়ে কোথায় যাবেন তা ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না রহিমা বেগম। নানা জায়গায় ধরণা দেয়ার পরও এতটুকু সাহায্যও পেল না। রহমত সাহেব পরিবারের এই দুর্দশা দেখে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তারই বা কী দোষ। রহিমা বেগম হেরে যাওয়ার মতো মানুষ নন। তার সম্বল বলতে হাতের বালা দুটোই ছিল। এই বালা দুটো বিক্রি করে একটি সেলাই মেশিন কেনেন। তার পর থেকে রহিমা বেগমের যুদ্ধ শুরু হলো। সন্তানদের স্কুলে পড়াশোনা, স্বামীর চিকিৎসা সব মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলেন। কিন্তু তিনি থেমে যাওয়ার মতো মানুষ নন। দিন-রাত সেলাইয়ের কাজ করে স্বামী-সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। সন্তানদের এক ফোঁটাও কষ্টে থাকতে দেননি। জীবনের এই কঠিন যাত্রায় কাউকে তিনি পাশে পাননি। এই যাত্রা কত কঠিন, তা একমাত্র রহিমা বেগমই জানেন।

২. শফিক ঢাকায় একটি কলেজে অনার্সে পড়েন। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় তার অনেক দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালন করতে শফিক সব সময় চেষ্টা করেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো টাকা বাড়ি থেকে আনেন না। টিউশনি আর বাড়ি থেকে যে টাকা আসে, তা দিয়েই কোনোরকম তার হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে বাড়ি যাওয়ার সময় ছোট ভাইবোনের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যান। ভাইয়ের দেয়া উপহার পেয়ে তাদের আনন্দের আর সীমা থাকে না। আড়াল থেকে এসব দেখে শফিকের মা রহিমা বেগম চোখ মোছেন। মায়ের অশ্রু শফিকের দৃষ্টি এড়াতে পারে না। মাকে দেখলে শফিকের অনেক কষ্ট লাগে। মা যে আস্তে আস্তে বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন। ঠিকমতো চোখে দেখেন না। কয়েক বছর হলো চশমা ব্যবহার করেন। কিন্তু মা একটুও বিশ্রাম নেন না। এখনো দিন-রাত সেলাই করেই যাচ্ছেন। পরিবারের ঘানি টানতে টানতে মা যে খুব ক্লান্ত। মা একটুও বুঝতে দেন না। শফিকের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। মা নিজের হাতের বালা বিক্রি করে সেলাই মেশিন কিনেছিলেন। আমাদের জন্য মা কষ্ট করতে করতে কখনো একটু ভালো খাবার, ভালো শাড়ি তার ভাগ্যে জোটেনি। শফিক ভাবতে থাকেন মায়ের জন্য, তার পরিবারের জন্য অনেক কর্তব্য আছে। সেগুলো তাকে পালন করতেই হবে। প্রতি মাসে টিউশনির টাকা পেলে কিছু টাকা জমান। যখন অনেক টাকা হবে, সেই টাকা দিয়ে মাকে একটা সারপ্রাইজ দেবেন।

৩. শফিক তার জমানো টাকা নিয়ে বের হলেন। মায়ের জন্য একটি উপহার কিনে নিলেন। উপহার নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন শফিক। গাড়িতে বসে কত চিন্তা মাথায় এলো। কিভাবে মাকে বলবে এই উপহারের কথা। মা উপহার পেয়ে খুব খুশি হবেন তো। শফিক গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলেন। শফিককে দেখে রহিমা বেগম অবাক হয়ে যান। শফিক সাধারণত ঈদের আগের দিন আসে। এবার চার দিন আগেই চলে এলো। শফিক বাড়ি আসবে অথচ একটা কলও দেয়নি! ছেলের অসুখ হলো কি না মাথায় হাত দিয়ে দেখতে লাগলেন রহিমা বেগম।
- বাবা তুই কি অসুস্থ?
- না, মা। আমি সুস্থই আছি। মা তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।
- কী বাবা?
- আগে বলো আমাকে বকাঝকা করবে না।
- আচ্ছা করব না।
- মা আমি তোমার জন্য একটা উপহার এনেছি।
- কী দরকার ছিল এসবের। কেন এসব করতে গেলি বাবা।
- মা তুমি বলেছ বকা দেবে না।
রহিমা বেগমের হাতে একটা বাক্স ধরিয়ে দেন শফিক। রহিমা বেগম আস্তে আস্তে বাক্সটা খোলেন। বাক্স খুলে অবাক হয়ে যান রহিমা বেগম। বাক্সের ভেতরে একজোড়া বালা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে রহিমা বেগম বললেন,
- তুই এটা কই পাইলি?
- মা তোমার জন্য কিনেছি।
- টাকা কোথায় পেলি?
- টিউশনির টাকা জমিয়ে কিনেছি।
রহিমা বেগম শফিককে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগলেন। শফিকও মাকে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন। আর বলতে লাগলেনÑ
- মা তুমি তো আমাদের জন্য সারা জীবন কষ্ট করেছ। সেই ছোট্টবেলায় দেখেছি, বালা বিক্রি করে সেলাই মেশিন কিনেছ। তোমার শূন্য হাত দেখে বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠত। আমার মায়ের হাত খালি এটা আমি কিভাবে মেনে নেবো? তাই সেই ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখেছি, মায়ের হাত কখনো খালি রাখব না। মা এই বালাগুলো একটু হাতে লাগাও না।
- দে বাবা তুই হাতে পরিয়ে দে।
শফিক মায়ের হাতে বালা পরিয়ে দিলেন। মাকে কী সুন্দর মানিয়েছে। এই ঈদে শফিকের মনের আশা পূর্ণ হলো। দূর থেকে হুইল চেয়ারে বসে সব কিছু দেখছিলেন রহমত সাহেব। রহমত সাহেবও কোন ফাঁকে কেঁদে দিলেন টেরই পেলেন না। এ কান্না কষ্টের নয়, এ কান্না আনন্দের।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.