রাখাইনে ফেরার পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা রোহিঙ্গাদের
রাখাইনে ফেরার পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা রোহিঙ্গাদের

রাখাইনে ফেরার পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা রোহিঙ্গাদের

হুমায়ুন কবির জুশান (উখিয়া কক্সবাজার) 

মিয়ানমারের রাখাইনে গণহত্যার পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হতে যাচ্ছে। তাদেরকে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুতি শুরু করেছে দেশটি। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনতে দুটি অভ্যর্থনা কেন্দ্র ব্যবহার করা হবে। তবে চরম নির্যাতনের শিকার অসহায় রোহিঙ্গারা মনে করছেন- মিয়ানমারে তাদের বাপ-দাদার বসতভিটায়, নাগরিক মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের ফেরত যাওয়ার পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। তারা বলছেন- 'মিয়ানমার সেনা ও রাখাইনরা আমাদেরকে আবার মারবে। আমরা শঙ্কিত'।

থাইংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত ৬৫ বছরের বৃদ্ধ নুরুল ইসলাম বলেন- বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব আমাদের পাশে যেমনভাবে দাঁড়িয়েছে, তাতে আমার মনে হয়েছে- যে মানুষগুলোর দেশ নেই, সারা পৃথিবীটাই যেন তাদের দেশ। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি মিয়ানমার। আমরা আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই, তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে। আমাদের ভীষণ ভয় করছে। এখনো নির্মম নির্যাতনের স্মৃতি ভুলতে পারছি না।

মিয়ানমারের নির্যাতনের ফলে গত পাঁচ মাসে প্রায় সাত লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে কয়েকদিন আগে দুই দেশ একটি চুক্তি সই করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। মিয়ানমারের ওপর এখনো আস্থা রাখতে পারছেন না কেউই। আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে শুরু করে দেশীয় কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ দেখছেন না আশার আলো।

কুতুপালং লম্বাশিয়া ৩ নং মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি মোরশেদ আলম বলেন, চুক্তির খবরটি ছড়িয়ে পড়ায় তাদের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মাঝে। তিনি মনে করেন রাখাইনে এখনও তাদের ফিরে যাওয়ার জন্যে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।

রোহিঙ্গা শিশু নুর কায়দার বয়স এখনো ১০ পেরোয়নি। চোখের সামনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গুলি খেয়ে মরতে দেখেছে বাবাকে। নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছে মাকে। দুই মাস আগে রাখাইন রাজ্যে সামরিক জান্তা ও মগদের আক্রমণের শিকার হয়ে মায়ের সঙ্গে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সে। এরপর আশ্রয় নেয় উখিয়া কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সব হারানোর দগদগে স্মৃতি নিয়ে বাংলাদেশে এসে আপাত স্বস্তির দেখা মিলেছিল। তবু ভয় আর অজানা শঙ্কায় নির্যাতনের স্মৃতি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ছায়ার মতো সময় কাটিয়েছে আশ্রয় ক্যাম্পে। এখন আবার সেই দেশে ফিরতে হবে শুনে ভয়ে থর থর করে কাপঁছে।

থাইংখালী তাজিনারমারখোলা ক্যাম্পের মাঝি জামাল উদ্দিন বলেন, চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। নিশ্চিত করা হয়নি তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি। ফলে অনিশ্চিত ভাগ্য বরণ করতে হবে রোহিঙ্গাদের। এমনটি তারা চান না।

চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে ৩০০ রোহিঙ্গা এবং সপ্তাহে ১৫০০ রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার কথা বলা হয়। সপ্তাহে দুইদিন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে। দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করার কথাও বলা রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ১৫০০ জন করে পাঠানো হলে দুই বছরে রোহিঙ্গা পাঠানো যাবে ১ লাখ ৫৬ হাজার। তবে তিন মাস পরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া দুই পক্ষ থেকেই পুনরায় পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য সীমান্তে পাঁচটি ট্রানজিট ক্যাম্প খুলবে বাংলাদেশ। সেখান থেকে তাদের নিয়ে প্রাথমিকভাবে রাখা হবে মিয়ানমারের দুটি অভ্যর্থনা ক্যাম্পে। পরে সাময়িকভাবে তাদের থাকার ব্যবস্থা হবে হা পো কুংয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পে।

উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে তাদের স্ট্যাটাস কী হবে, ফেরত পরবর্তী অবস্থায় তাদের খাদ্য ও বাসস্থানের কী ব্যবস্থা, তাদের জাতীয়তা কী হবে, তাদের জীবিকার কী ব্যবস্থা থাকবে ইত্যাদি বিষয় তাদের অবহিত করতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এনজিওদের অনিয়ম, দুর্নীতি বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির নব নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের আমরাই প্রথমে চোখের জলে বরণ করে নিয়েছি। বিদায়ের বেলায় ভাল-মন্দ দেখা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।

সমাধান শিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. নাজিম উদ্দিন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। প্রথমত, পূর্ণাঙ্গ অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে বার্মা সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, ফিরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, ক্যাম্পে নয়, রোহিঙ্গাদের স্ব-স্ব ভিটায় বাসস্থান তৈরি করে ফিরিয়ে নিতে হবে। পঞ্চমত, ব্যাপক কর্মসূচির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি এবং প্রস্তুত করতে হবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.