এক শিক্ষকের অন্তিম সময়
এক শিক্ষকের অন্তিম সময়

এক শিক্ষকের অন্তিম সময়

এস আর শানু খান

গত বছরও টানা তিন-চার মাস বিকেলে মনোখালী মোড়ে একসাথে আড্ডা দিয়েছি গোপাল স্যার, গৌর স্যার, মাখন দাদু, সুবাস দাদু, দোকানদার গৌতম দাদা, মাঝে মধ্যে সাধন স্যারও আসতেন। দারুণ মজার আড্ডা হতো। প্রতি বিকেলে হাজারও অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার গল্প শুনতাম গুণী মানুষগুলোর মুখে। সেই সময়কার স্কুলের পরিবেশ, ম্যানেজিং কমিটির কর্মকাণ্ড, অভিভাবকদের ছলচাতুরী, ও ছাত্রছাত্রীদের নানা সব রঙঢঙের গল্প। আমি হা করে শুনতাম। গোপাল স্যার কিছু সময় পরপর বলতেন, হাঁ করে কী সব কথা রেকর্ড করে নিচ্ছিস নাকি রে শানু। রাতে গিয়ে পত্রিকার পাতায় উগরাবি ঠিক না! এই বলে একটা অসাধারণ হাসি হাসতেন গোপাল স্যার। 

বয়সের টানে বাস্তবতা আজ কেন জানি সেই আড্ডাবাজিটাকে বিলীন করে দিয়েছেন। এখন আর আড্ডা হয় না। বেশ কিছু দিন শুনেছি যে গৌর স্যার খুবই অসুস্থ। দেখতে যাবো যাবো ভাবি কিন্তু যাওয়া হয় না। আজ সকালে ক্যামেরা নিয়ে কিছু সংবাদ সংগ্রহের জন্য গৌর স্যারদের বাড়ির সামনে দিয়ে একটু মাঠের দিকে যাচ্ছিলাম। গৌর স্যারদের বাড়ির গেটের সামনে একটা চেয়ারে বসে চামচ দিয়ে থালার মাখানো ভাত খাচ্ছেন গৌর স্যার।

শিক্ষকতার জীবন শুরু হয়েছিল মধুখালী সরকারি প্রাইমারি স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। এরপর সেখান থেকে ট্রান্সফার হয়ে নিজের জন্মস্থান মনোখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর গৌরচন্দ্র রায়কে গঙ্গারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক করা হয়। এরপর শিক্ষকতা জীবনের একদম শেষ সময় পর্যন্ত গঙ্গারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান।

আমাকে ডাক দিয়ে বললেন, বাবাজি নাকি?
আমি আচমকা থেমে স্যারের দিকে না এগিয়ে থাকতে পারলাম না। আমি একটু এগিয়েই জিজ্ঞেস করলাম স্যার আপনি এত দূর থেকে আমাকে কিভাবে চিনলেন? একটু লুকানো হাসি মিশ্রিত মুখে স্যার বললেন, আমি তোমার চেহারা দেখে নয় তোমার হাঁটার ধরন দেখেই ধারণা করেছি তুমিই হবে। দেখছ, আমার ধারণা সঠিক হয়েছে। আমি বললাম, স্যার আপনি ভালো আছেন? শরীর কি এখন একটু ভালো? হাই তুলে স্যার বললেন, শরীর ভালো থাকলে তো আমাকে দেখতে। এত দিন কতবার দেখা হতো। এখন আর পারি না বাবা। টানা কয়েক মাস বিছানায়। এখন একটু বিছানা ছেড়েছি কিন্তু নিজের চলার মতো ক্ষমতা নেই। এই যে এই রোদে আইছি, তাও আমাকে উঁচু করে এখানে এনে চেয়ার পেতে বসিয়ে দিয়ে গেছে। আমার ডান পাশ ধরেই একদম অবশ, কোনো চেতনা নেই। এই পাশ একদম প্যারালাইজড হয়ে গেছে বাবা।

আমি বললাম, স্যার ভাত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, খান আর কথা বলেন। আমি দাঁড়িয়ে থাকতেই বেশ কয়েকবার চামচ দিয়ে সামান্য কিছু ভাত খেলেন। তাও অনেক চেষ্টার পর। ডান হাত একদম অচল। বাম হাত দিয়ে থালা থেকে ভাত উঠাতেই পারছেন না ভালো করে। আর যদিও বা কিছু উঠছে তো সে চামচ গালে দিতে বারবার চেষ্টা করার পর গালে পৌঁছল চামচের বেশির ভাগ ভাতই বাইরে পড়ল। স্যারের একটি মাত্র ছেলে ও দুই মেয়ে। এক মেয়ের বাড়ি ইন্ডিয়ায় ও অন্য এক মেয়ের বাড়ি যশোরে। ছেলে গৌতম চন্দ্র রায়। অনেকটা মানসিক প্রতিবন্ধী। এক ছেলের জনক এই গৌতম কখন কী করে নিজেও বোঝে না। গৌতমের এক ছেলে এবার ইন্টামিডিয়েট পরীক্ষা দেবে। স্যার বলতেন গৌতমের এ ছেলে নাকি স্যারকে মালুমই করেন না। কিছু বললেই ক্ষেপে ওঠে। পড়ার কথা বললে ছেলে আর তার মা এক হয়ে স্যারের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করতেন।

স্যারের চোখে মুখে অসহায়ের ছাপ। আমি বললাম, স্যার এখন যাই, পড়ে আবার এসে অনেক সময় বসে গল্প করব। স্যার বললেন, বাবা এমনও সময় ছিল যখন গঙ্গারামপুর স্কুলে চাকরি করতাম। বিকেলে অনেকেই আমার পথ চেয়ে বসে থাকত যে, আমি আসব আর তাদের এক কাপ চা খাওয়াব। কিন্তু এখন কেউই একটু চোখের দেখাও দেখতে আসে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সবার প্রতি আমার মায়ামমতা গভীর থেকে গভীরতর হলেও আমার প্রতি সবার বিরক্তি-অবহেলা বাড়ছে। আমাকে আপনজনেরাও সহ্য করতে পারে না। বলতে গিয়ে কেঁদে দিলেন। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন সারা জীবন গল্পে পড়েছি, গল্প শুনেছি ছাত্রদের বলেছি কাউকে মারা লাগে না। এমন এমন কথা আছে, এমন এমন আচরণ আছে যেগুলো কারো সাথে করলে মারারও অনেক ঊর্ধ্বে চলে যায়। ঠিক এমনই পরিস্থিতির মধ্যে আজ আমি। সবই কপাল বাবা। নসিবের লেখন খণ্ডাবার নয়।

স্যারের শেষ কথাটা ছিল, ‘জীবনে যা-ই কিছু করো না কেন একটি কথা সব সময় মনে রাখবা, মানুষ হতে হলে যে স্কুলেই যেতে হবে, নানা রকম ডিগ্রি অর্জন করতে হবে সেটা কিন্তু একদমই ঠিক নয়। মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন মানবিকতা। জীবে সেবা। আপনজনের অসুস্থতায় সেবা করা। পরিচর্চা করা। বাবা মায়ের মনে কখনো কষ্ট দেবে না। হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, এই দুনিয়াতে সন্তানের অবহেলা একজন বাবা-মায়ের কাছে যে কতটা কষ্টের হতে পারে, সেটা বলে বোঝানো সম্ভব নয় বাবা। তোমরাও হয়তো একদিন বাবা হবা। তাই তো নিজের বাবা-মায়ের সাথে ভালো আচরণ করবা। তাদের মনে কষ্ট দেবে না।'

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.