টিভি বিজ্ঞাপনে  এবং অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় নারী
টিভি বিজ্ঞাপনে এবং অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় নারী

টিভি বিজ্ঞাপনে এবং অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় নারী

শাহ্ আব্দুল হান্নান

সাধারণত আমার টিভি কমই দেখা হয়। এর মূল কারণ ব্যস্ততা। সারা দিন হয়তো দু-একবার খবর দেখি। বিবিসির হার্ডটক অনুষ্ঠানটির প্রতি আমার আকর্ষণ আছে, বিশেষ করে কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির উপস্থিতি ঘটলে অনুষ্ঠানটি আমাকে টানে। যেমনÑ ফিলিস্তিন বা ইরাক ইস্যুতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বক্তব্য। এ ছাড়াও কিছু অনুষ্ঠান ইচ্ছা করে দেখার চেষ্টা করি। এর একটি উদ্দেশ্য আছে। সমাজে কী ঘটছে, কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে কিংবা কী ধরনের উত্তরণ হচ্ছেÑ এসব বিষয় বোঝার জন্য কখনো কখনো টিভির পর্দায় চোখ রাখি।

এবারের ঈদে আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলগুলো অসংখ্য এবং নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রচার করেছে। দেশের চারটি টিভি চ্যানেলে এ নিয়ে বেশ প্রতিযোগিতা হয়েছিল। এসব অনুষ্ঠানের দু-চারটি আমি লক্ষ করেছি। অনুষ্ঠানগুলো কেমন হয়েছে সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। তবে এসব চ্যানেলে ঈদে এবং অন্যান্য সময় প্রচারিত বিজ্ঞাপন এবং মেয়েদের উপস্থাপনার বিষয়টি নিয়ে কিছু কথা আমি পাঠকের সাথে শেয়ার করতে চাই।

টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গ উঠলেই নারী কথাটি এসে যায়। ‘বিজ্ঞাপনে নারী’ বহুল আলোচিত-সমালোচিত একটি বিষয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়া এসে বিজ্ঞাপনে নারীর ব্যবহারকে অনেকটা অযৌক্তিকভাবেই আবশ্যিক করে তোলে। প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে, প্রাসঙ্গিক এবং অপ্রাসঙ্গিকভাবে ‘নারী’ বিজ্ঞাপনে ব্যবহার শুরু হয়। এমনকি কোনো কোনো বিজ্ঞাপনে নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন কোনো পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের প্রচার ও প্রসারের জন্য প্রয়োজন। পণ্য যত ভালোই হোক না কেন তার কাটতি নির্ভর করে জনগণকে অবহিত করার ওপর। বাজারব্যবস্থার এ যুগে কেউই বিজ্ঞাপনকে অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখাতে পারছে না, সম্ভবত পারবেও না। সুতরাং বিজ্ঞাপন যে দরকার তার একটি সঙ্গত কারণ অবশ্যই রয়েছে। আর টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের প্রভাব ব্যাপক। শুধু পণ্যের প্রসারই নয়, টিভি চ্যানেলে প্রচারিত বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত বাক্য, শব্দ, ছবি, ব্যক্তি ও সমাজজীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। আর তাই বিজ্ঞাপনে, বিনোদনে অযৌক্তিকভাবে নারীর উপস্থাপনের বিষয়টি সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তোলে।

হ্যাঁ, পণ্যের প্রচার দরকার। কিন্তু তার জন্য কি বিজ্ঞাপনে আমাদের ঐতিহ্যের বিরোধিতা, অশ্লীলতা এবং কুরুচি আমদানির প্রয়োজন আছে? অশ্লীলতা কি পণ্যের কাটতি বাড়ায়? এর কি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে? সুন্দর এবং আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন কি ক্রেতাদের হতাশ করে? আমি মনে করি এসব প্রশ্নের জবাব প্রায় সবার একই। কিন্তু এর পরও কেন এসব করা হচ্ছে?

টিভি চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপন ক্রমাগতভাবে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিহীন হয়ে পড়ছে। একান্তই পুরুষের ব্যবহৃত পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীদের অযৌক্তিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে পুরুষের চেয়ে নারীদের উপস্থিতি অনেক বেশি। আমি ব্যক্তিগতভাবে ধূমপান নিষিদ্ধ করার পক্ষে। একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এর ন্যূনতম প্রয়োজন নেই। সে যাই হোক, আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে সিগারেটের যে বিজ্ঞাপন দেয়া হয় তা অনেকটা কুরুচিপূর্ণ। আর এ সিগারেটের বিজ্ঞাপনেও নারী মডেলের অপ্রয়োজনীয় উপস্থিতি লক্ষণীয়। অধিকাংশ নারীই স্বামী-সন্তানের সিগারেট খাওয়া রোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কোনো নারীই চান না তার স্বামী-সন্তান ধূমপায়ী হোক। অনেক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ধূমপানকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব পর্যন্ত দেখা দেয়। সেখানে বিজ্ঞাপনে স্বামী বা বন্ধুর সিগারেট খাওয়ায় নারীর সহযোগিতা বা উৎসাহ নারীকে কতটুকু হেয় করে তা দর্শকদের না বোঝার কথা নয়। কাজেই সব বিজ্ঞাপনেই নারীর ব্যবহার কতটুকু যুক্তিযুক্ত এবং উদ্দেশ্যমূলক সে প্রশ্ন দর্শকরা তুলতেই পারেন।

বিজ্ঞাপনে আমরা আমাদের কালচার থেকে সরে যাচ্ছি। বেশির ভাগ বিজ্ঞাপনচিত্রেই দেখা যায় নারীদের শরীরে ওড়না নেই। নারীর শরীর প্রকটভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যে হিন্দি সিনেমার মতো হঠাৎ বৃষ্টিতে মডেলদের ভেজানো হয়। দেখা যায় নারী মডেল প্রায়ই ওড়না উড়িয়ে দিচ্ছেন। এসব এক ধরনের অশ্লীলতা। অপ্রয়োজনীয়ভাবে নারী মডেলের ওড়না উড়িয়ে না দিলে কিংবা বৃষ্টিতে না ভেজালে কি সে পণ্যটি কেউ কিনবে না? অনেক মডেল আবার ওড়না এক পাশে ঝুলিয়ে রাখেন। আবার অনেকে ওড়না গলায় পেঁচিয়ে রাখেন। দুঃখজনক হলো শুধু বিজ্ঞাপনেই নয়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনায়ও অনেক নারী এ নেতিবাচক স্টাইলটি গ্রহণ করেছেন। এটি প্রকৃতপক্ষে আমাদের ঐতিহ্যবিরোধী। তা হলে আমাদের জাতির ঐতিহ্যবিরোধী এসব অশ্লীল এবং বিকৃত কালচার ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য কী? আমরা তো মনে করি, এ দেশের শতকরা নিরানব্বই জন লোকই জাতির ভালো ঐতিহ্য থেকে সরে যেতে চায় না।
অন্য দিকে, বিজ্ঞাপন যারা তৈরি করছেন তাদের বাড়িতেও যদি আমরা যাই তাহলে দেখব সেখানেও অধিকাংশকেই এরকম পোশাক-আশাকে দেখা যায় না। এড ফার্মের মালিকদের মেয়ে, স্ত্রীরাও এরকম পোশাক পরে বলে মনে হয় না। এমনকি টিভি চ্যানেলগুলোর মালিকদের পরিবারগুলোতেও এরকম খুব একটি হয়তো দেখা যাবে না।
তাহলে কোন যুক্তিতে এ বিষয়গুলোকে আমরা প্রশ্রয় দেব? সাহায্য করব? ক্রমাগতভাবে এ উচ্ছৃঙ্খলতাকে তুলে ধরব? এখানে ‘উচ্ছৃঙ্খল’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আমাদের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি এক দিকে ইসলাম এবং অন্য দিকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য। এখানে দৃষ্টিভঙ্গি পাশ্চাত্যের নগ্নতা ও উদ্দমতা দিয়ে বিচার করা হচ্ছে না।

টেলিভিশনে উপস্থাপনা
টেলিভিশনে প্রচারিত কিছু অনুষ্ঠানের উপস্থাপনাও দেখলাম। বিশেষভাবে যুবতী, কিশোরী মেয়েদের উপস্থাপিত অনুষ্ঠানের অনেকগুলোতে মেয়েদের প্যান্ট-শার্ট পরে উপস্থাপনা করতে দেখা গেছে। সেই সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওড়নাবিহীন। প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে উপস্থাপন করার প্রয়োজন পড়ল কেন? এটি তো কুনজরকে প্রশ্রয় দেবে। শালীনভাবে উপস্থাপনা করতে আমাদের সমস্যা কোথায়? ঐতিহ্যগতভাবে যে স্টাইলে সুন্দর পোশাক পরে উপস্থাপনা করা হয়ে থাকে সেটিকে হঠাৎ করে সম্প্রতি কেন পরিত্যাগ করা হচ্ছে?
এসব বিষয়ের সাথে এখানে কালচারের বিষয়টি আমাদের বড় করে দেখতে হবে। আমরা যেন না বুঝে, না চিন্তা করে একটি বিজাতীয় কালচারের শিকারে পরিণত না হই। আমরা যেন সুন্দর ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে না যাই। আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেয়েরা সাধারণভাবে যে শালীন পোশাক পরছে, কিংবা সরকারি অফিস আদালতে যাচ্ছে, সে ধরনের পোশাক পরে উপস্থাপনা করতে দোষ কোথায়?

এদিকে আমাদের বিজ্ঞাপনের ধরন বা স্টাইল এমনভাবে পাল্টে যাচ্ছে যা আমাদের রুচিবোধকে একেবারে তোয়াক্কা করছে না। পোশাক-আশাকের বিষয়টি তো রয়েছেই। সেইসাথে তরুণীদের অঙ্গভঙ্গি পারিবারিক পরিবেশে দেখাটাও লজ্জাজনক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞাপনের ভাষাতেও রয়েছে অসামঞ্জস্য। বোম্বের বিখ্যাত নায়িকা যে সাবানের বিজ্ঞাপনের মডেল, সে সাবান ব্যবহার করে স্টার হয়ে যাওয়া যাবে এমন একটি অবাস্তব সংলাপও আমরা বিজ্ঞাপনে লক্ষ করি। সুগন্ধি পাউডার মেখে ইন্টারভিউ দিতে গেলেই কোনো মেয়ের চাকরি হয়ে যাবে এটি কেবল অবাস্তবই নয়, প্রকৃত বিজ্ঞাপনচিত্রে নারীর যোগ্যতাকেও হেয় করে দেখা হয়েছে। নির্দিষ্ট একটি ক্রিম ব্যবহার করলেই ত্বক ফর্সা হবে আর অমনি চাকরি হয়ে যাবে, এমন অবাস্তব সংলাপ কি করে বিজ্ঞাপনচিত্রে আসে? বিষয়টি এত সহজ নয়। বাংলাদেশে বিমানবালার চাকরির জন্য রঙ ফর্সা বাধ্যতামূলক নয়। কনডেন্সড মিল্কের একটি বিজ্ঞাপনে একজন নারী মডেলকে কৌশলে অশালীনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আসলে উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। কারণ আমি আগেই বলেছি, আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত বেশির ভাগ বিজ্ঞাপনই নারীকে অশ্লীল এবং হেয় করে উপস্থাপন করা হয়।

কর্তৃপক্ষের করণীয়
বিজ্ঞাপন যেন আমাদের কালচার বিকৃতির একটি মাধ্যমে পরিণত না হয়- এ ব্যাপারে সবার নজর দেয়া প্রয়োজন। এখানে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোর কর্তৃপক্ষ ভাবতে পারেন এটি প্রতিযোগিতার বাজার। সেখানে তাদের বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করতে হবে বলে কোনো বিজ্ঞাপন তারা বাতিল করতে পারছেন না। কিন্তু আমি বলব, প্রাইভেট চ্যানেলগুলো এ ব্যাপারে পরস্পর একত্রে বসে বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত একটি নীতিমালা ঠিক করে নিতে পারেন।

একইভাবে যেসব বিজ্ঞাপনী সংস্থা আছে, যারা বিজ্ঞাপন তৈরি করে, তাদেরও একটি বিচার বিবেচ্য বিষয় থাকতে হবে। এখানে আগেই প্রচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রচার অশ্লীল হলে কিংবা সৌজন্যতা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ছেড়ে দিলেই যে কোনো পণ্য বেশি বিক্রি হবে সে রকম ধারণা আমরা কেন করছি? এটির কোনো যুক্তি নেই। প্রকৃত সত্য হলো, যেকোনো পণ্যের জন্যই ব্যাপক প্রচার দরকার। কিন্তু এ জন্য কোনো অশ্লীলতার প্রয়োজন নেই। এ বিষয়টি দেখার জন্যও এড ফার্মগুলোকে অনুরোধ করি। তাদের সমিতি থাকলে তাদেরও এসব বিষয় দেখতে অনুরোধ করি।

সরকারের করণীয়
সরকারেরও কিছু না কিছু করার দরকার আছে। সরকারও এসব বিজ্ঞাপনী সংস্থার নীতিমালা তৈরি করে দিতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হবে যেন এ সীমাকে তারা অতিক্রম করতে পারবে না। জাতীয় স্বার্থে সরকারের এখানে একটি ভূমিকা থাকতেই পারে এবং থাকা উচিত। সরকার এ ব্যাপারে টিভি চ্যানেলগুলোর কর্তৃপক্ষ এবং বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর সমিতির সঙ্গে বসে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে।

বিজ্ঞাপনে নারীর নেতিবাচক ইমেজ প্রতিষ্ঠা নারীকে অবমূল্যায়ন করে। এ ক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে কোনো নীতিমালা নেই। নারীর নেতিবাচক উপস্থাপন বন্ধের জন্য এবং অবাস্তব অশ্লীল বিজ্ঞাপনচিত্র, যা মানুষের মনে প্রভাবও ফেলে সেসব বিজ্ঞাপন তৈরি না করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। নীতিমালা মেনে বিজ্ঞাপন তৈরি হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। এ ছাড়াও যারা বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হচ্ছেন তাদের অভিভাবক এবং তাদের নিজেদেরও এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। টিভির সঙ্গে জড়িতদের দায়িত্বশীল হতে হবে। তারা যা করছেন তা সমাজকে প্রভাবিত করছে। সমাজের সংস্কৃতি, রুচি ও মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর দায়িত্বও তারা এড়াতে পারবেন না।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.