ঢাকা, শুক্রবার,২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

ঢাকা

ভূমি কর্মকর্তা সেতাবুলের ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ

মো: আল আমিন কিশোরগঞ্জ

১৯ জানুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ০৬:২৫ | আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ০৬:৩৫


প্রিন্ট
সেতাফুল যেভাবে ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন

সেতাফুল যেভাবে ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন

কিশোরগঞ্জ জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলএও) মো: সেতাফুল ইসলামকে গ্রেফতারের পর তার অপকীর্তি নিয়ে প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় পিরোজপুর সার্কিট হাউজের সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করে দুদক বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের সমন্বিত একটি দল।

এর আগে বিকেলে দুদক ময়মনসিংহ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রাম প্রসাদ মণ্ডল বাদি হয়ে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সেতাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেন। কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি খোন্দকার শওকত জাহান জানান, সেতাফুল ইসলাম ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ভূমি অধিগ্রহণের সরকারি ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেতাফুল ইসলাম যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছিল।

কিশোরগঞ্জ কালেক্টরেটের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা থাকাকালে সেতাফুল ইসলাম ভূমি অধিগ্রহণের ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার পাশাপাশি আরো ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের আয়োজন করেছিলেন। বিষয়টি ধরা পড়লে চেক আটকে দিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: আজিমুদ্দিন বিশ্বাস। এ ঘটনায় কিশোরগঞ্জসহ সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

মন্ত্রিপরিষদ থেকে ২৮ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মো: শাফায়াত মাহবুব চৌধুরী উল্লেখ করেছিলেন, সেতাফুল জেলা হিসাবরণ কর্মকর্তা স্বারিত পাঁচ কোটি টাকার একটি চেক নিয়ে ৬ ডিসেম্বর ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মচারীদের বেতনভাতার নামে খোলা সোনালী ব্যাংকের চলতি হিসাবে জমা করেন। এ হিসাব নম্বর থেকে এই দিন তিনি দুই কোটি টাকা এবং পরদিন দুই কোটি ৯৪ লাখ টাকা তোলেন। বাকি ছয় লাখ টাকা তপন ইন্ডাস্ট্রিজের নামে পাঠান তিনি। উপসচিবের চিঠির শেষে মন্তব্য ছিল এ রকম করা ‘অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত। এ অবস্থায় এই কর্মকর্তা যাতে দেশের বাইরে চলে যেতে না পারেন, সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

এ ছাড়া আরেক চিঠিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছিল। এ বিষয়ে মামলা করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও আরেকটি চিঠি দেয়া হয়।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মিঠামইন উপজেলায় সেনানিবাস স্থাপন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। যে খাত থেকে হিসাবরণ কর্মকর্তার কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকার চেক চান সেতাফুল সেই খাতে সাড়ে চার কোটি টাকা ছিল। পরে অন্য খাত থেকে আরো ৫০ লাখ টাকা এনে সমন্বয় করে হিসাব বিভাগ থেকে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার নামে চেক দেয়া হয়। এর মাধ্যমে এই অনিয়মে জেলা হিসাব বিভাগের জড়িত থাকার অভিযোগও ওঠে।

অর্থ আত্মসাতের এ ঘটনা তদন্তের জন্য ডিসির নির্দেশে দু’টি কমিটি গঠন করা হয়। একটি এক সদস্যের, অন্যটি তিন সদস্যের। একটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দুলাল চন্দ্র সূত্রধর। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক জহিরুল ইসলাম। দুই কমিটিই সেতাফুল টাকা আত্মসাতের সাথে জড়িত বলে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেয়। বিষয়টি নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ও তদন্ত করে।

জমা পড়া তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিটি এলএ (জমি অধিগ্রহণ) কেসের বিপরীতে তিগ্রস্ত ব্যক্তির নামে আলাদা চেক ইস্যু হওয়ার কথা। কিন্তু এ কর্মকর্তা নিজের নামে চেক ইস্যু করিয়েছেন। ইস্যু করা চেকের সাথে কেস নথি, রেজিস্টার, লেজার বই ইত্যাদিতে গরমিল পাওয়া গেছে। এমনকি হিসাবরণ কর্মকর্তার স্থিতির সাথে এলএ কেস নম্বরের লেজার বইয়ের গরমিল পাওয়া গেছে। এর বাইরে আরো ৬১টি চেকের আট কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার সুস্পষ্ট গরমিল পাওয়া যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে ডিসির কাছে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সেতাফুলের বিরুদ্ধে মামলা ও তাকে গ্রেফতার করা হয়।

এ দিকে গত ৩ ডিসেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন, অধিশাখা ২-এর উপসচিব মো: মনিরুজ্জামান মিঞা স্বারিত এক প্রজ্ঞাপনে কিশোরগঞ্জ জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সেতাফুল ইসলামকে একই পদে পিরোজপুর জেলা প্রশাসনে বদলি করা হয়েছিল। বুধবার বিকেলে তাকে পিরোজপুর থেকেই গ্রেফতার করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় গত ৬ জানুয়ারি অভিযোগ তদন্তে ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মির্জা তারিক হিকমত কিশোরগঞ্জ সফর করেন। তিনি তিন দিনের সফরে অভিযোগ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন।

একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মো: সেতাফুল ইসলাম সরকারি হিসাব নম্বরে (৩৪১১২০০০০০২৮৪) ভূমি অধিগ্রহণের ৫ কোটি টাকা জমা করেন। পরে নিজেই তা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।

জেলা হিসাবরণ কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের শাখায় পাঁচ কোটি টাকার এমব্রোস-এ প্রাপক হিসেবে ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা, কিশোরগঞ্জ লেখা হয়। জেলা হিসাবরণ কর্মকর্তার অফিস থেকে সেতাফুল ইসলাম স্বারিত অপর একটি এলএ চেক (নম্বর-০১০৪৩৪) পাওয়া যায়। এই চেকের মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা বরাবর আরো ১০ কোটি টাকার এমব্রোস প্রেরণের অপেক্ষায় ছিল। এ খবর জানার সাথে সাথে চেকটি জেলা প্রশাসন জব্দ করে। প্রতিটি এলএ কেসের বিপরীতে তিগ্রস্ত ব্যক্তির নামে আলাদা চেক ইস্যু হওয়ার কথা থাকলেও তা না করে সেতাফুল ইসলাম টাকা আত্মসাতের জন্য এ অভিনব কৌশল ব্যবহার করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়। এ ছাড়া এলএ শাখার হিসাবের ৬১টি চেকের ৮ কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার সুস্পষ্ট গরমিল পাওয়া গেছে বলেও তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।

পিরোজপুরে আটক ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সেফাতুল কারাগারে
পিরোজপুর সংবাদদাতা জানান, পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্যদের হাতে আটক পিরোজপুর জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মো: সেতাফুল ইসলামকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার তাকে পিরোজপুরের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক মো: আবু বকর ছিদ্দিক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পিরোজপুর জেলা জজ আদালতের পিপি খান মো: আলাউদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

খান মো: আলাউদ্দিন জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পিরোজপুর জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মো: সেতাফুল ইসলামকে আদালতে হাজির করা হলে আদালতের বিচারক তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠনোর নির্দেশ দেন। বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে পিরোজপুর সার্কিট হাউজের সামনে থেকে মো: সেতাফুল ইসলামকে দুর্নীতি দমন কমিশন বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টিমের সদস্যরা গ্রেফতার করে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের বরিশাল বিভাগীয় সহকারী পরিচালক মো: সিফাত উদ্দিন জানান, মো: সেতাফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জে জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা থাকাকালে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অননুমোদিত এলএ-কেসের (ভূমি অধিগ্রহণ মামলা) বিপরীতে সরকারের পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

বুধবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক রাম প্রসাদ মণ্ডল বাদি হয়ে এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ সদর থানায় (কিশোরগঞ্জ মডেল থানার মামলা নং-৩১, তারিখ ১৭.০১.২০১৮) দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৯/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মো: সেতাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। তার বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ভেন্না গ্রামে। তিনি কিশোরগঞ্জে দেড় বছরের অধিক কর্মরত ছিলেন। গত ১৩ জানুয়ারি পিরোজপুরে যোগদান করেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫