সভ্যতার সন্ধানে

আহমেদ উল্লাহ ভূঁইয়া

পৃথিবীর আঠারো হাজার মাখলুকাতের মাঝে মানুষকে বলা হয় ‘আশরাফুল মাখলুকাত’। অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী। বিবেকবোধ, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, ন্যায়-অন্যায় বিচার আর পরস্পর সহমর্মিতার জন্যই মানুষের এ অভিধা। সৃষ্টির আদি থেকে অদ্যাবধি মানুষ অনেক সভ্যতার নির্মাতা। মানুষের সীমালঙ্ঘন, হিংসা আর অসহিষ্ণুতার বিষক্রিয়ায় সভ্যতার সাথে সাথে মানুষও ধ্বংস হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে তাদের কীর্তি। কিন্তু এ থেকে মানুষ শিক্ষা নিয়েছে বলে জানা নেই। তাই একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নেই মনে হচ্ছে, মানবজাতি অতি দ্রুত আরেকটি বিপর্যয়ের পথে ধাবিত হচ্ছে। ধ্বংস যেন শুধু সময়ের ব্যাপার।

মানুষ মহান সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টি। পৃথিবী, সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত, গহিন অরণ্য, ধূসর মরুভূমি, আকাশমণ্ডল- এসবের চেয়েও জটিল ও বিস্ময়কর সৃষ্টি হলো মানুষের মস্তিষ্ক। এর যথাযথ ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করে মানুষের আচরণ ও ভূমিকা। প্রত্যেক মানুষ ইচ্ছা করলে এবং একাগ্রচিত্তে সাধনা চালিয়ে গেলে যেমন মহামানবও হতে পারে- তেমনি নিজ দোষে সভ্যতাবিনাশী শক্তিও হতে পারে। মনে যখন হিংসার উদ্রেক হয় তখন যদি সহমর্মিতার বোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা চলে, তখন হিংসা উদ্রেককারী স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এক সময় সেটি আর কাজ করে না। তখন নৈতিকবোধ উদ্রেককারী স্নায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর মানবমস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞরা হিংসা বা জিঘাংসা উদ্রেককারী মগজের এ চিপসকে বলেছেন ‘ইয়েলো মনস্টার’ বা হলুদ দৈত্য- যার প্রভাবে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ একেবারেই দুর্বল হয়ে যায়। এর সাথে যোগ হয় লোভলালসা, জিঘাংসা, পরশ্রীকাতরতা ও নিষ্ঠুরতা। তাই তো এ মানুষ তারই মতো আরেকজন মানুষকে অপমানিত, নিগৃহীত, শোষণ, অধিকারবঞ্চিত- এমনকি হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। কারণ তাকে মানুষের মতো দেখা গেলেও এর তার মানবিক আত্মা তথা নৈতিক বোধটি একবারেই অবশ হয়ে পড়ে। নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতাসহ ন্যক্কারজনক কাজে তার কোনো অনীহা হয় না। এ নিয়ে লজ্জা থাকে না। নিজে যা করে সেটাকে সঠিক বলে তার মনে হয়।

অনৈতিক শ্রেণী-পেশার লোকদের সাথে এদের সখ্য গড়ে ওঠে। তাই তো আমরা দেখছি চোর-ডাকাতের দল, চোরাচালানি ও নেশাগ্রস্তদের চক্র ইত্যাদি। সুচতুরভাবে যারা উচ্চমার্গের সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধী, এরা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাও দখল করতে পারে। এদের আশপাশে যারা থাকে তারাও অপরাধী, যে পদ-পদবিধারীই হোক না কেন। তবে এ ক্ষেত্রে ‘শিক্ষিত শ্রেণীর অবদান’ই বেশি। ভেবে দেখুন, যিনি ভেজাল ওষুধ তৈরি করেন, তিনি একজন রসায়নবিদ; যিনি নিত্য ঘুষ খান- তিনিও ‘শিক্ষিত’ লোক। বিধ্বংসী অস্ত্র আবিষ্কারক সবচেয়ে চৌকস মেধাবী ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষ। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষক যারা, তারা তো কম শিক্ষিত নয়। এদের সমস্যা বিবেকের রাডারে। তাই ‘জাহাজডুবি’র সম্ভাবনা থেকেই যায়। মগজের দূষণই মানুষকে বিপথগামী করে। অথচ ইচ্ছে করলে প্রত্যেক মানুষই সুস্থ বা নৈতিক জীবন যাপন করতে পারে। পরের অকল্যাণের জন্য সে যতটা সময় ব্যয় করে, এর চেয়ে অনেক কম সময়ে সে নিজের মঙ্গল করতে পারে।

হিংসা ও লোভ মানুষকে অধঃপতনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে দেয়। সুস্থ চিন্তাশক্তি তখন তাকে পরিত্যাগ করে। তাই সে একের পর এক অপরাধ করতেই থাকে। বিবেকের শক্তি হ্রাস পেলে পেশিশক্তির উন্মেষ ঘটে। জিহ্বা হয়ে পড়ে অসংযত। হাত হয়ে পড়ে অনিয়ন্ত্রিত। লজ্জা উধাও হয়ে যায়।
এক ট্যাক্সেস অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে গিয়েছিলাম। বিশেষ কারণে অ্যাপিলেটের বিচারক মহোদয় উপস্থিত থাকতে পারেননি। তাই সময় নিয়ে আসতে হলো। ওই দফতরে একজন মহিলা কর্মচারী যেভাবে ঘুষ দাবি করলেন- মনে হলো নাছোড়বান্দা পাওনাদার। বললাম- এখন রমজান মাস। তারিখ তো ঈদের পর। এ ঘুষ ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ। তবুও দিতে বাধ্য হলাম। ভাবলাম নৈতিকতা, লজ্জা, শরম, বিবেকবোধের এ অবক্ষয় নিরাময়যোগ্য নয়। জিজ্ঞেস করলে ওই কর্মচারী বললেন- তিনি ‘রোজা রেখেছেন’।

ওপরওয়ালারা বড় অঙ্কের টাকা নিয়েই এদের চাকরিতে নিয়োগ দেন। ধারকর্জ করে এরা টাকা দিয়ে চাকরি নেয়। আর আমরা ঘুষ দিয়ে তা পরিশোধ করছি। আজকাল ভালো স্কুল-কলেজে ভর্তি হতেও টাকা লাগে। মা-বাবা বহু কষ্ট করে সন্তানকে পড়ালেখা করান। জমি বিক্রি করে সন্তানকে চাকরি ‘কিনে দেন’। পত্রিকায় দেখলাম, পুলিশের কনস্টেবলের চাকরি নিতেই পাঁচ-ছয় লাখ টাকা লাগে। এরা বেশির ভাগ নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। যখন দেখি পুলিশ হাইজ্যাক করে টাকা আদায় করে, ইয়াবার ব্যবসা করে- তখন ভাবি, প্রশাসনের দুর্নীতি এদের সরলতা ধ্বংস করে অনৈতিক কাজের পথে ঠেলে দিয়েছে। কোনো মানুষকে সম্মান করার পরিবর্তে যদি শুধু ভয় করতে হয় তখন বুঝতে হবে, সে লোকটি তার মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ তো ভীতিকর প্রাণী হওয়ার কথা নয়।

জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যখন রাস্তায় নামেন, তখন যানচলাচল বন্ধ। দেহরক্ষী ও নিরাপত্তা বাহিনীর যুদ্ধংদেহী আচরণ দেখলে হতবাক হতে হয়। শত্রুর সৃষ্টি হয় নিজের অবৈধ কর্ম ও আচরণে। সবচেয়ে বড় কথা- মানুষের অপরাধবোধই তাকে তাড়া করে বেড়ায়। নির্যাতন, নিষ্পেষণ ও অবমূল্যায়ন মানুষকে বেপরোয়া করে তোলে। শেখ সাদী বলেছেন, ‘অত্যাচারিতের আর যখন কোনো উপায় থাকে না, তখন সে ক্ষুরধার তলোয়ারের অগ্রভাগকেও হাত দিয়ে চেপে ধরতে দ্বিধা করে না।’ সদাচার ও সহমর্মিতাই পারে মানুষকে পরস্পরের কাছে টানতে, আপন করে নিতে। পাশব শক্তি পশুত্বের নামান্তর। নিষ্ঠুরতা পৃথিবীকে ধ্বংস ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। তাবৎ সভ্যতা ধ্বংসের নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে অত্যাচার, ব্যভিচার, প্রতিহিংসা এবং সর্বোপরি, অত্যাচারিতের দীর্ঘশ্বাস আর চোখের নোনাজল।

সবচেয়ে রূঢ় সত্য হলো, সাধারণ জনগণের শ্রম ও অর্থে সভ্যতা নির্মিত হয়েছিল। অথচ শাসকেরা ক্ষমতাসীন বা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি যাই হোক, খুব কমই সাধারণ মানুষের প্রতি শোভন আচরণ করেছেন। হাম্বুরাবি, ফেরাউন, অ্যান্টনি, হিটলার, মুসোলিনি- এদের ঔদ্ধত্য ও নিষ্ঠুরতা পৃথিবীকে অনেকটা ধ্বংস করেছে। সিন্ধু অববাহিকার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতার বিনাশে ‘দেবরাজ’ ইন্দ্র, ভরত ও রামচন্দ্র যেভাবে নরহত্যা করেছে- তা ভাবলে গা শিউরে ওঠে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ বা হালের ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, লিবিয়া, মিসর, ইয়েমেন, সিরিয়া, নাইজেরিয়ায় যা চলছে- এতে কি মানুষের সভ্যতা গৌরবময় বলে প্রমাণিত হয়? কাশ্মির, ভারতের ঝাড়খণ্ড ও আসাম, মিয়ানমারের আরাকান, থাইল্যান্ডের পাত্তানি কিংবা এর আগে সংঘটিত গুজরাটের হত্যাকাণ্ড কি প্রমাণ করে মানুষ সভ্য জাতি? বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় বিশেষত সার্বদের মুসলমান হত্যাযজ্ঞ মানবজাতি যেন ভুলেই গেছে।

বসনিয়ার সেব্রেনিসার একটি ঘটনা। ১৯৯৫ সালে সার্বীয় খ্রিষ্টানরা সেখানে মুসলিম ছিটমহলে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছিল। প্রায় আট-নয় হাজার মুসলমান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে অবস্থান করছিল। তাদের পাহারায় ছিল জাতিসঙ্ঘ শান্তিবাহিনী। সার্ব বাহিনীকে সেখানে ঢোকার সময় পথ করে দেয় ডেনমার্কের লোকদের নিয়ে গঠিত শান্তিবাহিনী। তখন সার্বরা সব মুসলমানকে হত্যা করে। তবুও বিশ্বসভ্যতার দাবিদাররা ছিল নীরব। পবিত্র রমজান মাসে গাজা এলাকা থেকে আট শতাধিক নারী ও শিশুকে অপহরণ করেছে ইসরাইলি ইহুদিরা। কথিত সভ্য পৃথিবী টুঁ-শব্দও করেনি তবু। মিসরের বর্তমান শাসক ও ইহুদিদের দালাল জেনারেল সিসি যেভাবে মানুষকে গুলি করে এবং বিচারপ্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসিতে হত্যা করছে, পৃথিবীর সভ্য মানুষেরা এর তেমন প্রতিবাদ করেনি। ‘সভ্যতার আড়তদার’ যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলে সর্বপ্রথম আধুনিক সভ্যতার সম্ভ্রমহানি করেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিরীহ ভিয়েতনামিদের হত্যা করে দ্বিতীয়বার নিষ্ঠুর অসভ্যের খাতায় নাম লিখিয়েছে ওরা। আফগান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যায় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা যা করছে, এতে সভ্যতার সর্বশেষ বস্ত্রও খসে পড়েছে।

মানবজাতি তথা সভ্যতা ধ্বংসের যতগুলো লক্ষণ রয়েছে যেমন আত্মম্ভরিতা, অসহিষ্ণুতা, স্বার্থপরতা, উগ্র সংস্কৃতি, নিষ্ঠুরতা, পারিবারিক সম্পর্কের পতন, ব্যভিচার- সবই এখন ব্যাপক। আবুগারিব কারাগার ও গুয়ানতানামো বন্দিশিবিরে যা ঘটেছে, তাকে কথিত সভ্যতার ক্যান্সার কললেও কম বলা হবে। মানুষ মানুষকে যেভাবে অত্যাচার করে, হিংস্র পশুও যেন এতে লজ্জিত হয়। স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে বন্দীদের সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যা চলছে, তা যারা করছে এসব নিপীড়ক কি আশরাফুল মাখলুকাতের সদস্য? যার অন্যায়-অত্যাচারে নির্দোষ মানুষের চোখের পানি ঝরে, লেজ আর শিং নেই বলেই কি সেই অত্যাচারীকে ‘মানুষ’ বলতে হবে?

প্রচারমাধ্যমে যখন দেখি- নিহত সন্তানের পাশে একজন মায়ের বিলাপ, স্বামীর লাশের পাশে স্ত্রীর কান্না- তখন হত্যাকারীকে পশু ভাবতে হবে। পৃথিবীতে চলছে নীরব গণহত্যা, তার অজুহাত যাই হোক না কেন। কথিত সভ্য মানুষের আচরণ দেখলে মনে হয়, গুহাবাসী মানুষেরাই আমাদের চেয়ে মানবিক গুণে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ছিল। আমাদের চাকচিক্য দেখা গেলেও নিকৃষ্ট স্বভাব বা খাসলতে আমরা ‘আতরাফুল’ মাখলুকাত হয়ে গেছি। মা-বাবা, সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রকৃতির ঋণ শোধে আমরা অক্ষম। আমরা ‘সভ্যতার ঋণখেলাপি’ বর্বর দ্বিপদ প্রাণী। সভ্যতার গর্ব আমাদের মানায় না মোটেও। 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও আয়কর আইনজীবী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.