ঢাকা, শুক্রবার,২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

মতামত

ট্রফি ওয়াইফ মেলানিয়া

মাইকেল উলফ

১৭ জানুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ১৯:০৯ | আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৪:২২


প্রিন্ট
ট্রফি ওয়াইফ মেলানিয়া

ট্রফি ওয়াইফ মেলানিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে লেখা বই ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ প্রকাশের পরই তোলপাড় শুরু হয়েছে মার্কিন মুল্লুকে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক মাইকেল উলফের বইটির প্রকাশনা ঠেকাতে আইনি পদক্ষেপও নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে তাতে কাজ হয়নি। বরং নির্ধারিত তারিখের আগেই গত ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে বইটি। প্রকাশের প্রথম দিনেই শেষ হয়ে যায় সব কপি। অগ্রিম অর্ডার দেয়া হয় দশ লাখ কপির। বইটির চুম্বক অংশ নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। ভাষান্তর করেছেন আহমেদ বায়েজীদ

[পর্ব - ২]

যে প্রার্থী নিজেকে একজন ধনকুবের হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন- এমনকি নিজের সম্পত্তি যা আছে তার চেয়েও দশ গুণ বাড়িয়ে বলতেন, তিনি তার নিজের টাকা নির্বাচনে বিনিয়োগ করতে রাজি হননি। স্টিভ ব্যানন প্রচারণা দলে যোগ দেয়ার পর জ্যারেড কুশনারকে বলেছিলেন, প্রথম আনুষ্ঠানিক বিতর্কের পর আমাদের নির্বাচনের দিন পর্যন্ত প্রচারণা চালাতে আরো পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার লাগবে। সে সময় ব্যানন প্রচারণার দায়িত্ব নেয়ার পরই কুশনার তার স্ত্রী ইভাঙ্কাকে নিয়ে ট্রাম্পের শত্রু ডেভিড গ্রিফিনের সাথে ছুটি কাটাতে ক্রোয়েশিয়ায় ছিলেন।
‘তাকে নির্বাচনে জেতার নিশ্চয়তা না দেয়া পর্যন্ত পাঁচ কোটি ডলার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ জানিয়ে দিলেন কুশনার।
‘আড়াই কোটি?’ জানতে চাইলেন ব্যানন।
‘জয়ের সম্ভাবনার কথা যদি আমরা বলতে পারি, তাহলে।’

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প এক কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিলেন। শর্ত ছিল, তহবিল সংগ্রহ হওয়া মাত্রই সেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। (স্টিভ নুশিন তখন ছিলেন প্রচারণা টিমের অর্থব্যবস্থাপক। তিনি ঋণ সংগ্রহের জন্য কাজ শুরু করেন এবং টেলিফোনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দেন, যাতে তহবিল সংগ্রহ হওয়া মাত্র ঋণ পরিশোধে দেরি না হয়)। বাস্তবতা ছিল এই যে, আসলে ট্রাম্পের পক্ষে প্রকৃত কোনো প্রচারণাই ছিল না। কারণ, সেখানে না ছিল প্রকৃত কোনো সংস্থা কিংবা যা ছিল, তা হলো পুরোপুরিই অকার্যকর কিছু।

শরৎকাল আসতে আসতে ট্রাম্পের যেটুকু জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তাও উড়ে গেল বিলি বুশ (অডিও) কাণ্ডে। ‘আমি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সুন্দরীদের প্রতি টান অনুভব করিÑ আর চুম্বন করতে শুরু করি।’ একের পর এক যৌন কেলেঙ্কারির আলোচনায় দেশব্যাপী ঝড় বয়ে যাওয়ার মধ্যেই এনবিসি টিভির উপস্থাপক বিলি বুশকে খোলা মাইক্রোফোনে এমনটাই বলেছিলেন ট্রাম্প। ‘ঠিক যেন চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যায়, আর চুম্বন করি। কোনো অপেক্ষা ছাড়াই। আর আপনি যদি কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি হন, তাহলে তারা বাধা দেবে না। আপনি যা খুশি করতে পারবেন (এরপর প্রকাশযোগ্য নয়, এমন কিছু কথা)।’ এটি ছিল ভয়াবহ নাটকীয় একটি গোপনীয়তা ফাঁস। বিষয়টি এতই বিব্রতকর ছিল যে, রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যান রেন্স প্রিবাসকে ওয়াশিংটন থেকে নিউ ইয়র্কে ডেকে পাঠানো হয়। ট্রাম্প টাওয়ারে জরুরি বৈঠকের জন্য তাকে ডাকা হয়।

**
বিলি বুশ টেপ প্রকাশের পর যে অপমান সহ্য করতে হয়েছিল, তাতে মেলানিয়া ট্রাম্প বুঝতে পারছিলেন যে, তার স্বামীর আর প্রেসিডেন্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিয়েটি তার আশপাশের সবার কাছেই জটিল মনে হত, বিশেষ করে তার মতো ব্যক্তিগত বিমান কিংবা বেশ কিছু বাড়ি আছে, এমন লোকদের কাছে। তিনি ও মেলানিয়া খুব কম সময়ই একসাথে কাটাতেন। এমনকি এমন দিনও গেছে যে, দু’জনেই ট্রাম্প টাওয়ারে আছেন অথচ সারা দিনে একবারো দেখা হয়নি। প্রায়ই মেলানিয়া জানতেন না ট্রাম্প কোথায় আছেন কিংবা জানার চেষ্টা করতেন না। তার স্বামী হয়তো এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যেতেন, তিনি যেতেন এক ঘর থেকে আরেক ঘরে। স্বামীর খোঁজ রাখার মতো, তার ব্যবসা-বাণিজ্যের খবরও খুব কমই রাখতেন মেলানিয়া।
প্রথম ও দ্বিতীয় সংসারের চার সন্তানের কাছে বাবা হিসেবে ট্রাম্পের কোনো উপস্থিতি ছিল না। মেলানিয়ার সংসারে আসা পঞ্চম সন্তান ব্যারনের ক্ষেত্রে বাবা হিসেবে তিনি ছিলেন আরো বেশি অনুপস্থিত। মেলানিয়ার সাথে ছিল ট্রাম্পের তৃতীয় সংসার। বন্ধুদের বলতেন শেষ পর্যন্ত তিনি ‘বিয়ে নামক শিল্প’টির মর্ম বুঝতে পেরেছেন। সেটি হলো- ‘নিজে বাঁচ এবং তাকে তার মতো বাঁচতে দাও- নিজের কাজ করো।’

নারী বিষয়ে ভয়াবহ রকম অসৎ চরিত্রের ছিলেন ট্রাম্প। নির্বাচনী প্রচারণার সময় সম্ভবত হয়ে ওঠেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নারীলোলুপ ব্যক্তি। যে নারীদের কাছাকাছি আসতেন, তাদের ‘একান্ত সংস্পর্শ’ পাওয়ার জন্য ফন্দি খুঁজতেন। একটি থিওরি নিয়ে তিনি প্রায়ই বন্ধুদের সাথে আলোচনা করতেন তা হলো- কিভাবে একজন বয়সী পুরুষকে কম বয়সী নারী প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে পারেন। তা সত্ত্বেও (মেলানিয়ার সাথে) তার বিয়ে ছিল শুধু নামমাত্র এবং বাস্তব সম্পর্ক থেকে অনেক দূরে। মেলানিয়ার অনুপস্থিতিতে তিনি তার সম্পর্কে অনর্গল কথা বলতেন। তার চাহনি ও অন্যান্য গুণের প্রশংসা করতেন অন্যদের কাছে। আবার সহজ ভঙ্গিমায় তিনি দম্ভভরে লোকদের বলতেন, সে একজন ‘ট্রফি ওয়াইফ’ বা সাজিয়ে রাখার মতো স্ত্রী। মেলানিয়ার সাথে তার জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানাশোনা হয়নি, তাই সেগুলো ভুলভাবে উপস্থাপন করতেন অন্যদের কাছে। আবার এমনও বলতেন, ‘একজন সুখী স্ত্রী হচ্ছে, একটি সুখী জীবন।’

তিনি সব কিছুতে মেলানিয়ার সমর্থন চাইতেন (অবশ্য তিনি তার আশপাশের সব নারীরই সমর্থন চাইতেন)। ২০১৪ সালে যখন প্রথম গুরুত্ব দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার কথা চিন্তা করতে শুরু করেন, মেলানিয়া ছিলেন সে অল্প ক’জন লোকের অন্যতম, যারা ভাবতেন- ট্রাম্প প্রার্থী হলে জিতে যাবেন। কিন্তু কন্যা ইভাঙ্কার কাছে বিষয়টি ছিল কৌতুকের মতো। সে সতর্কতার সাথে ট্রাম্পের প্রচারণা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখত। সৎ মায়ের সাথে ইভাঙ্কার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল না, আবার পুরোপুরি সম্পর্কহীনও ছিল না। বন্ধুদের সে বলত, ‘জানো, মেলানিয়া মনে করেন, বাবা প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলে নিশ্চিত জিতে যাবেন।’

তবে মেলানিয়ার জন্য তার স্বামীর প্রেসিডেন্ট হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল ভয়াবহ একটি বিষয়। তিনি আশঙ্কা করতেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে তার নিরাপদ আশ্রয়ের জীবন শেষ হয়ে যাবে। ট্রাম্পের বিশাল পরিবারের মধ্যে তার এই অবস্থান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মেলানিয়ার সব মনোযোগ ছিল ছেলে ব্যারনকে নিয়ে। তবে এই ভাবনার বিষয়ে নির্বাচনী ব্যস্ততার মধ্যেও ট্রাম্প তাকে বলতেন, ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিও না (অর্থাৎ হওয়ার আগেই চিন্তা করে লাভ কী)। কিন্তু তার যন্ত্রণা বাড়তেই থাকল। ম্যানহাটনে এক প্রচারণায় মেলানিয়াকে নিয়ে নানা কথা হয়। বন্ধুদের মাধ্যমে সেগুলো কানে আসে তার। তার মডেলিং ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। স্লোভেনিয়ায় মেলানিয়া মডেলিং ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। ট্রাম্পের মনোনয়ন লাভের পরই সেখানকার একটি ম্যাগাজিন তার সম্পর্কে কিছু গুজব প্রকাশ করে। ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি মেইল সেগুলো ছড়িয়ে দেয় বিশ্বব্যাপী। নিউ ইয়র্ক পোস্ট পত্রিকার হাতে আসে শুরুর দিকে তোলা কিছু অশ্লীল ছবি। ট্রাম্প মামলা করার পদক্ষেপ নেন।

নভেম্বরের ৮ তারিখে তাদের কাছে সাফল্যের খবর আসতে লাগল। সেদিন রাত ৮টার পর যখন অপ্রত্যাশিত খবর আসতে শুরু করে যে, ট্রাম্প সত্যিই জিততে চলেছেন- ট্রাম্পের ছেলে ডন জুনিয়র তার এক বন্ধুকে বলল- তার বাবার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তিনি ভূত দেখেছেন। যে মেলানিয়াকে ট্রাম্প নিশ্চিত পরাজয় হবে বলে আভাস দিয়েছিলেন, তার চোখ পানিতে ভরে গেল। তবে সেটি আনন্দের অশ্রু ছিল না। ১ ঘণ্টারও কম সময়ে যখন স্টিভ ব্যাননের পর্যবেক্ষণই সত্যি হলো, ট্রাম্প নিজেকে পাল্টে ফেললেন। হতবুদ্ধি ট্রাম্প মুহূর্তে হয়ে গেলেন অবিশ্বাস্য ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। কিন্তু এই চেহারাও পাল্টে শেষ পর্যন্ত আরেকটি রূপ ধরলেন। ট্রাম্প এমন মানুষে পরিণত হলেন, যিনি বিশ্বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যতা তার রয়েছে এবং দায়িত্ব পালনে তিনি পুরোপুরি সমর্থ।

পর্ব : ১

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫