ঢাকা, শুক্রবার,২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

মতামত

ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক : সরে পড়ছে মুখোশ

আসিফ হাসান

১৭ জানুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ১৮:২৬ | আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৪:২৭


প্রিন্ট
ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক : সরে পড়ছে মুখোশ

ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক : সরে পড়ছে মুখোশ

‘বিশেষ উপহার’ নিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী যখন ভারতে নামলেন, তখন নরেন্দ্র মোদি সব রীতিনীতি ভেঙে তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে ছুটে গেলেন। এ দু’জন অবশ্য কোনো সময়ই ভদ্রতার ধার ধারেননি, ভয়ঙ্কর শক্তিতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হতে পিছপা হননি। পরিণতিতে এই গলাগলি উদ্ভব হলেও অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও উপমহাদেশে যেসব আশঙ্কার পদধ্বনি এতদিন শোনা যাচ্ছিল, সেগুলোই এখন অতি আসন্ন বলে তারা প্রকাশ্যেই জানিয়ে দিলেন।

নানা কারণেই নেতানিয়াহুর এবারের ভারত সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর এটি দ্বিতীয় ভারত সফর। কেবল সামরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক অনেক সমীকরণের ওপরও এই সফর প্রবলভাবে প্রভাব ফেলবে। অবশ্য শুরুতেই সামরিক হিসাবটাই সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিগোচর হবে।

সফরের শুরুতেই ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে প্রতিরক্ষা, কৃষি, মহাকাশ প্রযুক্তিসহ ৯টি ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। ভারত ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ওই সমঝোতাগুলো সই হয়। পরে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে অপরের প্রশংসায় মুখর হন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে হওয়া সমঝোতাকে ‘নয়া যুগের সূচনা’ বলে অভিহিত করেন। তিনি এ দিন হিব্রু ভাষায় নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীকে তার প্রথম ভারত সফরের জন্য স্বাগত জানাচ্ছি।
ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে বন্ধুত্ব শক্তিশালী হচ্ছে এবং ইসরাইলের অস্ত্র নির্মাতাদের ভারতে বিনিয়োগ করার জন্য বলা হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানান।

ভারতে ইসরাইল তৃতীয় বৃহত্তর অস্ত্র রফতানিকারক। ২০১৬ সালে দেশটিতে এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে ইসরাইল। ইসরাইলের চেয়ে এগিয়ে আছে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া।
দুই দেশ সন্ত্রাস দমনেও সহযোগিতার ব্যাপারে একমত হয়েছে। সন্ত্রাস দমন চলতি সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে সব বিষয়েই নাক গলানো যায়।
ভারত ও ইসরাইলের মধ্যকার এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে এই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের মাধ্যমে আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, প্রায় রাখঢাকবিহীন মুসলিমবিরোধী বক্তব্য এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা ও ইসরাইলের আগ্রাসীনীতির মিলনে নয়া দিল্লির বিজেপি সরকার সম্ভবত এখন পাকিস্তানের ব্যাপারে আরো কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

পর্দা সরিয়ে নিতে চাইছেন মোদি
ভারত ২৫ বছর আগে ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু তারপর থেকে একজন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীও ইহুদি রাষ্ট্রটি সফর করেননি। মোদি তা করেছেন। মোদি ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভার ফাঁকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সভা হয়েছে। গত নভেম্বরে ইসরাইলি রাষ্ট্রপতি রুভেন রিবলিন প্রথমবারের মতো ভারত সফর করেন। এরপর ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ইসরাইল সফর করেন। পরে হয় প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে সফরের সূচনা। মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসে ইসরাইলের সাথে তার দেশের সম্পর্ক প্রকাশ্যেই আরো খোলামেলা করেছেন, যেটা তার পূর্বসূরিরা রাখঢাক করতেন।

ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের ২৫ বছর
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীরা ঘন ঘন ভারত সফর করেন, বিষয়টি এমন নয়। ২০০৩ সালের পর এটিই কোনো ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর। সেবারও দিল্লির ক্ষমতায় ছিলেন বিজেপি প্রধানমন্ত্রী। এটি কিন্তু কাকতালীয় কোনো ব্যাপার ছিল না। এবার দ্বিতীয় দফাতেও সফরটির সময় বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারই ক্ষমতায় রয়েছে। অটল বিহারি বাজপেয়ী যদি প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ইসরাইলি প্রতিপক্ষকে স্বাগত জানিয়ে থাকেন, তবে নরেন্দ্র মোদি প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত বছর ইসরাইল সফর করেছিলেন।

যদি মনে করা হয়, ভারতের ইসরাইল নীতি পুরোটাই বিজেপিকেন্দ্রিক, তবে ভুল হবে। জওয়াহেরলাল নেহরুই ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর ইসরাইলকে ভারতের কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। নেহরু ইসরাইলে দূতাবাস প্রতিষ্ঠা না করলেও কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসীমা রাও ১৯৯২ সালে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণ করেন।
নরসীমা রাও ওই কাজটি করতে পারতেন না যদি না তার পূর্বসূরি রাজীব গান্ধী ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের ইসরাইলির প্রতি ভারতের রাজনৈতিক বৈরিতার অবসানের কাজ শুরু করতেন। সিপিআইয়ের (এম) দীর্ঘতম নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ২০০০ সালে সরকারি সফরে গিয়েছিলেন ইসরাইলে।

তবে কংগ্রেস-বামপন্থীদের রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার কারণে আগে ইসরাইল-ভারত সম্পর্ক ছিল নিম্নপর্যায়ের। সম্পর্কটি মূলত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক হওয়ায় গোপনীয়তা রক্ষা করা হতো। দুই দেশের মধ্যে বেসামরিক বাণিজ্য মাত্র ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আর গোপন প্রতিরক্ষা বাণিজ্য এর তিনগুণ। প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর মূল্য ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের একক বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক হিসেবে ভারতের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সেটা বাড়ছে। ইসরাইল এখন বিশ্বের শীর্ষ ১০ অস্ত্র রফতানিকারদের অন্যতম। ২০১৪ সালে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনায় গাজায় দুই হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের একটি প্রস্তাবে ভোট দানে বিরত থাকে ভারত। নয়া দিল্লি তার অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়ে বলে, সে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নিয়ে যাওয়ার আহ্বানকে সমর্থন করতে পারে না।

গুজরাট ফ্যাক্টর
তবে মোদির কাছে ইসরাইল অপরিচিত দেশ নয়। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ২০০৮ সালে তিনি দেশটি সফর করেছিলেন। হীরা ব্যবসায়ের মাধ্যমে ইসরাইলের সাথে গুজরাটের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ। ভারত-শ্রীলঙ্কা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৫০-৭০ ভাগ হয় হীরাকেন্দ্রিক। আর গুজরাট ও ইসরাইলের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিমাণ ভারত ও ইসরাইলের চেয়ে বেশি। ভারত হীরা আমদানি করে ও ইসরাইলে রফতানি করে।
হীরা পরিশোধন করার জন্য ভারত ইসরাইলি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বস্তুত, বিশ্বজুড়ে হীরা ব্যবসায় প্রাধান্যকর অবস্থায় রয়েছে ভারত, ইসরাইল ও রাশিয়া। ভারত হলো হীরা আমদানির প্রধান দেশ, রাশিয়া হলো হীরার বৃহত্তম রফতানিকারক দেশ।

অবশ্য ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর মোদি ইসরাইল সফর নিয়ে কোনো তাড়াহুড়া করেননি। সফরে সদাব্যস্ত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরব, ইরান ও কাতার সফর করলেও ইসরাইল এড়িয়ে গেছেন। তবে তিনি ২০১৪ সালে নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করেছেন। ওই সময় নেতানিয়াহু পরামর্শ দিয়েছিলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নিরাপত্তা সরঞ্জামের দিক থেকে ভারতকে ইসরাইল সহায়তা করতে পারে।

এরপর ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালুন ২০১৫ সালে ভারত সফর করেন। ১৯৯২ সালের পর এটাই ছিল ইসরাইলি কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর। ২০০১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলের সাত সার্ভিস প্রধান, সাত ইসরাইলি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ভারত সফর করেছেন। এটা দুই দেশের মধ্যকার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্কের গুরুত্বের বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছে। চলতি বছর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ইসরাইল সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।

ভারত ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে ফ্যালকন অ্যাওয়াক্স কিনেছে। সে ইউএভি, অ্যারোস্ট্যাট নজরদারি রাডার, গ্যালিল স্নাইপার রাইফেল, বারাক অ্যান্টি-মিসাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, পানির নিচে তদারকিব্যবস্থাও কিনেছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ভারত ও ইসরাইল যৌথভাবে দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য মধ্যমপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আজাই শুক্লার মতে, ভারতের কেনাকাটায় ইসরাইলি প্রতিরক্ষা শিল্প চাঙ্গা হচ্ছে। তিনি এ ব্যাপারে ইএলটিএ প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরেন। গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যার প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার ইস্যু তুলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইসরাইলি অস্ত্র রফতানি কমে আসায় ভারতের বাজারের প্রতি ইসরাইলি নির্ভরশীলতা বাড়ছে।

ইসরাইলের কাছে ভারত ছোট বিনিয়োগ স্থান। মাত্র ৫৫.৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে ভারতে। কিন্তু ইসরাইলিরা সীমান্ত নিরাপত্তা নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা, লবণমুক্তকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কৃষি, সেচ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় ভারত প্রতি বছর ২১ মিলিয়ন টন খাবার নষ্ট করে। ইসরাইলি লবণমুক্তকরণ প্রতিষ্ঠান আইডিইর প্লান্ট রয়েছে তামিলনাড়ু ও গুজরাটে। মেকোরটের প্লান্ট রয়েছে মুম্বাইয়ে। রাজস্থানে আছে ইসরাইলি বর্জ্য পানি শোধনাগার।

ভারতীয় ও ভারতীয় কোম্পানিগুলোও ইসরাইলে বিনিয়োগ করছে। জৈন শিল্প গ্রুপ সেচে বিনিয়োগ করেছে। সান ফার্ম গ্রহণ করেছে তারো ফার্মাসিউটিক্যালস। ত্রিবেনি ইঞ্জিনিয়ার্স আকওয়াইজে বর্জ্য পানি কোম্পানি কিনে নিয়েছে। ইনফোসিস, উইপো, টেক মাহিন্দ্রর মতো ভারতীয় বড় আইটি কোম্পানিগুলো ইসরাইলে শাখা প্রতিষ্ঠা করেছে। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫