ঢাকা, শুক্রবার,২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

চট্টগ্রাম

রোহিঙ্গা বসতবাড়িতে ফাঁকা গুলিবর্ষণ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর

গোলাম আজম খান কক্সবাজার (দক্ষিণ)

১৬ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৫:১৪


প্রিন্ট
রোহিঙ্গা বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ফাঁকা গুলিবর্ষণ

রোহিঙ্গা বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ফাঁকা গুলিবর্ষণ

সমঝোতা চুক্তির পরও রাখাইনে রোহিঙ্গা বসতবাড়িতে আগুন দেয়া অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সদস্যরা। মিয়ানমারের সেনারা প্রতি রাতেই বিভিন্ন গ্রামে হানা দিয়ে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। এ ছাড়া প্রতিদিন সেনাদের উৎপাতে আতঙ্ক বিরাজ করছে গ্রামের সর্বত্র। সাদা পোশাকধারী সেনারা লুটপাটও বন্ধ করেনি।

রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে যখন যা পাচ্ছে তা লুট করে নিচ্ছে। অন্য দিকে উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের গাছের নারিকেল, সুপারি, গৃহপালিত হাঁস-মুরগি, মোবাইল সেট, সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল লুট করছে। রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন গত শনিবার রাতে সাদা পোশাকে টহলরত কয়েকজন সেনাসদস্য বুচিডংয়ের নাইক্ষ্যাংদং এলাকায় রোহিঙ্গাদের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এতে অন্তত দু’টি বাড়ি ভস্মীভূত হয়েছে। ওই এলাকার নাজির আলীর ছেলে আবদুল আমিন ও শফিউর রহমানের ছেলে জামাল এখন সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব। সৈন্যদের স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন।

এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় এসে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে রোহিঙ্গাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে সৈন্যরা। সীমন্তের ওপারে সেনা টহল জোরদার করায় এপারে জনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলোতে বিরাজ করছে আতঙ্ক। মিয়ানমার সেনারা রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিনব কৌশল হিসেবে রাখাইনে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জোর করে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন (এনভিসি) কার্ড নিতে বাধ্য করছে। যে কারণে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা এপারে ধেয়ে আসছে।

উখিয়া সীমান্তের আঞ্জুমানপাড়া, ধামনখালী ও ঘুমধুম এলাকা ঘুরে স্থানীয় আবুল বাশার, নুরুল ইসলাম, বখতিয়ার সওদাগর ও মুজিবুল হকসহ বেশ কয়েকজন সচেতন গ্রামবাসী জানান, সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের সেনারা তাদের ইচ্ছামতো টহল ও রাতে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে এলাকায় অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সীমান্তের তুমব্রু কোনারপাড়া জিরো পয়েন্টে অবস্থানরত রোহিঙ্গা নাগরিক দিল মোহাম্মদ, মৌলভী আরফাতসহ একাধিক রোহিঙ্গার অভিযোগ গত এক মাস ধরে সশস্ত্র সেনারা তাদের দেয়া কাঁটাতারের বেড়া পুনর্নির্মাণসহ যাবতীয় সংস্কার কাজের অজুহাতে ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। তারা রাতের যেকোনো সময় এসে সীমান্ত এলাকায় ফাঁকা গুলিবর্ষণ করছে। যে কারণে জিরো পয়েন্টে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা রাতে ঘুমাতে পারে না। আতঙ্কের মধ্যে রাতযাপন করতে হচ্ছে ছেলেমেয়েদের নিয়ে।


কুতুপালং ক্যাম্প ঘুরে সদ্য আগত রোহিঙ্গা সোনা মিয়া (১৮) ও মুজিব উল্লাহ (২৬) জানান, মিয়ানমার সেনারা মংডুর বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকি নিয়ে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে গিয়ে এনভিসি কার্ড নিতে বাধ্য করছে। যারা কার্ড গ্রহণ করছে না তাদের মারধর করছে। বাজারে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে। যে কারণে রোহিঙ্গারা জীবন-জীবিকার সন্ধানে ঘর থেকে বেরোতে পারছেন না। অনন্যোপায় হয়ে এসব রোহিঙ্গা মিয়ানমারের ধনখালী ও নাইক্ষ্যংদিয়া ঘাট হয়ে ফিশিং বোট ভাড়া করে উখিয়ার বিভিন্ন উপকূলে উঠছেন। আইওএমসহ বিভিন্ন এনজিও সংস্থার কর্মীরা এসব রোহিঙ্গাদের উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে পুনর্বাসন করছে। সদ্য আগত রোহিঙ্গারা আরো জানান, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে সে চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক। উপরোন্তু মিয়ানমারে অবস্থানরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গারাও এ দেশে পালিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বালুখালী ক্যাম্পের মাঝি রাকিবুল্লাহ, কুতুপালং ক্যাম্পের মাঝি মুহিবুল্লাহ, কুতুপালং ৬ নম্বর ক্যাম্পের মাঝি আরফাত, কুতুপালং ১ নম্বর ক্যাম্পে মাঝি জাহাঙ্গীর আলমসহ বেশ কয়েক রোহিঙ্গা মাঝির সাথে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলাপ করা হলে তারা জানান, দায়সারা চুক্তি নিয়ে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে না। তবে মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক অধিকারসহ হারানো বসতভিটা ও স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ নিশ্চিত করলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে এক পায়ে খাড়া। তারা জানান, আগামী ২৩ জানুয়ারি প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ ঠিক করা হলেও এ পর্যন্ত কারা মিয়ানমারে ফেরত যাবে সে ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের কেউ জানেন না। তারা জানিয়েছেন, তাদের বসতবাড়ি, জমিজমা ফেরত, ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি নাগরিকত্ব দিলেই তারা নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত যাবেন।

মানবিক সহায়তায় রোহিঙ্গাদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন কাজ চলছে। নতুুন পুরনো মিলে এ পর্যন্ত ১০ লাখ রোহিঙ্গার নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী
ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) রিপোর্ট মোতাবেক, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী মিয়নমার নাগরিকসংখ্যা ৭ লাখেরও বেশি। অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকায় এ সংখ্যা বাড়ছে। ২৫ আগস্ট ২০১৭-এর আগে আসা মিয়ানমার নাগরিকের সংখ্যা দুই লাখ চার হাজার ৬০ জন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫