ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

শিক্ষা

শিক্ষকেরা রাজপথে কেন

আমানুর রহমান

১৬ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৪:২৬


প্রিন্ট
শিক্ষকেরা রাজপথে

শিক্ষকেরা রাজপথে

এমপিওভুক্তি, জাতীয়করণ, টাইম স্কেল ও পদোন্নতি এবং ক্যাডার ও নন-ক্যাডার নিয়ে আন্দোলনে রয়েছেন দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকেরা। শিক্ষকদের এসব দাবি-দাওয়া দীর্ঘ দিনের। নীতিনির্ধারক মহল এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকায় সরকারের মেয়াদের শেষ বছরে এসে দাবির ব্যাপারে সরব-সোচ্চার হয়ে রাজপথে নেমেছে শিক্ষকসমাজ। শিক্ষক সংগঠনগুলো মাঠে নেমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করছে। এদের কেউ কেউ সফল হয়েছেন, এখন অন্যরাও এতে উৎসাহী হয়ে নতুন করে মাঠে নেমেছেন।

শিক্ষকদের এসব দাবি-দাওয়া নিয়ে কিছু জটিলতা সরকারই সৃষ্টি করেছে। বিচ্ছিন্নভাবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলেও সরকার দেশের সবচেয়ে বড় এই পেশাজীবী গোষ্ঠীকে ঠিকভাবে সামাল দিতে না পারায় কেউই এখন আর খুশি নয়। এ কারণে বর্তমান সরকারের নীতি-আদর্শের সমর্থক সংগঠনগুলো মাঠে নেমেছে অথবা যারা মাঠে তাদের নেপথ্যে সমর্থন-সহায়তা করছে।

সারা দেশে বর্তমানে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ রয়েছে ৫ হাজার ২৪২টি। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নয় অথচ পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে আরো ২ হাজারের বেশি এবং কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা লক্ষাধিক। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এমপিওর দাবিতে আমরণ অনশন করে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে বাড়ি ফিরেছেন। এখন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকেরা আমরণ-অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। বৃহস্পতিবার থেকে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরাম। পুলিশি বাধায় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে না পেরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষকেরা। তারা আমরণ অনশন শুরু করেছেন গতকাল।

অন্য দিকে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকেরা টাইম স্কেল ও পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন তারা। আর সরকারি কলেজ শিক্ষকদের ক্যাডার ও নন-ক্যাডার নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তারা। নভেম্বর মাসে সারা দেশে তাদের দুই দিনের কর্মবিরতিতে দেশের সরকারি কলেজগুলোয় অচলাবস্থা বিরাজ করে।

সরকারের মৌখিক আশ্বাসে ৬ থেকে ৮ জানুয়ারি তারা তাদের ঘোষিত তিন দিনের কর্মবিরতি পালন থেকে বিরত ছিলেন। সরকারি কলেজ শিক্ষকদের সংগঠন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি আই কে সেলিমুল্লাহ খন্দকার গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে তাদের কর্মবিরতি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ জারি ও নীতিমালা করা না হলে আবার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

২৬ হাজার নিবন্থিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেভাবে জাতীয়করণ করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে সংযুক্ত ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণ, শিক্ষকদের বেতন স্কেল সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের মতো করাসহ কয়েকটি দাবিতে ওই সব মাদরাসার শিক্ষক আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। বর্তমানে সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদরাসা আছে ৯ হাজার ৩৫৫টি। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক সমিতির দাবি অনুযায়ী তাদের মাদরাসার সংখ্যা ১৮ হাজার ১৯৪টি। শিক্ষক সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ৭২ হাজার। সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকসংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার।

মাদরাসা বোর্ডের ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৬ হাজার ৯৯৮টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা রয়েছে। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার মধ্যে এক হাজার ৫১৯টি মাদরাসার ৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষক সরকার থেকে ভাতা পান। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকেরা পান মাসে আড়াই হাজার টাকা ও সহকারী শিক্ষকেরা পাচ্ছেন ২ হাজার ৩০০ টাকা। এ ভাতা বর্তমান আর্থিক প্রেক্ষাপটে কতটুকু যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওইসব শিক্ষক। তারা সব শিক্ষকের জন্য সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের মতো বেতন-ভাতার দাবি করছেন।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি কাজী রুহুল আমিন চৌধুরী বলেন, ৩৩ বছর ধরে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক সরকারির বেতনভাতা বঞ্চিত রয়েছেন। যারা যৎসামান্য পাচ্ছেন তাও পাচ্ছেন তিন মাস পর পর। নিবন্ধিত প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ করা হলেও ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোকে বঞ্চিত করা হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা বাড়ি ফিরবেন না।

দেশের সব মাধ্যমিক ও নি¤œ মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা গত বৃহস্পতিবার থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের ব্যানারে এ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আগামী ১৫-১৬ জানুয়ারি থেকে তারাও আমরণ অনশনে যাবেন বলে জানান ফোরামের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম রনি। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে সরকার সমর্থক শিক্ষক সংগঠন স্বাধীনতা শিক্ষক কর্মচারী ফেডারেশন কর্মসূচি ঘোষণা করেছ্ েগত ১১ জানুয়ারি। দেশের সব ক’টি শিক্ষক সংগঠন মাধ্যমিক ও নি¤œ মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে সোচ্চার। তারাও বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসূচি পালন করছে। এসব সংগঠনের দাবি হচ্ছে, মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

দেশে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৩৭ হাজার। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় পাঁচ লাখ। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সাড়ে ২৬ হাজার; ৪ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকার থেকে মূল বেতন ও কিছু ভাতা পান। তাদের এমপিওভুক্ত শিক্ষক বলা হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রায় সব সংগঠন এখন শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে ধাপে ধাপে আন্দোলন করে আসছে।

প্রবীণ শিক্ষক নেতা মাজহারুল হান্নান বলেন, সরকার যে টাকা দেয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যে আয় হয়, তার সাথে আর কিছু টাকার সংস্থান হলে জাতীয়করণ করা সম্ভব। সুপরিকল্পিতভাবে শিক্ষাকে জাতীয়করণের দাবি জানান তিনি। প্রায় একই কথা বলেন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়া।

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫