ঢাকা, শুক্রবার,২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

রাজশাহী

চলনবিলের শুঁটকি কেন বিদেশেও জনপ্রিয়

এস এম আলাউদ্দিন পাবনা

১৬ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৩:৫৭


প্রিন্ট
চলনবিলের শুঁটকি রফতানির জন্য বস্তায় ভরছেন শ্রমিকেরা : নয়া দিগন্ত

চলনবিলের শুঁটকি রফতানির জন্য বস্তায় ভরছেন শ্রমিকেরা : নয়া দিগন্ত

শুঁটকি মাছের ব্যবসায় চলনবিল এলাকার অনেক মানুষের ভাগ্য বদলে গেছে। দারিদ্র্যের খোলস থেকে বেরিয়ে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছে গত কয়েক বছরে। এসব এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক উন্ননয়ন ঘটেছে। এই বিলের শুঁটকি মাছ সুস্বাদু হওয়ায় দেশে-বিদেশে এর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই মাছ বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, চীন, মিয়ানমার, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ২৬টি দেশে রফতানি হচ্ছে।

এই মওসুমে মাছ শুকানোর জন্য তিন শতাধিক অস্থায়ী চাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। শুকানো শেষ হলেই চাতাল থেকেই এসব মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছে বড় বড় ব্যবসায়ী। এসব ব্যবসায়ী এখান থেকে শুঁটকি ঢাকার কাওরান বাজারে নিয়ে রফতানি করে বিভিন্ন দেশে। এতে অর্জিত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।

চলনবিলে দেখা যায়, সূর্যোদয় থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্তÍ সূর্যের তাপকে কাজে লাগাতে ব্যস্ত শত শত নারী -পুরুষ। তাদের দম ফেলার সময় নেই। পাবনা সিরাজগঞ্জ নাটোর এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত দেশের বৃহত্তম এই চলনবিল। এই বিল মিঠাপানির মৎস্যভাণ্ডার নামে পরিচিত। বিলে এখন চলছে মাছ ধরার উৎসব। বর্ষার পানি কমার সাথে সাথে প্রচুর মাছ ধরা পড়ে জেলেদের জালে। তার পর থেকেই চাতালে মাছ শুকানোর মওসুম শুরু হয়েছে। মাছ বিক্রি করে পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে বিলাঞ্চলের ব্যবসায়ী, জেলে ও নারী-পুরুষ এখন মাছ ধরা ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

পাবনা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলনবিলে রয়েছে মোট এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, চার হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট ১৬টি নদী ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট ২২টি খাল এবং অসংখ্য বড় বড় জলাশয়। চলতি মওসুমে ১০০ কোটি টাকার ২৬০ থেকে ৩১০ টন শুঁটকি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এবার বিলে মাছের পরিমাণ বেশি থাকায় শুঁটকির উৎপাদনও বেশি হবে।

মাছ শুঁটকি শেষে এ, বি ও সি গ্রেডে বাছাই করা হয়। এ গ্রেডের শুঁটকি মাছ ভারত, পাকিস্তান, চীন, মিয়ানমারা, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, কাতার, ওমান, বাহরাইন, নেপাল, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়াসহ ২৬টি দেশে রফতানি করা হয়। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে চলনবিলের সুস্বাদু শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া সি ও বি গ্রেডের শুঁটকি মাছ দিনাজপুর, সৈয়দপুর, নীলফামারী, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। চলনবিল অঞ্চলের তিন হাজারের অধিক পরিবার শুঁটকি মাছ তৈরির কাজে জড়িত রয়েছে।

চাটমোহরের শুঁটকি ব্যবসায়ী আলমাছ প্রামাণিক জানান, চলনবিলের শুঁটকি মাছের স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় দেশ-বিদেশে এর চাহিদা বেশি। আশ্বিন মাস থেকে শুঁটকির চাতালে মাছ শুকানো শুরু হয়েছে। অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত চলে শুকানোর কাজ। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শুঁটকি ব্যবসায়ীরা মাছ শুকানোর চাতাল তৈরি করেছে। এ ব্যবসায় শুরু করতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা পুঁজির প্রয়োজন হয়।

গুরুদাসপুর শুঁটকি ব্যবসায়ী মাহমুদ জানান, পানি কমতে থাকলে বিলের বিভিন্ন স্থানে সোঁতিজাল পাতা হয়। জালে ধরা পড়ে পুঁটি, খলসে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, গুচি, বাইম, তিনকাটা, তেলাপী, কাতল, বোয়ালসহ নানা জাতের মাছ। এসব মাছ চাতালে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। ২০০ টাকা থেকে এক হাজার ২০০ টাকা দরে প্রতি কেজি শুঁটকি মাছ বিক্রি করা হয়।
শুঁটকি তৈরির কাজে নিয়োজিত শ্রমিক রমজান আলী, রহমান সেখ, আব্দুল কাদের, সবিতা রাণী, তাহমিনা বেগম, তছলিমা খাতুন জানান, তিন কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে এক কেজি শুঁটকি মাছ তৈরি হয়। যত বেশি শুকানো হয় তত ওজন কমে যায়। আর যেটা বেশি শুকানো হয় সেটা সহজে নষ্ট হয় না। কম শুকানো মাছ দেশে বিক্রি হয় আর বেশি শুকানো মাছ বিদেশে রফতানি করা হয়। এগুলোর দামও অনেক বেশি হয়।

তবে আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি এ ব্যবসায় ঝুঁকিও অনেক বেশি। ঠিকমতো পরিচর্চা করতে না পারলে শুঁটকি মাছে পোকা লেগে নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া আবহাওয়া খারাপ হলে, রোদ না থাকলে বিপদে পড়তে হয়। গত কয়েক দিনে রোদ না থাকায় মহা বিপাকে পড়েছে শুঁটকি মাছ ব্যবাসয়ীরা। অনেক মাছে পচন ধরে গেছে। মাছ ধরার পরই না শুকাতে পারলে সেসব মাছ নষ্ট হয়ে যায়। কারণ এই অঞ্চলে কোনো মাছ সংরক্ষণাগার নেই। সরকার একটি মাছ সংরক্ষণাগার করে দিলে এই অঞ্চলের মাছ চাষিরা যেমন লাভবান হতো তেমনি শুঁটকি রফতানি করে আরো অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। এমনটিই মনে করে শুঁটকি ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫