ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

ইতিহাস-ঐতিহ্য

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনীদের সম্পদ ছিল কত?

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১৫ জানুয়ারি ২০১৮,সোমবার, ১৮:৩৭ | আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৫:৪৫


প্রিন্ট
 সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনীদের সম্পদ ছিল কত?

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনীদের সম্পদ ছিল কত?

অতীতের কোনো রাজা কিংবা ব্যবসায়ী কত সম্পত্তির অধিকারী ছিলেন তা নির্ণয় করার কঠিন কাজ করেছে মানি ম্যাগাজিন। কয়েক শ’ ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবীদের সাথে পরামর্শ করে অতীতের অর্থনৈতিক চালচিত্র, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, মুদ্রাস্ফীতি, জিডিপি কেমন ছিল তা’ বিবেচনা করে সর্বকালের সেরার তালিকাটি বানিয়েছে ম্যাগাজিনটি।

প্রথম মানসা মুসা: ‘মানি’ ম্যাগাজিনের তালিকায় বিশ্বের সর্বকালের সেরা ধনীর তকমা পেয়েছেন তিমবুক্তুর রাজা মানসা মুসা। তার জন্ম ১২৮০ সালে এবং মৃত্যু ১৩৩৭ সালে মালিতে। তার সম্পদ ছিল অঢেল। তার হাতে যত সম্পদ ছিল, ইতিহাসে কোনো কালে আর কারো কাছে ছিল না। আধুনিক মালি তিমবুক্তু নামে পরিচিত ছিল। সে সময় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সোনা উৎপাদন করত পশ্চিম আফ্রিকার রাজ্যের দেশ তিমবুক্তু। ওই সময় বিশ্বে সোনার দাম ছিল সবচেয়ে বেশি। তাকে নিয়ে গল্প প্রচলিত রয়েছে, যখন দলবল নিয়ে মুসা মক্কায় হজে যেতেন তখন তিনি এতই বেশি খরচ করতেন যে; তাতে মিশরে মুদ্রা সংকট দেখা দিত। এক হজযাত্রায় মুসার বহরে থাকা অর্ধশতাধিক উটের পিঠে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কয়েকশ’ পাউন্ড ওজনের স্বর্ণ। মুসার সৈন্যবাহিনী গঠিত ছিল প্রায় ২ লাখ মানুষ নিয়ে। এর মধ্যে ৪০ হাজার ছিল তীরন্দাজ (যারা তীর ধনুক চালাতে পারদর্শী)। তার বাহিনী ছিল আধুনিত অস্ত্রসস্ত্রে সুসজ্জিত। ওই সময় তার সঙ্গে কেউ লড়াই করার সাহস পেত না। তার রাজপ্রাসাদ ছিল সোনা দিয়ে মোড়ানো। মুসা যতোটা ধনী ছিলেন- ততটা ধনী হওয়ার বিষয়ে সে সময়ে অন্য কারো জন্য অসম্ভব এবং কল্পনাতীত ছিল।

দ্বিতীয় অগাস্টাস সিজার : অগাস্টাস সিজার খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ থেকে ১৪ সাল পর্যন্ত শাসন করেছেন। তিনি পুরো মিসর নিজের সম্পত্তি মনে করতেন। সিজার কেবল শাসনের দিক দিয়েই দক্ষ ছিলেন না। রোম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শুধু নিজ সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটাতে মনোযোগী ছিলেন না। একইসঙ্গে সাম্রাজ্যের আয়-রোজগারের দিকেও নজর ছিল এই মহান বীরের। বিশ্ব জিডিপির প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ সম্পদ নিয়ে তিনি রাজ্য শাসন করতেন। শাসনের এক পর্যায়ে সাম্রাজ্যের মোট অর্থনীতির এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন করেছিলেন তিনি, যা ২০১৪ সালের বাজারমূল্যে ৪.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য।

তৃতীয় সম্রাট শেনজং: সম্রাট শেনজং চীনের সং রাজবংশের সদস্য ছিলেন। তার সময় চীনের জিডিপি ছিল বিশ্বের ২৫ থেকে ৩০ ভাগ।সর্বকালের সেরা ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা সম্রাট শেনজং এর জন্ম ১০৪৮ সালে এবং মৃত্যু ১০৮৫ সালে। বিশ্ব জিডিপির ২৫-৩০ শতাংশ নিয়ে সাম্রাজ্য শাসন করতেন। সাম্রাজ্যের অর্থ অর্জিত হতো প্রযুক্তি পণ্য বিক্রি এবং কর আদায় থেকে। জনগণের কাছ থেকে কর আদায়ে শাসকের ছিল অন্তিম দক্ষতা। ওই সময় শেনজংয়ের নিজ দেশের শাসনসহ পুরো অর্থনীতির উপর ব্যপক নিয়ন্ত্রণ ছিল।

চতুর্থ সম্রাট আকবর: মোগল সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ অধিপতি সম্রাট আকবরের সময় ভারতবর্ষে যে জিডিপি ছিল তা বিশ্বের ২৫ ভাগ। এই মুগল বাদশাহ সে সময় বিশ্বের ২৫ শতাংশ জিডিপি’র মালিক ছিলেন অর্থাৎ সারা বিশ্বের মোট আয়ের এক-চতুর্থাংশের মালিক ছিলেন। জনগণের থেকে কর সংগ্রহে দক্ষতাও দেখিয়েছিলেন। জনগণের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের দিক থেকে মোগল সাম্রাজ্য ছিল ইতিহাসের অন্যতম সফল সাম্রাজ্য।

পঞ্চম যোশেফ স্ট্যালিন: সোভিয়েত ইউনিয়নের লৌহমানব যোশেফ স্ট্যালিন বৈশ্বিক ৯.৬ শতাংশ জিডিপির অধিকারী দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্রবল প্রতাপশালী স্তালিন ছিলেন একজন স্বৈরশাসক এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের মোট সম্পদ থেকে স্তালিনের মোট সম্পত্তি পৃথক করা দৃশ্যত অসম্ভব হলেও এই দুইয়ের মিশেলের কারণেই বিশেষজ্ঞরা তাকে সর্বকালের সেরা অন্যতম ধনী ব্যক্তি হিসেবে মনোনীত করে থাকেন।

৬ষ্ঠ অ্যান্ড্রু কার্নেগি: মার্কিন নাগরিক অ্যান্ড্রু কার্নেগি ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম ধনী মানুষ। ১৯০১ সাল এই স্কটিশ অভিবাসী তার প্রতিষ্ঠান ইউএস স্টিল কোম্পানি ৪৮০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেন জেপি মর্গ্যানের কাছে। এই অর্থ তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জিডিপি’র ২.১ শতাংশ ছিল। ২০১৪ সালের মূল্যমানে অ্যান্ড্রু কার্নেগির সম্পদের মূল্য দাঁড়ায় ৩৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সপ্তম জন ডি রকফেলার : ১৮৬৩ সালে তেল শিল্পে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছিলেন জন ডি রকফেলার এবং ১৮৮০ সাল নাগাদ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল। এই কোম্পানি ১৮৮০-এর দশকে আমেরিকার তেল উৎপাদনের ৯০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করত। তার নিট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১.৫ বিলিয়ন ডলার, যা গোটা দেশটির মোট আয়ের দুই শতাংশ ছিল।। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী তা ৩৪১ বিলিয়ন ডলার। সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ টানতে সক্ষম হয়েছিলেন রকফেলার। রকফেলার

অষ্টম অ্যালান রুফুস (অ্যালেন দি রেড): অ্যালন দি রেড ছিলেন ইংল্যান্ডের উইলিয়াম দি কনকোয়ারের ভাতিজা। সম্রাট উইলিয়ামের ভাতিজা রুফুস ইংল্যান্ড বিজয়ে নরম্যানদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন চাচার বাহিনীতে অংশ নেয়ার মাধ্যমে। মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন ১১ হাজার পাউন্ডের মালিক। সে সময় এই ১১ হাজার পাউন্ড ছিল তৎকালীন ইংল্যান্ডের মোট জিডিপি’র সাত শতাংশ। তখনকার ১১ হাজার পাউন্ড ২০১৪ সালের বাজারমূল্যে ১৯৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।

নবম বিল গেটস: মার্কিন নাগরিক বিল গেটস মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ফোর্বেসের হিসাব অনুযায়ী তার সম্পদের মূল্য ৭৮.৯ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের সর্বকালের ধনীতম ব্যক্তিত্বের তালিকার তিনিই একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। জীবিত বলেই ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র বিল গেটসের সম্পদেরই সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব।

দশম চেঙ্গিস খান: মঙ্গলিয়ার রাজা চেঙ্গিস খান ছিলেন বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম বিজয়ী সামরিক শাসক। এই মোঙ্গল শাসক বেঁচেছিলেন ১১৬২ থেকে ১২২৭ সাল পর্যন্ত। তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ভূখণ্ডের মালিক বা বিশালায়তন সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। মঙ্গল সাম্রাজ্যের এ শাসকের নিয়ন্ত্রণ ছিল চীন থেকে শুরু করে সুদূর ইউরোপ অবধি। তবে তার হাতে নগদ অর্থ তেমন ছিল না। তিনি কখনই সম্পদ আহরণ বা মজুদ করতেন না। চেঙ্গিস খাঁর প্রভাবের চাবিকাঠিই ছিল তার উদারতা। তার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল লুণ্ঠনকৃত সম্পত্তি নিজের সৈনিক ও সেনাপতিদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়া। মঙ্গল সৈনিকরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে লুটপাট করত না। কোনো অঞ্চল দখলে সফল হওয়ার পর সেখানকার প্রতিটি জিনিসের একটি তালিকা তৈরি করতেন সরকারি কর্মচারীরা এবং তারপর তালিকা অনুসারে সেগুলো সেনাবাহিনী ও তাদের পরিবারের মধ্যে বণ্টন করা হতো। এরপর অবশিষ্ট যা কিছু চেঙ্গিস খাঁর ভাগে পড়তো, সেগুলো দিয়ে তার ধনী হওয়া খুব একটা সম্ভবপর নয়। নিজের কিংবা নিজ পরিবারের জন্য চেঙ্গিস খাঁ কোনো প্রাসাদ, কোনো মন্দির, কোনো দরবার, কোনো সমাধি, এমনকি কোনো বাড়িও নির্মাণ করেননি। তবে ভূমির মালিক হিসেবে টাইম ম্যাগাজিন তাকে ১০ম ধনী লোক হিসেবে অভিহিত করেছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫