বিয়ে নিয়ে প্রতারণা ও আইনগত প্রতিকার
বিয়ে নিয়ে প্রতারণা ও আইনগত প্রতিকার

আগের বিয়ে গোপন করে বিয়ে করলে কী হবে?

সিরাজ প্রামাণিক

ডি এফ মোল্লা তার ‘মুসলিম আইনের মূলনীতি’ বইয়ে বিয়ের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন ‘বিবাহ বা নিকাহ এমন একটি চুক্তি যার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য হলো- বৈধভাবে সন্তান লাভ ও প্রতিপালন। বিচারপতি মাহমুদ তার ‘আ: কাদির ও সালিশি মোকদ্দমার রায়ে বলেছেন ‘মুসলিম বিবাহ কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, একটি বিশুদ্ধ দেওয়ানি চুক্তি যার উদ্দেশ্য- পারিবারিক জীবনযাপন ও বৈধসন্তান দান। উপরোল্লিখিত দু’টি সংজ্ঞা থেকে আমরা বলতে পারি, সম্ভোগ ও সন্তানদের বৈধ করণার্থে যে চুক্তি সম্পাদিত হয় তাকে বিবাহ বলে।

দণ্ডবিধির ৪৯৩ ধারা থেকে ৪৯৬ ধারা পর্যন্ত বিয়েসংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান আছে, যার বেশির ভাগ অপরাধই জামিনের অযোগ্য।

প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করলে ১০ বছর কারাদণ্ড : ধারা ৪৯৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস করান; কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে না হয় এবং ওই নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

স্বামী বা স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও বিয়ে করলে ৭ বছর কারাদণ্ড : ৪৯৪ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি এক স্বামী বা এক স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও আবার বিয়ে করেন, তাহলে দায়ী ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
তবে যে সাবেক স্বামী বা স্ত্রীর জীবদ্দশায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, বিয়ের সময় পর্যন্ত সে স্বামী বা স্ত্রী যদি সাত বছর পর্যন্ত নিখোঁজ থাকেন এবং সেই ব্যক্তি বেঁচে আছেন বলে কোনো সংবাদ না পান, তাহলে এ ধারার আওতায় তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধী বলে গণ্য হবেন না।

দ্বিতীয় বিয়ে করলে ও আগের বিয়ে গোপন রাখলে শাস্তি ১০ বছর : ৪৯৫ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়ে করার সময় প্রথম বা আগের বিয়ের তথ্য গোপন রাখেন, তা যদি দ্বিতীয় বিবাহিত ব্যক্তি জানতে পারেন, তাহলে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

আইনসম্মত বিয়ে না হলে সাত বছর জেল : ৪৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি আইনসম্মত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত প্রতারণামূলকভাবে বিয়ে সম্পন্ন করেন, তাহলে অপরাধী সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

স্বামীর অজ্ঞাতে মেলামেশা করলে সাত বছর জেল : ৪৯৭ ধারায় ব্যভিচারের শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো নারীর সাথে তার স্বামীর সম্মতি ছাড়া যৌনসঙ্গম করেন ও অনুরূপ যৌনসঙ্গম যদি ধর্ষণের অপরাধ না হয়, তাহলে সে ব্যক্তি ব্যভিচারের দায়ে দায়ী হবেন, যার শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডসহ উভয় দণ্ড। এ ক্ষেত্রে নির্যাতিতাকে অন্য লোকের স্ত্রী হতে হবে। তবে ব্যভিচারের ক্ষেত্রে স্ত্রী লোকের কোনো শাস্তির বিধান আইনে নেই।

ফুঁসলিয়ে কোনো বিবাহিত মহিলাকে নিয়ে গেলে দুই বছরের জেল : ৪৯৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিবাহিত নারীকে অন্যের স্ত্রী জানা সত্ত্বেও ফুঁসলিয়ে বা প্ররোচনার মাধ্যমে যৌনসঙ্গম করার উদ্দেশ্যে কোথাও নিয়ে যাওয়া এবং তাকে অপরাধজনক উদ্দেশ্যে আটক রাখা অপরাধ। এ ধারা অনুযায়ী অপরাধী ব্যক্তি দুই বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডসহ উভয় ধরনের শাস্তি পাবে।

প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে এক বছরের জেল : কোনো মুসলমান ব্যক্তি প্রথম স্ত্রী থাকলে সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া এবং প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করেন, তিনি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ (৫) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করবেন। অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হলে ওই ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

অনুমতির জন্য ফি দিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের অনুমতি দিতে যেসব বিষয়ের প্রতি বিবেচনা করা হবে, এর মধ্যে অন্যতম হলো- ০১. বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব, ০২. শারীরিক মারাত্মক দুর্বলতা, ০৩. দাম্পত্য জীবনসম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা, ০৪. দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য আদালতের কোনো আদেশ বর্জন, ০৫. মানসিকভাবে অসুস্থতা ইত্যাদি। উল্লেখ্য, সালিশি পরিষদে যদি বর্তমান স্ত্রী অনুমতি না দেন তাহলে কোনোভাবেই দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না।

দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে প্রথম স্ত্রী যদি সন্তানদের নিয়ে আলাদাভাবে বসবাস করেন তবুও স্বামীকে প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে হবে। স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে স্বামী আইনত বাধ্য থাকবে। ভরণপোষণ ছাড়াও স্ত্রী ও সন্তানরা উত্তরাধিকারীর অধিকার লাভ করবেন এবং মোহরানার টাকা পরিশোধ করা না হলে বকেয়া ভূমি রাজস্ব আদায়ের মতো আদায় করা হবে।

এমনকি আগের স্ত্রী তার স্বামীর থেকে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী ভুক্তভোগী ওই স্ত্রী তার এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

কোথায় কিভাবে আইনের আশ্রয় নিতে হবে : বিয়েসংক্রান্ত অপরাধের জন্য অভিযোগ থানা বা আদালতে গিয়ে চাওয়া যাবে। থানায় এজাহার হিসেবে মামলা করতে হবে। যদি মামলা না নিতে চায় তাহলে সরাসরি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে মামলা করা যাবে। কেউ কেউ থানায় না গিয়ে সরাসরি আদালতে মামলা করে থাকেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। আদালতে মামলা করার সময় যথাযথ প্রমাণসহ অভিযোগের স্পষ্ট বর্ণনা দিতে হবে এবং সাক্ষীদের নাম-ঠিকানাও দিতে হবে।

আদালত অভিযোগকারীর জবানবন্দী গ্রহণ করে যেকোনো আদেশ দিতে পারেন। অনেক সময় অভিযোগ আমলে না নিয়ে প্রাথমিক তদন্তের জন্য নির্দেশ দিতে পারেন।

কেউ যদি স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয়ে নিজেদের অন্তরঙ্গ ছবি ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে অথচ আদৌ কোনো বিয়ে সম্পন্ন হয়নি তাহলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা করার সুযোগ আছে এবং এ মামলা থানায় করতে হবে। এ ছাড়া ভুয়া কাবিননামা তৈরি করলে জালিয়াতির অভিযোগও আনা যাবে।

যে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে : বিয়ে যেভাবেই সম্পন্ন হোক না কেন, কাবিননামা কিংবা বিয়ের সব দলিল নিজের কাছে রাখা উচিত। কাবিননামার ওপর কাজীর সিল-স্বাক্ষর আছে কি না যাচাই করে নিতে হবে এবং কোন কাজীর মাধ্যমে বিয়েটি সম্পন্ন হলো তার সাথে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করে নেয়া ভালো। মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এটা স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই মনে রাখতে হবে। বর্তমানে হিন্দু বিয়ের নিবন্ধনও ঐচ্ছিক করা হয়েছে। বিয়ের হলফনামা করা থাকলে তাও সংগ্রহে রাখতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
Email: seraj.pramanik@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.