ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

ইতিহাস-ঐতিহ্য

পুরান ঢাকার ‘সাকরাইন’ উৎসব

নাজমুল হোসেন

১৫ জানুয়ারি ২০১৮,সোমবার, ১৭:৪২


প্রিন্ট

পঞ্জিকামতে বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন উদযাপন করা হয় পৌষসংক্রান্তি। বর্তমানে ‘পৌষসংক্রান্তি’ শুধু ‘সংক্রান্তি’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে; আর পুরান ঢাকার মানুষ একে বলে ‘সাকরাইন’। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘সাকরাইন’ উৎসবে পৌষসংক্রান্তি ও মাঘ মাসের শুরুর দিনটিতে আগুন নিয়ে খেলা ও আতশবাজির মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রথম প্রহর। ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে মুখরিত হয় প্রতিটি বাড়ির ছাদ। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ে আকাশে ঘুড়ির সংখ্যা ও উৎসবের মুখরতা। সাকরাইন উপলক্ষে আয়োজন করা হয় পুরান ঢাকার নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবারের। লিখেছেন নাজমুল হোসেন

সাকরাইন উপলক্ষে পুরান ঢাকার আকাশে শোভা পায় নানা রঙ আর বাহারি আকৃতির ঘুড়ি। এ ছাড়াও আগুন নিয়ে খেলা, আতশবাজি ফোটানো এ উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ। তবে সকালের তুলনায় বিকালে এ উৎসব বেশি মুখরিত হয়। সাকরাইন উৎসবকে পৌষসংক্রান্তি বা ঘুড়ি উৎসবও বলা হয়। এ উৎসবে অংশ নেন সব ধর্ম, পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ।

‘সাকরাইন’-এর আদি কথা
ঢাকায় পৌষসংক্রান্তির এ দিনকে বলা হয় সাকরাইন। ঢাকাই ভাষায় ‘হাকরাইন’। আদি ঢাকাই লোকদের পিঠাপুলি খাবার উপলক্ষ আর সাথে ঘুড়ি উড়াবার প্রতিযোগিতার দিন। সাকরাইন একান্তই ঢাকার, যুগের পরিক্রমায় তাদের নিজস্ব উৎসব। এটা বাংলাদেশের কোথাও পালিত হয় না। যা ঢাকার জনপ্রিয় ও দীর্ঘ সাংস্কৃতিক চর্চার ফল।
সাকরাইন শব্দটি সংস্কৃত শব্দ সংক্রাণ থেকে এসেছে। আভিধানিক অর্থ : বিশেষ মুহূর্ত। অর্থাৎ বিশেষ মুহূর্তকে সামনে রেখে যে উৎসব পালিত হয় তাকেই বলা হয় সাকরাইন। এই সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনেক দেশেই এই উৎসব পালন করে। তবে ভিন্ন ভিন্ন নামে। এই উৎসবের দুটো দিক আছে। একটি ধর্মীয় অপরটি সাংস্কৃতিক।

ভারতীয় জোতিষশাস্ত্র মতে, রাশিচক্র অনুযায়ী ১২টি রাশির ১২টি সংক্রান্তি আছে। এরূপ মকরসংক্রান্তি সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়ে থাকে। মকর সংক্রান্তি হলো সেই ক্ষণ যাকে ঘিরে এ উৎসব পালিত হয়। সংক্রান্তির এই উদযাপন কবে থেকে চলে আসছে তা সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। হতে পারে হাজার বা তারও আগের পুরনো এ মকর সংক্রান্তির মহাতিথি। হিন্দুশাস্ত্র বলে, মহাভারতের সব অশুভ শক্তির বিনাশ হয়ে শুভ শক্তির উদয় হয়েছিল। তাই মানা হয়ে থাকে। অন্য মতে, মকর রাশির দেবতা শনির বাড়ি এক মাসের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলেন। তাই দিনটি বাবা-ছেলের সম্পর্কের একটা বিশেষ দিন হিসেবে ধরা হয়। তবে বিজ্ঞান অনুযায়ী, সূর্যের গতি দুই প্রকার। উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন। ২১ ডিসেম্বর সূর্য উত্তরায়ণ থেকে দক্ষিণায়নে প্রবেশ করে। এদিন রাত সব থেকে বড় হয় আর দিন সব থেকে ছোট। এরপর থেকে দিন বড় আর রাত ছোট হতে শুরু করে। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছয় মাস উত্তরায়ণ আবার শ্রাবণ থেকে পৌষমাস পর্যন্ত ছয় মাস দক্ষিণায়ন। পৌষ মাসের এই সংক্রান্তিকে বলা হয় উত্তর বা মকর সংক্রান্তি। সূর্য এদিন ধনুরাশি থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে, যা থেকেই মকর সংক্রান্তির উৎপত্তি।

সব ধর্মেই চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রের প্রভাব আছে। তাদের জীবন, আচার, সংস্কার, বিশ্বাস ও উৎসব- এগুলোর প্রভাবাধীন। ধর্মীয়ভাবে ঢাকার হিন্দুরা বিশেষত্ব শাঁখারিবাজারের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত না খেয়ে থাকেন। কেউ মাঘের প্রথম দিন বাসার কাছে খোলা জায়গায় পৌষ সংক্রান্তির পূজা করে গুচ্ছ কাঠের গুঁড়িতে আগুন জ্বালিয়ে। নানা রকমের শাড়ি জড়িদার কাপড় পড়ে ছোটবড় সব বয়সের নারীরা আগুনের চারদিকে পূজাসামগ্রী সাজিয়ে বসে বুড়াবুড়ির পূজা উৎযাপন করে পৌষ মাসকে বিদায় জানিয়ে মাঘকে গ্রহণ করতেন। মকর সংক্রান্তি বা পৌষ মাসের শেষ দিন হিন্দু জমিদারেরা তাদের জমিদারিতে ব্রাহ্মণ ও প্রজাদের আতিথেয়তা দেন। উন্মুক্ত মাঠে ভোজ উৎসব হয়। বিতরণ করা হয় চাল, গুড়, তেলের তৈরি পিঠা ও ডাবের পানি। এটি বাস্তু পূজা নামে পরিচিত। এ উপলক্ষে বিক্রমপুরে কুস্তি, লম্বদান ইত্যাদি প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। এই হলো সংক্রান্তির ধর্মীয় দিক।

আগেই বলেছি, সাকরাইন ঢাকার বিশেষ ঘুড়ি উৎসব। আদিকাল থেকেই এ শহরের মানুষ ঘুড়িবাজ হিসেবে পরিচিত। এর অবশ্য কারণও রয়েছে। এখানে ঘুড়ি উড়ানোর পেশাদারিত্ব কারুকাজ ও কলাকৌশলে অবাক হয়ে ঐতিহাসিকেরাও এর মুগ্ধতা প্রকাশ করে গেছেন। ঢাকায় ঘুড়ির আগমনের ইতিহাস জানতে আপনাকে যেতে হবে বেশি দূরে নয় ভারতের নবাবী শহর লক্ষ্ণৌ পর্যন্ত। জানেন কি? লক্ষ্ণৌ মোগল ও নবাবী খানাপিনা ছাড়াও আর কি দুটোর জিনিসের জন্য বিখ্যাত ছিল? একটি সুর-সঙ্গীত আরেকটি ঘুড়ি। ঢাকার নায়েব নাজিম ও নবাবেরা ছিলেন এই কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক। একসময় স্থানীয় নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় লক্ষ্ণৌর আকাশ রঙবেরঙের ঘুড়ি আর আতশবাজির আলোকসজ্জায় পূর্ণ থাকত। ধনীরা স্বর্ণ ও রুপার ঝালর ও কারচুপি খচিত নাটাই এবং ঘুড়ি উড়াতেন। এ উৎসবকে পাতাংবাজি বলা হতো। নবাব ওয়াজিদ আলী শাহর সময় এই নামে দেখা যায়। আর ঘুড়ি উড়ানো উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় নবাব আসাফউদ্দৌলার সময় থেকে। হিন্দু শাসিত শহরে তারা পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সব সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, যা সর্বজনীন ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু মুসলিম সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা। ঢাকার শেষ নবাব গাজিউদ্দিন, যিনি পাগলা নবাব নামে পরিচিত ছিলেন, তার ঘুড়ি উড়াবার নেশা আর আহসান মঞ্জিলের নবাববাড়ীর ঘুড়িপ্রীতি শহরের সবার জানা। শীত মৌসুমের তিন মাস ঢাকার লোকদের বার্ষিক ঘুড়ি উড়ানো প্রতিযোগিতা ও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল। ছিল না নিদিষ্ট কোনো দিন। পৌষের শেষ দিনটাকেই তারা বেছে নিতেন ঘুড়ি উড়াবার শেষ মওসুমি উপলক্ষ হিসেবে।

ঢাকার ঘুড়িবাজেরা নেমে পড়ত খোলা মাঠ ও মহল্লার ছাদগুলোতে। এই প্রতিযোগিতাকে বলা হতো হারিফি বা হারিফ। বিভিন্ন উপলক্ষেই তারা নামত হারিফ খেলায়। ঢাকার নবাবেরা ছিলেন এর মূল পৃষ্ঠপোষক। চকবাজার, শাহবাগ, পল্টন ময়দান (দিলকুশা), আরমানিটোলা মাঠসহ সব উন্মুক্ত স্থানেই চলত এই আয়োজন।

এবারের সাকরাইন
লগি হাতে তৎপর ওরা, দৃষ্টি আকাশের দিকে। একটা ঘুড়ি ভোঁকাট্টা হলেই ভোঁ-দৌড়। যে আগে পৌঁছাতে পারবে, ঘুড্ডিটা তার। বয়স ছয় কি সাত; ঘুড়ি শিকারের জন্য নিজের থেকে তিন গুণ লম্বা লগির নিয়ে শুরু করেছে দৌড়ঝাঁপ। গত রোববার ও সোমবার ওদের দেখা গেছে। একসময় পৌষের শেষে পুরান ঢাকার জামাইরা শ্বশুরবাড়ি এলে তাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হতো ঘুড়ি ও নাটাই। সব বাড়ির জামাই ঘুড়ি উড়ালে ঘটা করে সেসব দেখতেন গ্রামবাসী। এমনটা এখন আর হয় না। কিন্তু উৎসবটা রয়ে গেছে। তাই ঘুড়ি উড়ানো পৌষবিদায়ী উৎসবের অংশ হয়ে আছে।
গত রোববার ছিল পৌষের শেষ দিন। আর এই দিনটিতেই আদিকাল থেকে পুরান ঢাকার মানুষ সাকরাইন উৎসব আয়োজন করে আসছে পৌষকে বিদায় জানাতে। কুয়াশাসিক্ত ভোরে ঘুড়ি উড়িয়ে ভোঁকাট্টা আওয়াজে সূচনা হয় বলে এই উৎসবকে ঘুড়ি উৎসবও বলা হয়ে থাকে।

এবার পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে পুরান ঢাকার বাড়িতে বাড়িতে ‘সাকরাইন’ উৎসব উপলক্ষে ঘুড়ি উড়ানো ছাড়াও ছিল নানা আয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল বললেন, গত ১৬ বছর ধরে এই উৎসব করে আসছি আমরা। আমাদের বন্ধুদলের নাম ব্যাড বয়েজ আর ছোটদের দলটার নাম জুনিয়র ব্যাড বয়েজ। সবাই আলাদাভাবে ঘুড়ি উড়ালেও ‘ব্যাড বয়েজ’কে প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি বিশেষ ঘুড়িও বানানো হয়। খাওয়ার জন্য থাকে খিচুড়ি, গরুর গোশত। সন্ধ্যার পর শুরু হয় মুখে কেরোসিন-আগুনের খেলা, ফানুস উড়ানো। পুরান ঢাকার সব থেকে বড় আয়োজন করে ‘ব্যাড বয়েজ’। এ ছাড়া ইয়ুথ গ্রুপ, স্টোন গ্রুপসহ আরো বেশ কয়েকটি দল এই আয়োজন করে।
শাঁখারিবাজারের ঘুড়ি ব্যবসায়ী সাচ্চু জানালেন, আকার অনুযায়ী ঘুড়ির দাম রাখা হচ্ছে ৫ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। ঘুড়ি বিক্রি শুরু হয়েছে আরো সপ্তাহখানেক আগে থেকেই। সাকরাইনে আমরা প্রতিবারই লক্ষাধিক ঘুড়ি বিক্রি করি। ঘুড়ি ছাড়াও চাহিদা রয়েছে বিশেষ ধরনের রক সুতা আর নাটাইয়ের।

কালের ধারাবহিকতায় উৎসবে অনুষঙ্গের পরিবর্তন এলেও আমেজ ও আবেগটা কিন্তু এখনও প্রজন্মান্তরে রয়ে গেছে ঠিক আগের মতোই। শত বছরের নানা সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত উত্তেজনার মাঝেও পৌষসংক্রান্তি বা সাকরাইন এই শহরে হিন্দু মুসলিম সবার সর্বজনীন এক সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে আজও টিকে আছে।

ছবি : আশরাফুল অয়ন ও রাজেশ দে

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫