ঢাকা, বুধবার,২৪ জানুয়ারি ২০১৮

মতামত

মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দেয়ার নীলনক্সা?

জো ম্যাকার

১৪ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ১৭:২১ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ১৫:১০


প্রিন্ট
২০১৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি কী হবে?

২০১৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি কী হবে?

মধ্যপ্রাচ্যের জন্য গত বছরটি ছিল যুগসন্ধিক্ষণ বা চরম মুহূর্ত। ২০১৮ সালেও এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। গোটা অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটা শুরু হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ ও সঙ্ঘাত অবসানের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার দিক দিয়ে এখনো চ্যলেঞ্জ অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তী বছরকে যুদ্ধোত্তর অন্তর্বর্তীকালীন সময় হিসেবে শান্তি আলোচনা, ব্যালটবাক্স এবং পুনর্গঠনের বছর হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। দু’টি ক্ষেত্রে এ প্রবণতা থেকে ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। ইয়েমেন হচ্ছে একমাত্র দেশ, যেটি শান্তি প্রতিষ্ঠার রোডম্যাপ ছাড়াই নতুন বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। আর ইদলিব ও দেরা থেকে সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত আগামী বছর ভূখণ্ডগত বিরোধ ও সঙ্ঘাত অব্যাহত থাকবে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রচণ্ড আলোড়ন ও অশান্তি অব্যাহত থাকায় ২০১৮ সালের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুগুলো চিহ্নিত করা অধিকতর কঠিন হয়ে পড়েছে। যাই হোক না কেন, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে পাঁচটি বিষয়কে অবশ্যই ২০১৮ সালে পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন।

১. সিরিয়ার শরণার্থীরা কি দেশে ফিরতে পারবে?
বর্তমানে জাতিসংঘের (ইউএনএইচসিআর) তালিকাভুক্ত সিরীয় শরণার্থীদের সংখ্যা হচ্ছে ৫৪ লাখ। এদের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ তুরস্কে ৩৪ লাখ, লেবাননে ১৫ লাখ ও জর্ডানে সাড়ে ছয় লক্ষ শরণার্থী রয়েছে। ২০১৭ সালে খুব কম সংখ্যক শরণার্থী দেশে ফিরে আসতে শুরু করে। এসব দেশ ক্রমবর্ধমান হারে নিরাপত্তা এবং আর্থসামাজিক উত্তেজনার মুখোমুখি হওয়ায় ২০১৮ সালে শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া জোরদার করা হতে পারে। জর্ডান ও তুরস্কের সাথে সিরিয়ার সীমান্তে বাফার জোন রয়েছে। তাই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দুই দেশে অবস্থানরত শরণার্থীদের তেমন একটা ভোগান্তি পোহাতে হবে না। লেবাননের ক্ষেত্রে সিরীয় সরকার পরিপূর্ণভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তাই এ ক্ষেত্রে দামেস্কের সাথে লেবাননের মতপার্থক্য কাটিয়ে উঠে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। সিরীয় উদ্বাস্তুদের কার্যকরভাবে দেশে ফিরে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে তা অচল সিরীয় শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে একটি নজির সৃষ্টি করতে পারে এবং এটা পুনর্গঠন প্রয়াস ও স্থানীয় সরকারের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

২. জেরুসালেম এবং আঞ্চলিক জোট পুনর্গঠন
জনগণের চাপে সরকারগুলো কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য হওয়ায় আরব রাজনীতিতে ফিলিস্তিন পুনরায় কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আর জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ফলে ২০১৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে জেরুসালেম একটি প্রধান ইস্যু হিসেবে অব্যাহত থাকবে। আঙ্কারা আবার ওয়াশিংটন থেকে দূরে সরে গেছে, আম্মান রিয়াদ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে এবং তেহরান তার মিত্রদের সাথে একত্র হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেছে। শান্তি প্রক্রিয়া মরীচিকায় পরিণত হওয়ায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আবার দুর্বল হয়ে পড়বেন।
ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ও ইসরাইলের পক্ষ নেয়ার মার্কিন নীতিও যুক্তরাষ্ট্রকে মুশকিলে ফেলতে পারে। কারণ পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধি পেলে ফিলিস্তিনি ইস্যুতে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য রিয়াদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। সিরিয়া যুদ্ধের যখন অবসান ঘটতে যাচ্ছে, তখন জেরুসালেম ইস্যু পুরনো মিত্রদের পরীক্ষায় ফেলবে এবং নতুন মিত্ররা জোটের উদ্ভব ঘটাতে পারে।

৩. রিয়াদে ঝাঁকুনি : স্থানীয় রাজনীতি দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা
‘এমবিএস’ হিসেবে পরিচিত যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ২০১৭ সালের অনিশ্চিত রাজনীতি ও অস্থিরতা খুব সম্ভবত ২০১৮ সালেও অব্যাহত থাকবে। ডেপুটি যুবরাজ হিসেবে ২০১৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এমবিএস ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে থাকেন। চলতি বছর তিনি জরুরি ভিত্তিতে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রয়াস চালিয়েছেন। তার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তোলে। সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ এবং দেশে অশান্তি ও প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে।

গত জুন মাসে সাবেক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে যখন পদত্যাগে বাধ্য করা হয় তখন সৌদি আরব কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করেছে। গত নভেম্বর মাসে যখন সৌদি প্রিন্স ও ব্যবসায়ীদের হোটেল রিজ কার্লটনে আটক করে রাখা হয় তখন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে রিয়াদে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এমবিএস ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার ব্যাপারে নিজেকে অধিকতর নিরাপদ মনে করলে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র নীতি বরং গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিরে যেতে পারে। যাই হোক না কেন, অনিশ্চয়তা বিদেশে বিয়াদের বাগাড়ম্বরকে বিস্তৃত করার মাধ্যমে দেশটিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এমবিএসের অধীনে ২০১৮ সালে সৌদি আরব একটি যুগসন্ধিক্ষণে গিয়ে পৌঁছবে।

৪. নির্বাচনে ফিরে যাওয়া : ইরাক এবং লিবিয়া
২০১৮ সালে গোটা অঞ্চলের প্রধান প্রধান দেশগুলো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়া প্রত্যক্ষ করবে। আগামী মার্চে মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য লেবাননের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিস্ময়কর কিছু বা বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে না। অবশ্য ২০১৮ সালের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিতব্য লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন এবং মে মাসে ইরাকের পার্লামেন্ট নির্বাচন ফলপ্রসূ পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবেদি তার মিত্রদের সাথে নিয়ে অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা উচিত। এই জোট অবশ্য ইতোমধ্যে ইসলামিক স্টেট বা আইএমআইএলকে পরাজিত করে রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করেছে। এই জোট কুর্দিদের স্বাধীনতার দাবিতে অনুষ্ঠিত গণভোটও ব্যর্থ করে দিয়েছে। ইরানপন্থী উপদলটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালেকিকে অনুমোদন দেয়ার চেষ্টা করলে নির্বাচনে তারা তেমন সুবিধা করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানকে সংযত বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আবেদিকে ক্ষমতায় ধরে রাখাটা সর্বোত্তম সুযোগ। নির্বাচনের সময় তেহরান পেশিশক্তি দেখিয়ে আবেদির বিজয়কে কঠিন করে তোলে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।
২০১৮ সালে লিবিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। আমরা হয়তো জেনারেল খলিফা হাফতার এবং মোয়াম্মায় গাদ্দাফীর ছেলে সাইফ-আল-ইসলামের মধ্যে প্রেসিডন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যক্ষ করব। জাতিসঙ্ঘ সমর্থিত ন্যাশনাল অ্যাকর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যানের প্রিয়ভাজন হচ্ছেন হাফতার। তার নির্বাচনে ভালো করার সম্ভাবনা বেশি। আর প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল সারাজ সম্ভবত তার পদে থেকে যেতে পারেন।

৫. আইএসআইএল কি ফিরে আসবে?
ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও আইএসআইএলের ফিরে আসার হুমকিও উড়িয়ে দেয়া যায় না। চরমপন্থী গ্রুপটি ক্রমেই আন্ডারগ্রাউন্ড অপারেশনে চলে যাচ্ছে। ওই পদ্ধতিতে তারা সিরিয়া, ইরাক এবং বিশ্বের অন্যান্য স্থানে হামলা অব্যাহত রাখতে পারে। এই গ্রুপটি আল কায়েদার মিত্র হয়ে উঠবে না প্রতিদ্বন্দ্বী হবে, তাও দেখার বিষয়। সিরিয়া, ইরাক অথবা লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে আইএসআইএল বা অন্যান্য উগ্রবাদী গোষ্ঠী পুনরায় ফায়দা হাসিল করতে পারে।

২০১৮ সালে এই পাঁচটি ইস্যু অব্যাহত থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির ক্ষেত্রে ইতিহাস সবসময় নমনীয় নাও হতে পারে। তাই সেখানকার রাজনীতি নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, ২০১৮ সালজুড়ে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি।

আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫