ঢাকা, শনিবার,২০ জানুয়ারি ২০১৮

শেষের পাতা

আ’লীগ ও বিএনপিতে দ্বন্দ্ব থাকলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা থেমে নেই

রাজশাহী-৪ আসন

মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী

১৪ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

রাজশাহী- ৪ (বাগমারা) আসনে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে তৃণমূলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বিভক্ত। তা সত্ত্বেও সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণায় বাগমারা উপজেলাজুড়ে যেন নির্বাচনী আমেজ বিরাজ করছে।
এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন : বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান এমপি ব্যবসায়ী ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, বাগমারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা জাকিরুল ইসলাম সান্টু, তাহেরপুর পৌরমেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম আজাদ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুস সোবহান চৌধুরী।
এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন : জেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক এমপি অধ্যাপক আবদুল গফুর, জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. জাহিদ দেওয়ান শামীম ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মোকলেছুর রহমান। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আরো কয়েকজন নেতা দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে দল দু’টির একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এই দুই দলের বাইরে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আরো রয়েছেনÑ স্থানীয় একটি দৈনিকের সম্পাদক, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) রাজশাহী মহানগর শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহীর এভারগ্রিন মডেল কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবু ইউসুফ সেলিম এবং জাতীয় পার্টির (এরশাদ) বাগমারা উপজেলা সভাপতি ব্যবসায়ী আবু তালেব।
জানা গেছে, বাগমারা উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৪ আসন। এ আসনে ১৯৬৯, ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালের নিবাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এবং ১৯৮৮ ও ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে এমপি হয়েছিলেন মরহুম সরদার আমজাদ হোসেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক আব্দুল গফুর এমপি নিবাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সচিব আবু হেনা এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে দ্বিতীয়বারের মতো এমপি হন আবু হেনা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ব্যবসায়ী ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক এমপি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক আবদুল গফুর। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারো এমপি নির্বাচিত হন।
একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী নির্বাচনে আবু হেনা আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মনোনয়ন পেতে পারেন বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে এই দু’টি দলের তরফ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ায় আবু হেনাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমানে বাগমারা উপজেলায় আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ এখন তিনটি গ্রুপে বিভক্ত। একদিকে রয়েছেনÑ বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান এমপি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক। এ ছাড়া বাগমারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা জাকিরুল ইসলাম সান্টু এবং তাহেরপুর পৌরমেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে দু’টি গ্রুপেও নেতাকর্মীরা বিভক্ত। তবে ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ মাঠে রয়েছেন। আগামী নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক আবারো দলীয় মনোনয়ন পাবেন বলে তার অনুসারীরা আশা করছেন। এ ছাড়া জাকিরুল ইসলাম সান্টু এবং আবুল কালাম আজাদের অনুসারীরাও তাদের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
নেতার দলীয় একটি সূত্র জানায়, এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি হলেও এখনই তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনে ব্যর্থ হলে এবং তৃণমূলের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রার্থী মনোনয়ন না দিলে আওয়ামী লীগের জয় পাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ছাড়া স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় পার্টি পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে বা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে না থাকলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক অনেকটা কমে যাবে। এতে আওয়ামী লীগের জয় পাওয়া অনেকটা কঠিন হবেÑ এমন হিসাব-নিকাশও চলছে স্থানীয় পর্যায়ে।
এ ব্যাপারে জানতে বাগমারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা জাকিরুল ইসলাম সান্টুর সাথে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। তাহেরপুর পৌরমেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম আজাদের সাথে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
উপজেলা বিএনপিতেও রয়েছে একাধিক গ্রুপ। জেলা বিএনপি হস্তক্ষেপ করলে এই দ্বন্দ্ব সহজেই নিরসন হতে পারে বলে মনে করেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। কিন্তু জেলা বিএনপির দুর্বলতা এবং জেলা কমিটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা গ্রুপিংয়ে সম্পৃক্ত থাকায় এ দ্বন্দ্ব নিরসন হচ্ছে না বলে মনে করেন তারা। এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেকে থাকলেও নেতাকর্মীদের প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক এমপি অধ্যাপক আবদুল গফুর। দলের জন্য ত্যাগ ও অবদানের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক আবদুল গফুর নয়া দিগন্তকে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমি বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন পাব বলে আশা করি। দলীয় হাইকমান্ড বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করবে। তিনি বলেন, আমাকে দলীয় মনোনয়ন দিলে প্রার্থিতা নিয়ে দলে কোনো দ্বন্দ্ব থাকবে না। এ ছাড়া নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।
স্থানীয় বিএনপিতে দ্বন্দ্ব নিরসনে অধ্যাপক আবদুল গফুর ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। দ্রুত এ দ্বন্দ্ব নিরসন হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। জেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপুর অনুসারীরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে তপু দলীয় মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না সে ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে দলটির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাগমারা উপজেলায় জামায়াত সাংগঠনিকভাবে অনেক সুসংগঠিত। তা ছাড়া জামায়াতের ভোটব্যাংকও রয়েছে, যা নির্বাচনে জোটগত জয়-পরাজয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবু ইউসুফ সেলিম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। এজন্য নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি একটি রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নির্বাচন করব। তবে কোন রাজনৈতিক দল বা কোন প্রতীকে নির্বাচন করব তা নিয়ে ‘চমক’ রয়েছে। এখনই তা বলতে চাই না। যথাসময়ে বিষয়টি প্রকাশ করব।
তিনি বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের ভয়ে যখন কেউ মাঠে নামতে পারেননি তখন থেকে আমি প্রকাশ্যে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। সব বাধা উপেক্ষা করে আমি এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকব ইনশাল্লাহ।
জাতীয় পার্টির (এরশাদ) বাগমারা উপজেলা সভাপতি ব্যবসায়ী আবু তালেব এ আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানা গেছে। তবে দলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, জোটগত নির্বাচন হলে রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে একটি আসন চাইবে জাতীয় পার্টি। আসনটি হলো রাজশাহী- ৩ (পবা-মোহনপুর)। তবে আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে থেকে নির্বাচন করবে না এককভাবে করবে তা নিয়ে স্থানীয় রাজনীতি সচেতন মানুষের মাঝে বেশ কৌতূহল রয়েছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫