ঘণ্টায় দেড় লাখ টাকা রাজস্ব লোকসান

পাটুরিয়া নৌপথে সাড়ে ৮ ঘণ্টা পর ফেরি চলাচল শুরু

শহিদুল ইসলাম শিবালয় (মানিকগঞ্জ)

ঘন কুয়াশায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে সাড়ে ৮ ঘণ্টা পর ফেরি চলাচল শুরু হয়েছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় গত শুক্রবার রাত আড়াইটা থেকে শনিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ফেরি চলাচল বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। সাতটি পাটুরিয়ায় ও চারটি ফেরি দৌলতদিয়া ঘাটে পন্টুনে যাত্রী ও যানবাহন বোঝাই অবস্থায় নোঙর করে থাকে। ফলে ফেরি পার হতে আসা কোচ ও পণ্যবাহী ট্রাকগুলো দুই পারে আটকে পড়ে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় আসা নৈশ কোচগুলো গতকাল দুপুরেও পারাপার হতে পারেনি। দু-তিন দিন আগে আসা পণ্যবাহী ট্রাকগুলো গতকাল বিকেল পর্যন্ত পারের অপেক্ষায় ছিল। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আটকে পড়া পরিবহন যাত্রী-শ্রমিক-মালিকেরা নানা কারণে ঘাটে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া উভয় ঘাট এলাকা থেকে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন মহাসড়কের উপর বিস্তৃত হয়ে পড়েছে।
ফেরি সেক্টর বিআইডব্লিউটিসির ম্যানেজর নাছির মোহাম্মদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বর্তমানে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে আটটি রো-রো, চারটি কে-টাইপ (ছোট) এবং ছয়টি ইউটিলিটি ফেরি চলাচল করছে। ঘন কুয়াশার কারণে কয়েকদিন ধরে এ নৌপথে ফেরি চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। কয়েকদিন ধরে সন্ধ্যার পর অথবা সকালে এ এলাকার নৌপথ কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায়। ফলে নৌপথ দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতি দিনের মতো শুক্রবার রাত আড়াইটা থেকে কুয়াশার ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে নৌপথ দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। শনিবার সকাল ১০টায় ঘনকুয়াশা কেটে গেলে আবার ফেরি চলাচল শুরু হয় বলে তিনি জানান।
শনিবার বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উভয় পাড়ে সহস্রাধিক যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় আটকে ছিল।
এম মনিরুজ্জামান রাজবাড়ী জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকলে প্রতি ঘণ্টায় উভয় ঘাট মিলে প্রায় দেড় লাখ টাকা বিআইডব্লিউটিসির রাজস্ব লোকসান হয়। লোকসান হয় কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের। এর ফলে পদ্মা নদী পারাপার হতে আসা যাত্রী ও যানবাহনের চালকেরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট শাখার ব্যবস্থাপক মো: শফিকুল ইসলাম জানান, শীত মওসুমে প্রতিনিয়ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দেড় লাখ টাকা বিআইডব্লিউটিসির রাজস্ব লোকসান হয়। এ ছাড়া নদী পার হতে আসা যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। লোকসান হয়। বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার রাত ৩টা থেকে কুয়াশার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীতে মার্কিং বাতি না দেখা যাওয়ায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করা হয়। এ সময় মাঝ নদীতে বিভিন্ন ধরনের দেড় শতাধিক যানবাহন নিয়ে চারটি ফেরি নোঙর করে থাকে। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দু’টি ও পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ১০টি ফেরি যানবাহন লোড করে বসে থাকে। বেলা ১১টায় কুয়াশার ঘনত্ব কমে গেলে আবার দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল শুরু হয়।
এ দিকে দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে এসেও কুয়াশার কারণে ফেরি বন্ধ থাকায় পারাপার হতে না পেরে ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে মহাসড়কের ৫ কিলোমিটারজুড়ে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের পৃথক দীর্ঘ সারি হয়ে যায়। সারারাত গাড়ির মধ্যেই রাত কাটাতে হয় যাত্রী ও চালকদের।
শনিবার সকালে দৌলতদিয়া ঘাট সরেজমিন ঘুরে একাধিক যাত্রী ও যানবাহনের চালকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাত ৭-৮টায় ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকগুলো ছেড়ে আসে। দৌলতদিয়া ঘাটে এসেই দেখে ঘন কুয়াশার কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ। যাত্রীরা বলেন, মহাসড়কে পাবলিক টয়লেট নেই। যেগুলো আছে তাও তালা বন্ধ থাকে। সুতরাং নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ দ্বিগুণ হয়। খাবারের হোটেল না থাকায় দ্বিগুণ দামে খোলা খাবার কিনে খেতে হয়।
(বিআইডব্লিউটিসির) দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহব্যবস্থাপক মো: খোরশেদ আলম জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ঘন কুয়াশায় দুর্ঘটনা এড়াতে শুক্রবার রাত ৩টার সময় ফেরি বন্ধ করা হয়। বেলা ১১টায় কুয়াশার ঘনত্ব কমে এলে আবার ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হয়। তিনি জানান, ঘন কুয়াশার কারণে প্রায় সাড়ে ৮ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরি পারের অপেক্ষায় তিন শতাধিক যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের সারি রয়েছে।
গোয়ালন্দ সংবাদদাতা জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ঘন কুয়াশার কারণে নৌযান পারাপার ব্যাহত হচ্ছে। গত শুক্রবার রাত আড়াইটা থেকে ফের ঘন কুয়াশার কবলে পড়ে এই নৌপথে সাড়ে সাত ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। যানবাহন পারাপার ব্যাহত হওয়ায় শনিবার বিকেল পর্যন্ত গোয়ালন্দ প্রান্তে প্রায় চার কিলোমিটার যানজট দেখা দিয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয় জানায়, শুক্রবার রাত আড়াইটা থেকে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। শনিবার সকাল ১০টায় কুয়াশা কমতে থাকলে ফেরিগুলো ছাড়তে শুরু করে। নৌযান পারাপার ব্যাহত হওয়ায় দৌলতদিয়া এবং পাটুরিয়া উভয় ঘাটে কয়েক শ গাড়ি আটকা পড়ে। তীব্র শীত ও কুয়াশায় আটকে থাকা যাত্রী ও যানবাহন চালকেরা নদী ও সড়ক পথে দুর্ভোগের শিকার হন।
এ ছাড়া এই নৌপথের ১৬টি ফেরির মধ্যে দুইটি ফেরি বিকল রয়েছে। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান নামের বড় ফেরি এক সপ্তাহ ধরে ও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যান্ত্রিক ত্রুটিতে বনলতা নামের ইউটিলিটি ফেরি বিকল রয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে এক নম্বর ঘাটের সামনে দিয়ে লঞ্চ ঘাট এলাকায় ড্রেজিং করায় ওই ঘাটে সহজে কোনো ফেরি ভিড়তে পারছে না। বাকি ২, ৩ ও ৫ নম্বর (তিনটি) ঘাট দিয়ে যানবাহন পারাপার হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম জানান, ফেরির সংখ্যা কম ও একটি ঘাটে ড্রেজিংয়ের যন্ত্রাংশ থাকায় সহজে ঘাটে ফেরি ভিড়তে না পারায় যানবাহন পারাপার ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েকদিন ধরে কুয়াশায় রাতে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকছে। যে কারণে দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়ায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.