ঢাকা, সোমবার,২২ জানুয়ারি ২০১৮

নগর মহানগর

বিটিসিএল সংযোগ অর্ধেকে নেমেছে

গ্রাহক ভোগান্তি ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি

জাকির হোসেন লিটন

১৪ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বছরের পর বছর গ্রাহকভোগান্তি, কারণে-অকারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতার কারণে ল্যান্ডফোন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ফলে ল্যান্ডফোনের গ্রাহক দিন দিনই কমছে। ফলে অস্তিত্ব সঙ্কটে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লি. (বিটিসিএল)।
বিটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, এক সময় ল্যান্ডফোনের গ্রাহক ছিল প্রায় ১৪ লাখ। নানা সমস্যার কারণে এ সংখ্যা কমে এখন প্রায় ৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিনই গ্রাহক কমছে। অনেকেই স্বেচ্ছায় বাড়ির ল্যান্ডফোন বিটিসিএলের কাছে সমর্পণ করে দিচ্ছেন।
তবে গ্রাহককে ভালো সার্ভিস দিতে না পারার কারণ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িকে দায়ী করছে বিটিসিএল। তাদের মতে, ওয়াসা, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে ল্যান্ডফোনের তার কেটে ফেলছে। ফলে বিভিন্ন এলাকার টেলিফোন বিকল হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যার কারণে টেলিফোন গ্রাহকেরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষও চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) বিভিন্ন প্রকল্পে গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বড় ধরনের এ বিনিয়োগের পরও উন্নতি নেই সেবার মানে। বর্তমানে সারা দেশে বিটিসিএলের অর্ধেকের বেশি টেলিফোন সংযোগই বিকল হয়ে আছে। বিনিয়োগের প্রভাব নেই প্রতিষ্ঠানটির আয়েও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খারাপ অবস্থায় রয়েছে রাজধানীর ৫০ শতাংশ টেলিফোন সংযোগ। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরো নাজুক। বিভাগীয় শহরগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ সংযোগ বিভিন্ন সময় অকার্যকর থাকে। আর জেলা শহরগুলোয় এ হার ৭৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে সারা দেশে বিটিসিএল সংযোগের প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনোভাবে অকার্যকর।
গ্রাহকদের অভিযোগ, মাসের পর মাস লাইন খারাপ থাকলেও প্রতি মাসে ভাড়া গুনতে হয় ঠিকই। অভিযোগ করলেও লাইন সচলের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। সময়মতো পৌঁছে না বিলের কাগজও। যদিও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে প্রতি মাসের ৮ তারিখের মধ্যে গ্রাহকের কাছে বিল পৌঁছে দেয়ার। গ্রাহকসেবায় মানোন্নয়নে ব্যর্থ হওয়ায় সংযোগ সক্ষমতাও পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিটিসিএলের নতুন সংযোগ গ্রহণ ও সংযোগ-পরবর্তী সেবাদানে প্রতিষ্ঠানটির অপেশাদারি মনোভাবের কারণেই গ্রাহক-আস্থা বাড়ছে না।
তাদের মতে, টেলিফোন ক্যাবল কাটা, নষ্ট হওয়াসহ নানা কারণে বিটিসিএল ধ্বংসের পথে যাচ্ছে। মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়ন কর্মসূচি।
বিটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও তিতাস গ্যাসসহ বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন সময় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে প্রায় সময় বিটিসিএলের ভূগর্ভস্থ ক্যাবল কাটা পড়ে। একবার কাটা পড়লে তা মেরামত করতে কয়েক সপ্তাহ লাগে। এজন্য লাইনম্যানদের পেছনে পেছনে ঘুরতে হয়, দিতে হয় বখশিশ। আবার অনেক সময় চোরেরা ভূগর্ভস্থ ক্যাবল চুরি করেও নিয়ে যায়। ওইসব মোটা ক্যাবলের ভেতরের তামার তার খুলে চোরেরা ঢাকার বাইরে ধামরাই, সাভার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে। রাজধানীতে এসব ঘটনা অহরহ ঘটছে। শুধু রাজধানীই নয়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে টেলিফোনের তার কাটা ও চুরি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চুরি ঠেকাতে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ পুলিশের উচ্চপর্যায়ে লিখিত অভিযোগও করেছে।
এ দিকে গত বছর কয়েকবার বিটিসিএল ইস্কাটনস্থ প্রধান কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাজধানীর খিলগাঁও, মগবাজার, কাকরাইল, মৌচাক, মালিবাগ, ফকিরাপুল, ডিআইটি এক্সটেনশন রোড, নয়াটোলা, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিটিসিএলের ভূগর্ভস্থ ক্যাবল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিপুলসংখ্যক টেলিফোন বিকল হয়ে পড়ছে। ওয়াসার ড্রেন নির্মাণ কাজের ফলে খিলগাঁও চৌরাস্তা এলাকায় ৫০০ টেলিফোন, বনশ্রী এলাকায় ১১০টি, গোড়ান এলাকায় ৬০টি টেলিফোন বিকল হয়ে আছে। আবার কাকরাইল এলাকায় ড্রেন নির্মাণ কাজের ফলে কাকরাইন কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, সার্কিট হাউজ এলাকার ৪০টি, সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগরে ৭৬০টি, রাজারবাগ, চামলীবাগে ৩২০টিসহ বিভিন্ন স্থানে কয়েক হাজার টেলিফোন বিকল হয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ গত ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর মগবাজার এলাকার দিলু রোডে বিটিসিএলের তার কাটা পড়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানের কয়েক লাখ ফোন বিকল হয়ে পড়ে। এর আগে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফোনটি বিকল হয়ে যাওয়ার খবর আসে। বিপরীতে তারা দু’টি বিকল্প নম্বরও দেয়।
জানা গেছে, বর্তমানে মিরপুর এলাকায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ওই এলাকার বেশির ভাগ টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিসিএলের কয়েকজন কর্মকর্তা সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, প্রায় সময় নানা কারণে টেলিফোন সংযোগে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকহয়রানির অভিযোগও আছে অনেক। অনেকেই অতিষ্ঠ হয়ে ফোন ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছেন। গ্রাহক এখন অর্ধেকে নেমেছে। এই সংখ্যা আরো কমতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।
অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, মোবাইল এখন সবার হাতে হাতে। তাই শস্তা হলেও নানা ধরনের হয়রানির কারণে অনেকেই বাসায় টেলিফোন সংযোগের মতো বাড়তি বোঝা রাখতে চান না। ফলে এর গ্রাহক কমছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিটিসিএলের পরিচালক (জনসংযোগ ও প্রকাশনা) মীর মোহাম্মদ মোরশেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করতে গিয়ে ক্যাবল কাটা পড়ায় বারবার টেলিফোন সংযোগে বিঘœ ঘটছে। সম্প্রতি ইস্কাটনে ‘কোর ক্যাবল’ কাটা পড়ায় সারা দেশে টেলিফোনের সাথে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছন্ন হয়ে যায়। তবে বিটিসিএলের দ্রুত পদক্ষেপে বর্তমানে তা স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে মিরপুর এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে কয়েক শ’ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্যা সেবাসংস্থাকে উন্নয়ন কাজের ক্ষেত্রে সর্তকর্তা অবলম্বনের জন্য বারবার চিঠি দিলেও তারা আমলে নেয় না। এতে বারবারই একই ঘটনা ঘটছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫