৩২ কোটি মানুষের কাছে ৩০ কোটি অস্ত্র

মঈনুল আলম

প্রেসিডেন্ট ট্র্রাম্প প্রশাসনের প্রথম বছর সদ্য সমাপ্ত ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দু’টি ব্যাপার হলোÑ বিশ্বে সর্বাধিকসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক জনসংখ্যার দেশরূপে যুক্তরাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ও একজন বন্দুকধারীর গুলিবর্ষণে সর্বাধিক নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনা!
গত নভেম্বরে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বিস্ময়কর তথ্য প্রকাশ পেল, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে বাস করে; কিন্তু বিশ্বে মোট আগ্নেয়াস্ত্রের ৪২ শতাংশ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের হাতে! যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ কোটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার অনুপাতে বলা যায় প্রায় প্রতিটি আমেরিকানের কাছে একটি করে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে!
গত বছর (২০১৭) ১ অক্টোবর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস শহরে একটি মিউজিক সেন্টারের কনসার্টে দর্শকদের ওপর এক অস্ত্রধারী অনবরত গুলি করে করে ৫৮ জনকে নিহত করে ও ৫৪৬ জনকে আহত করে। অস্ত্রধারী ৬৪ বছর বয়স্ক স্টিফেন প্যাডক পাশের মান্দালে বে হোটেলের ৩২ তলার একটি কক্ষ থেকে অনবরত এক হাজার ১০০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ওই কক্ষেই তার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার অধ্যাপক-গবেষক এডাম ল্যাঙ্কফোর্ডের প্রণীত গবেষণা পরিসংখ্যন থেকে এসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এই গবেষণাকে উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক টাইমস ২৫ নভেম্বরের (২০১৭) ইন্টারন্যাশনাল সংস্করণে শীর্ষ প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে।
১৯৬৬ হতে ২০১২ পর্যন্ত সঙ্কলিত পরিসংখ্যনে দেখা যায়Ñ বিশ্বে মোট যত ‘ব্যাপক গুলিবর্ষণ’ (mass shooting) ঘটনা হয়েছে, তার ৩১ শতাংশ ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে! এসব গুলিবর্ষণ ঘটনার পরিসংখ্যানের সাথে ‘মানসিক রোগ’ ব্যাপারটি যুক্ত করলে দেখা যায় পাশ্চাত্যের সমশ্রেণীর দেশগুলোর সাথে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে মানসিক রোগীর সংখ্যা বেশি! ২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যনে প্রকাশ, ‘মাস শুটিংয়ের ঘটনায় গুলিবর্ষণকারীদের চার শতাংশ মানসিক রোগী বলে ধরা পড়েছে।’
লাস ভেগাসে উপরোল্লিখিত জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, সময় আসলে আমরা আগ্নেয়াস্ত্র আইন সম্পর্কে কথা বলব। সেই সময় আসার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। কারণ, নাগরিকদের অবাধে আগ্নেয়াস্ত্র বহন করার অধিকারের কট্টর সমর্থক ‘ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন’ নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল এবং এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোরতর সমর্থকদের অন্যতম।
২০১৩ সালের পরিসংখ্যানে প্রকাশÑ ২০১৩ সালে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে নিহতদের মধ্যে ২১ হাজার ১৭৫টি ছিল আত্মহত্যা, ১১ হাজার ২০৮টি ছিল হত্যাকাণ্ড ও ৫০৫টি ছিল ‘দুর্ঘটনাবশত (অ্যাক্সিডেন্টাল) আগ্নেয়াস্ত্র হতে গুলি বের হওয়ার কারণে। আত্মহত্যার সংখ্যা হত্যাকাণ্ডের সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় অনেকেই বলতে চাইবেন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যায় আত্মহত্যার প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেশি! যুক্তরাষ্ট্রের সম-উন্নত দেশ জাপান, যার জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ; আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে সারা বছরে নিহত হয়েছে মাত্র ১৩ জন!
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও গুয়াতেমালাতে আইনের বিধান হচ্ছেÑ জনগণের আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয় করা ও রাখার ঐতিহ্যবাহী অধিকার রয়েছে! যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয় ও বহন করার ওপর নিয়ন্ত্রণের শিথিলতার অন্যতম কারণ হচ্ছেÑ আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাণকারী সুবৃহৎ করপোরেশনগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আধিপত্য। কেউ কেউ বলেন, প্রভুত্ব। বিশেষ করে রিপাবলিকান পার্টির ওপর আধিপত্য সর্বজনবিদিত।
সব কিছুর পরেও যুক্তরাষ্ট্রের অনুরাগী ও বিরাগী অনেকের মনে প্রশ্ন থেকে যায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৃত কী কারণে এত বেশি ‘মাস শুটিং’ হয়? কেউ কেউ মনে করেন, এর কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে সমাজ চরিত্র সাধারণভাবেই হিংসাত্মক। কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে বর্ণবাদী যে বিভক্তি ও অসমতা রয়েছে; সেটাই প্রকৃত কারণ। কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে অধিবাসীদের মানসিক অবস্থার দেখভাল করার ব্যবস্থার অপ্রতুলতাই প্রকৃত কারণ।
তবে সবাই স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের হাতে অকল্পনীয় বৃহৎ সংখ্যায় আগ্নেয়াস্ত্র থাকাটা অবশ্যই অন্যতম কারণ বটে! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলীয় প্রশাসনের মেয়াদে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা ও বহন করার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আসবে এটা আশা করার মতো লক্ষণ কেউ দেখছেন না আপাতত।
লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, প্রবাসী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.