ঢাকা, রবিবার,২২ এপ্রিল ২০১৮

অবকাশ

চাদর

চারাগল্প

জোবায়ের রাজু

১৪ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বাড়ির নাম রাখা হয়েছে শান্তির নীড়। আলেয়া এই বাড়িতে কাজ না করলে কখনোই জানতে পারত না হাসান সাহেবের এই বাড়িটি একটি শান্তিময় বাড়ি। দুঃখ কী এই বাড়ির মানুষগুলো সম্ভবত তা জানে না। নিঃসন্তান হাসান সাহেবের স্ত্রী মাহমুদা বেগম একজন গৃহিণী। একসময় নাচের মানুষ ছিলেন। টিভিতে নাচের অনুষ্ঠানে তখন তাকে নিয়মিত দেখা যেত। এখন বয়স হয়েছে বলে নাচ থেকে সরে এসেছেন।
পরিশ্রমী মেয়ে আলেয়া এ বাড়িতে আট মাস ধরে কাজ করে। ভোরে আসে আর সন্ধ্যার পর চলে যায়। আলেয়ার আস্তানা খানপাড়া বস্তিতে। স্বামী মোতালেব আর মেয়ে রিপাকে নিয়ে আলেয়ার সংসার। রিপা ক্লাস ফোরে পড়ে। ভোরে মোতালেব যখন রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, রিপাকে স্কুলে পাঠিয়ে আলেয়া চলে আসে হাসান সাহেবের শান্তির নীড় নামের আলিশান বাড়িতে।
সারা দিন টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার বাতিক আছে মাহমুদা বেগমের। আলেয়ার সাথে দূরত্বটা কেন রাখেন, আলেয়া বুঝতে পারে না। সম্ভবত আলেয়া যে এই বাড়ি থেকে মাঝে মধ্যে দামি অনেক জিনিস সরিয়ে ফেলে, সেটা টের পেয়েছেন মাহমুদা বেগম। এই পড়ন্ত শীতে গত মাসে মাহমুদা বেগমের ড্রেসিং টেবিল থেকে লোশনের বোতলটি কৌশলে সরিয়ে ফেলেছে আলেয়া। তার আগের মাসেও একই নিয়মে হাসান সাহেবের পকেট থেকে এক হাজারের কচকচে নোটটি গায়েব করেছে সে। তা ছাড়া রোজ কিচেনে এদিক-সেদিক তাকিয়ে তরকারির পাতিল থেকে মাছের টুকরাটি মুখের ভেতর ভরে দ্রুত হজম করাটা এখন আলেয়ার কাছে খুবই সরল কাজ।
এখন শীত ঝেঁকে বসেছে। মাহমুদা বেগম সেদিন মার্কেট থেকে কেনাকাটা করতে গিয়ে নিজের জন্য দামি একটি চাদর কিনেছেন। রেশমি সুতার কারুকার্যে বোনা রঙিন চাদরটি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল আলেয়ার। তখন মেয়ে রিপাকে বড় মনে পড়ল তার। আহারে, শীতের জামা নেই বলে মেয়েটা বড় কষ্ট পাচ্ছে। কাঁপতে কাঁপতে রোজ স্কুলে যায়।
এ রকম একটি চাদর যদি মেয়ের জন্য কিনতে পারত; কিন্তু এত টাকা কোথায় পাবে আলেয়া! মাথায় তার দুষ্ট বুদ্ধি চাপে। রিপার জন্য এ চাদরটি চুরি করতে হবে। ফর্সা মেয়েটাকে চাদরটাতে মানাবে বেশ।
পরদিন সন্ধ্যায় আলেয়া যখন মাহমুদা বেগমের নতুন চাদরটি শাড়ির আঁচলতলে লুকিয়ে শান্তির নীড় থেকে বের হবে, তখনই দরজার সামনে থমকে দাঁড়ান মাহমুদা বেগম। তপ্ত গলায় বললেন ‘তোর আঁচল তলে কী? দেখি!’ হাত-পা কাঁপতে থাকে আলেয়ার। সে ভাবতে পারেনি আজ এভাবে চাদর চুরিতে হাতেনাতে ধরা পড়বে।
ছোঁ মেরে চাদরখানা আলেয়ার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ধারালো কণ্ঠে মাহমুদা বেগম বলেন, এ চাদরের দাম কত জানিস? তিন হাজার। এটা চুরি করার সাহস পেলি কিভাবে? এ বাড়ি থেকে তুই যে অনেক জিনিস গায়েব করিস, আমি সব জানি। এই বলে মাহমুদা বেগম আলেয়ার গালে এলোপাতাড়ি চড় মারতে থাকেন। এই অপ্রত্যাশিত শারীরিক নির্যাতনে আলেয়া যখন অসহায় গলায় কাতর কান্নায় ভেঙে পড়ছে, মাহমুদা বেগম তখন বললেন, কাল থেকে আর আসবি না। আমি নতুন বুয়া রাখব।
বস্তিতে এসে আলেয়া মেয়ে রিপার পড়ার টেবিলের পাশে দাঁড়ায়। মাকে আজ অন্য রকম লাগছে দেখে রিপা কৌতূহলী হয়ে ওঠে। তোমার কী হইছে মা? মুখ বেজাড় কেন? গালে এত লাল কেন? গালে হাতের আঙুলের মতো ওটা কিসের দাগ? মেয়ের কথা শুনে বোবা কান্নায় ভেঙে পড়ে আলেয়া। রিপা কোনো কিছু বুঝছে না। মায়ের আজ হয়েছেটা কী!
২.
১০ বছর পরের কোনো এক পড়ন্ত শীত তখন। আলেয়াকে আর বাসাবাড়িতে কাজ করতে দেয় না রিপা। কারণ, রিপা গার্মেন্টে কাজ করে ভালো বেতন পায়। জামাকাপড়ের অভাব হয় না তাদের। গার্মেন্ট মালিক বড় দিলখোলা মানুষ। শীতে গার্মেন্টকর্মীদের শীতবস্ত্র দেয়।
এই শীতে মায়ের জন্য রিপা দু’টি চাদর এনেছে। চাদর দেখে আলেয়ার চোখের সামনে এক করুণ দৃশ্য ভেসে উঠল। এক বড় লোকের স্ত্রী তাদের বাসার বুয়াকে চাদর চুরির অপরাধে গালে এলোপাতাড়ি চড় মারছে। এটা ভাবতেই চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল আলেয়ার।
আজ সকালবেলা বস্তির সামনে যে সরু পথটি, সেখানে দাঁড়িয়ে আলেয়া রোদ পোহাচ্ছিল। তার গায়ে রিপার আনা নতুন চাদর। হঠাৎ একজন মহিলাকে দেখে বুক ধক করে উঠল আলেয়ার। ওই মহিলাকে চেনা চেনা লাগছে। আরে এ তো মাহমুদা বেগম। শরীরের এ হাল কেন? বেশ অসহায় দেখাচ্ছে। গায়ে পাতলা একটি শাড়ি। শীতে ঠকঠক কাঁপছে। কাছে এগিয়ে যায় আলেয়া। নত গলায় বলে, আপনি এখানে কেন? মরা গলায় মাহমুদা বেগম বলেন, ভাগ্য আমাকে পথে নামিয়ে এনেছে। তুমি কে বোন? আলেয়া বুঝতে পারল মাহমুদা বেগম তাকে চিনতে পারেনি।
Ñআমি এ এলাকার বউ। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
Ñআমার কোনো ঠিকানা নেই।
Ñমানে?
Ñআমার স্বামী আরেকটি বিয়ে করে আমাকে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
আলেয়া অবাক হয়ে গেল। হাসান সাহেব এমন একটা কাজ করতে পারল! শীতে কাঁপছে মাহমুদা বেগম। আলেয়া তার গায়ের চাদরটি খুলে মাহমুদা বেগমকে বলল, আপনি শীতে বেশ কাঁপছেন। এই নেন চাদরখানা গায়ে পরেন। কাঁপা হাতে মাহমুদা বেগম আলেয়ার হাত থেকে চাদরটি নিয়ে দ্রুত গায়ে জড়িয়ে নিলেন। অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলেন আলেয়ার দিকে।
প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেলা! একদিন চাদর চুরির অপরাধে আলেয়ার গায়ে হাত তুলেছেন মাহমুদা বেগম। আজ হাড়কাঁপানো শীতে আলেয়ার দেয়া চাদর গায়ে জড়িয়ে উষ্ণতা খুঁজছেন তিনি।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫